Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

Share Links:

সুদীপনারায়ণ ঘোপ্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

বঙ্গাব্দের সূচনা কে করেন, শশাঙ্ক না আকবর? এ প্রসঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংশুক চ্যাটার্জি বলেন, ‍‘শশাঙ্কর আমলে বাংলা ভাষা ছিল না। কাজেই তিনি বাংলার জন্য আলাদা সাল চালু করেছিলেন, এটা ভাবা বেশ বাড়াবাড়ি। ইতিহাস বলে, আকবর বাংলা জয় করার পর এখানে এক প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। তারা যখন দেখল, বাংলা থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটা ক্যালেন্ডার দরকার, তখন সেটাকে হিন্দু শকাব্দের সঙ্গে সংযুক্ত না করে বরং মুসলিম হিজরির সঙ্গে কানেক্ট করেই সেলিব্রেট করা যাক বলে ভাবে। খুব সম্ভবত সেভাবেই আকবরের দূতরা বঙ্গাব্দ চালু করে গিয়েছিলেন।’

তবে বহু গবেষক দেখিয়েছেন, বাংলা ভাষা অন্তত ২৬০০ বছরের প্রাচীন। তাই শশাঙ্কর আমলে বাংলা ভাষাই ছিল না, এ যুক্তি ধোপে টেকে না। ছ’য়ের দশকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা বর্ষপঞ্জী সংস্কারের জন্য ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহকে সভাপতি করে সরকার যে কমিটি গঠন করেছিল, তাদের স্পষ্ট রায় ছিল, সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে বঙ্গাব্দের সূচনা করেন। কিন্তু তা যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত। অমর্ত্য সেন একাধিক লেখায় আকবরকেই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন (‘দ্য আরগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’)। তাঁর বক্তব্য যে সঠিক নয়, তা নীচের আলোচনা থেকে বোঝা যাবে।

ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষে শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে এক সামন্ত রাজা। পরে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম গৌড়ের শাসক হন। রাজধানী ছিল বহরমপুরের কাছে কর্ণসুবর্ণতে। শশাঙ্ক বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম প্রচলন করেন। পরবর্তীকালে মোঘল সম্রাট আকবর কর আদায়ের সুবিধার্থে সৌরবর্ষ অনুসারে তারিখ-ই-ইলাহি প্রণয়ন করেন। শশাঙ্ক প্রবর্তিত বঙ্গাব্দের সঙ্গে তা মিলিয়েই করেন। শকাব্দ অনুসারে বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস ছিল চৈত্র। পরে তা বদলে বৈশাখ থেকে বছর শুরুর প্রথা চালু হয়।

শশাঙ্ক মারা গিয়েছিলেন ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। মোটামুটি ৪৫ বছর আগে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন এবং তখন (৫৯৩ খ্রিস্টাব্দ) থেকেই বঙ্গাব্দ চালু করা হয়, এটা ধরে নিলে এই তত্ত্ব অনেকটা মিলে যায়। কারণ বঙ্গাব্দের সঙ্গে খ্রিস্টীয় অব্দের ব্যবধানও ঠিক ৫৯৩ বছরের। বাংলা সাল ১৪৩১ যখন শুরু হয়, তখন খ্রিস্টীয় ২০২৪ সাল। ফলে গণনার ব্যবধান ৫৯৩ বছরের। আকবর সিংহাসনে বসেছিলেন ১৫৫৬ সালে। তাহলে সালটা হওয়া উচিত ছিল অধিকতম ২০২৪-১৫৫৬=৪৬৮, ১৪৩১ নয়। অতএব আকবর এতগুলি প্রদেশের মধ্যে শুধু বাংলায় তাঁদের জন্য সাল চালু করলেন, এটা অসার কথা। আর অঙ্কের হিসাবেও তা মেলে না।

