Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বইয়ের গন্ধ, ধুলোবালি ও বিপন্ন ভালোবাসার কথা

Share Links:

কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়

খুব দ্রুত আমাদের জীবনযাপনে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। যা কিছু পুরোনো, তা সবই বদলে যাচ্ছে দ্রুত। তাই মাঝেমধ্যে সেই গান গুনগুনিয়ে ওঠে মনের গভীরে— ‘যা হারিয়ে যায়, তা আগলে বসে রইব কত আর?/ আর পারিনে রাত জাগতে, হে নাথ, ভাবতে অনিবার।’

পুরোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে রাখার উপায় আমাদের নেই। পরিবর্তনশীল সময়কে যে কিছুতেই অস্বীকার করা যাবে না! তবে ভেবে দেখেছি, এই পরিবর্তনের একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তা যতটা না খারাপ হয়, তার চেয়ে হয়তো ভালো হয় বেশি।

ছোটবেলায় সেই বন্ধুর সঙ্গে আমর মিশতে খুব ভালো লাগত, যার বাড়িতে বই আছে। আবার বই থাকলেই তো হবে না, সে তার বইয়ের সম্ভার থেকে আমাকে পড়তে দেবে কি না, এটাও দেখার বিষয় ছিল। তেমন বন্ধু হয়েওছিল দু’-একজন। তখন থেকে বই পড়ার অভ্যাস এমন হল, যখন যেখানে থেকেছি, খোঁজ করেছি কোথায় লাইব্রেরি রয়েছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ইছাপুর স্টেশনের কাছাকাছি একটি লাইব্রেরির সন্ধান পেয়েছিলাম। অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির লাইব্রেরি। বাবা ছিলেন মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরিতে, কাজেই সেখানকার সভ্য হতে অসুবিধা হল না। এত বড় লাইব্রেরি! অসংখ্য বই। সব দেখে কেমন পাগল পাগল অবস্থা। যতটা পেরেছি পড়েছি।

একসময় ইছাপুর ছেড়ে চলে আসতে হল। সেই লাইব্রেরির কথা আজও মনে পড়ে মাঝেমধ্যে। ভাবি, একদিন সেখানে যাব। যাওয়া আর হয়নি কোনও দিন। গিয়ে কী বলব? এতদিন বাদে তেমন কেউ সেখানে থাকবেন না, যিনি আমাকে চিনতে পারবেন। সেই লাইব্রেরি কি আজও রয়েছে? যদি সেই লাইব্রেরি থাকেও, সেখানে গেলে আমার সেই যুবকবেলার অনুভব কি আদৌ কারও সঙ্গে বিনিময় করতে পারব? কেন শুনবেন তাঁরা আমার মতো অচেনা একজনের কথা! আমার সেই হারিয়ে যাওয়া যৌবনের কথা! লাইব্রেরিকে ভালোবাসার কথা! বই নিয়ে আমার মনের অনুভব ও উত্তেজনার কথা!

তার পরে যে কত ঘাটে ঘুরে বেড়ালাম! কোথাও একটু থিতু হয়ে বসে যে লাইব্রেরির খোঁজ করে বইয়ের সন্ধান করব, তা আর হয়ে উঠল না। আমার মনের ভিতরে সেই ইচ্ছেটা কিন্তু রয়েই গেল। বিশাল বৃক্ষ হয়ে নয়, বনসাই হয়ে। আমার ঘরে বই এমনভাবে আমাকে ঘিরে ধরছে, যা নিয়ে নিত্য অশান্তি। ভাবি, এখনও কি মানুষের মন খুঁজে বেড়ায় সেই পুরোনো বইয়ের পাতার চেনা সুবাস?

একহাতে কাগজের বই ধরে অন্য হাতে চা বা কফির কাপে চুমুক দেওয়ার যে তৃপ্তি, তা হয়তো কোনও আধুনিক ই-রিডার বা স্ক্রিনের আলো কখনওই দিতে পারে না। বই পড়া কেবল তথ্য আহরণের মাধ্যম নয়, এক গভীর নান্দনিক অভিজ্ঞতা, যার সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক চিরকালের। একটি ছাপা বইয়ের নিজস্ব শরীর থাকে। তার মলাট, বাঁধাই, কাগজের খসখসে স্পর্শ এবং সবচেয়ে বড় কথা হল, তার মন মাতানো গন্ধ।

নতুন বইয়ের প্রেসের কালির ঝাঁজালো গন্ধ কিংবা কোনও পুরোনো লাইব্রেরির আলমারিতে জমা হওয়া হলুদ পাতায় মিষ্টি ধুলোর সুবাসের মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ অনন্য। বিজ্ঞানীদের মতে, কাগজের লিগনিন এবং সেলুলোজ সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে যাওয়ার সময় যে সুবাস তৈরি করে, তা মানুষের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও স্মৃতিকাতরতার সঞ্চার করে।

ই-বুকের যুগে হয়তো শত শত বই পকেটে নিয়ে ঘোরা সম্ভব, কিন্তু নতুন বইয়ের পাতায় আঙুল বোলানো বা কোনও প্রিয় লাইনের নীচে যত্ন করে দাগ দেওয়ার যে অনুভূতি, তা ডিজিটাল ফন্ট এবং পিক্সেলের আলোয় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। বর্তমান সময় হল যেমন দ্রুততার, তেমনই বিভ্রান্তির। স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটে বই পড়ার সময় একের পর এক নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়ার মেসেজ পাঠকের মনোযোগ ভেঙে দেয়। ফলে পাঠের গভীরতা কোথাও যেন হারিয়ে যায়।

অন্যদিকে একটি মুদ্রিত বই হাতে নিয়ে বসলে পাঠক নিজেই বাইরের সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক নিজস্ব জগতে প্রবেশ করতে পারেন। সেখানে তিনি ও লেখাই কেবল মুখোমুখি। এই দীর্ঘ মনোযোগ এবং নিবিড় মানসিক যোগাযোগ মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে গড়ে ওঠে।

আমাদের শৈশব ও কৈশোরের এক বড় অংশজুড়ে ছিল পুরোনো বইয়ের দোকান, পাড়ার লাইব্রেরি বা কোনও বইপ্রেমীর বসার ঘর। আলমারির কাচের পিছনে সারি সারি সাজানো বইয়ের গন্ধ, বইয়ের কোণ মুড়ে রাখা কিংবা প্রথম পাতায় প্রিয় মানুষের সুন্দর হাতের লেখায় শুভেচ্ছাবাণী, এ সবই আমাদের সংস্কৃতির এক মূল্যবান দলিল। আড্ডার মাঝখানে কোনও নতুন বই উপহার দেওয়া বা বই অদলবদল করার মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল, আজকের পিডিএফ ফাইল শেয়ার করার যুগে তা বিরল।

যদিও প্রযুক্তির উৎকর্ষে ডিজিটালি বই পড়ার সুবিধাকে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু দিনশেষে প্রযুক্তি সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য আনলেও তা হৃদয়ের গভীরে স্পর্শ করতে পারে না। পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও বইপ্রেমীরা ফিরিয়ে আনছেন মুদ্রিত বইয়ের কদর। কারণ মানুষ বুঝতে পারছে, পর্দায়

ভেসে থাকা শব্দ আর কাগজের বুকে আঁকা অক্ষরের মধ্যে ফারাকটা আত্মিক। বইয়ের ধুলোমাখা পাতা আমাদের শেখায় থমকে দাঁড়াতে, একটু ধীরে ভাবতে, যান্ত্রিক জীবন থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেতে। তাই এখনও সবচেয়ে বড় বিশ্বস্ত বন্ধু হল একটি ছাপানো বই। ছাপা অক্ষরের এই রূপকথা যেন কখনও হারিয়ে না যায়। তা রক্ষার দায়িত্ব কিন্তু নিতে হবে আমাদেরই।

4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)

সফলতা কাকে বলে