কিন্তু বিপরীত মতগুলি তাত্ত্বিক কারণে আলোচনা করা প্রয়োজন। বঙ্গীয় সনাতনী সংস্কৃতি পরিষদের সম্পাদক প্রবীর ভট্টাচার্য বলেন, ‍‘ভারতে ইতিহাস বিকৃতির অনেক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। আকবরের হাতে বঙ্গাব্দের সূচনাও সেরকমই একটি। বঙ্গাব্দ বাঙালির নিজেদের হাতে তৈরি একটি বিষয়, কিন্তু এর কৃতিত্ব কেউ কেউ মোঘলদের দিতে ভালোবাসেন। তবে সেটা আসলে ঐতিহাসিকভাবে অসত্য।’ বাংলার এক হিন্দু রাজাকে তাঁর প্রাপ্য গৌরব ফিরিয়ে দিতেই পরিষদ পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই প্রচারাভিযান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের জিষ্ণু বসু বিবিসিকে বলেছেন, ‍‘একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, আকবরই বাংলা সাল গণনার রীতি শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের আধুনিক গবেষণা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নানা কারণে আকবরের পক্ষে বঙ্গাব্দ চালু করা সম্ভবই নয়। আবুল ফজলের প্রশাসন বিষয়ক আকরগ্রন্থ আইন-ই-আকবরীতেও বহু সালতামামি রয়েছে, কিন্তু সেখানেও বঙ্গাব্দের কোনও উল্লেখই নেই। আকবরের জীবদ্দশায় তিনি বাংলার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কখনওই পাননি। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধ জিতে মোঘলরা প্রথম বাংলা দখল করলেও তার পরও বহু বছর ধরে যুদ্ধ চলেছিল। আর বেছে বেছে সেই অস্থির বাংলাতেই আকবর একটি নতুন সাল চালু করবেন, সেটা খুব অস্বাভাবিক।’

আশ্চর্যের বিষয় হল, আকবরের দরবার যেখানে ছিল, সেই দিল্লি-আগ্রাতেও কিন্তু তারিখ-ই-ইলাহি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি, অথচ সেই ক্যালেন্ডারের একটি ‍‘অফশুট’ (শাখা) পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আজও সগৌরবে টিকে রয়েছে, যার নাম বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন।

বাংলায় মোঘল ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‍‘আসলে ফসল তোলার ভিত্তিতে সাল গোনার যে রেওয়াজ, যাকে ফসলি বলা হয়, সেটা কিন্তু ভারতের প্রায় সর্বত্রই চালু ছিল। বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ফসলিকেই আকবর বাংলায় একটু অদলবদল করে হয়তো রেগুলারাইজ করেছিলেন। সে কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে তাঁর। কিন্তু বঙ্গাব্দের প্রবর্তক আকবর, এটা বলা কতটা সমীচীন হবে, আমি ঠিক নিশ্চিত নই। আসলে সাল গণনার ইতিহাস এক জিনিস, আর তার বাস্তবায়ন অন্য। আকবরের আমলের বহু আগে থেকেই বাংলা সাল গোনা হত নিজের মতো করে। তখন হয়তো পদ্ধতিটা বদলেছে। বাংলা সনের একটি বিশেষত্ব হল, আকবর ভারতজুড়ে বহুধর্মে গ্রাহ্য যে ক্যালেন্ডার তারিখ-ই-ইলাহি চালু করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন, সেটার প্রভাব কিন্তু আজও টিকে রয়েছে শুধু বঙ্গাব্দেই। আকবরের আমলে যখন মুসলিম ক্যালেন্ডার বা হিজরির প্রথম সহস্রাব্দ শেষ হয়ে আসছিল, তখন তিনি তাঁর রাজত্বে একটি বহু-সংস্কৃতির ক্যালেন্ডার চালু করার প্রয়োজন অনুভব করেন। সেটাই ছিল তারিখ-ই-ইলাহি। েসই ক্যালেন্ডার হিন্দু সূর্যসিদ্ধান্ত রীতি অনুসরণ করত, আবার মুসলিম হিজরির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যও তাতে সংযোজিত হয়েছিল, যেমন, হিজরির চান্দ্র ইতিহাস।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন