
দয়াময় পোদ্দার
কথায় আছে, কন্যা পিতার আর পুত্র মায়ের। জীবন বয়ে চলে এমন বিভিন্ন সাধারণ কথায়। আর চলতে চলতে কথা শুধু কথার কথা থাকে না। সমাজতান্ত্রিক পরিবারের মূল অথবা বিশ্বাস হিসাবে প্রোথিত হয়েছে, যেন বীজগণিতের সূত্র মেনে অঙ্কের ডালপালা মেলে বিস্তার এবং একদিন সমাধানে পৌঁছনো।
শিবচরণ রামরতন গুপ্তা মুম্বাইয়ের বাসিন্দা ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত। স্ত্রী মীনা গুপ্তা। শিবচরণ কাপড়ের ব্যবসা করতেন। নিজের প্রচেষ্টায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির এত শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছিলেন যে, একদিন তিনি লাখপতি থেকে কোটিপতি হয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভ্রান্ত পরিবার। শিবচরণ এবং মীনা দেবীর তিন কন্যাসন্তান। এই তিনকন্যাকে তাঁরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। তাঁদের জীবনে কোনও কিছুর ঘাটতি রাখেননি। গুপ্তা পরিবারে এই তিন কন্যাই একাধারে কন্যা ও পুত্র।
‘দশপুত্রসমা কন্যা দশপুত্রান্প্রবর্দ্ধয়ন। যতফলংলভতে মর্ত্যস্থল্লভাংকন্যাযৈকয়া।।’ (স্কন্দপুরাণ, কৌমারিকা খণ্ড ২৩.৪৭)
একটি কন্যাসন্তান দশটি পুত্রের সমান। দশটি পুত্রকে লালন-পালন করলে মানুষ যে পুণ্য বা শুভ ফল লাভ করে, কেবল একটি কন্যাসন্তানকে সযত্নে প্রতিপালন করলেই একই ফলপ্রাপ্তি হয়। আর এভাবেই প্রোথিত হয়েছে পরিবারে কন্যার স্থান।
শিবচরণ রামরতন গুপ্তা ব্যবসা করতে করতে তিন কন্যাকে লেখাপড়া শিখিয়েই থেমে থাকেননি। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিলেন।
‘যত্র নার্যস্তু পুজ্যন্তে রমন্তে তন্ত্র দেবতাঃ।
যত্র তাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ।।’ (মনুস্মৃতি, ৩-৫৬)
যেখানে নারীদের সম্মান বা পূজা করা হয়, সেখানে দেবতারা আনন্দিত হন। আর যেখানে তাঁদের সম্মান করা হয় না, সেখানে সমস্ত সৎকর্ম বা অনুষ্ঠান বিফলে যায়।
তিন কন্যাই স্কুল শিক্ষিকা হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন। বড় কন্যা নেপালে, মেজো কন্যা মুম্বাইয়ে, আর ছোট কন্যা উত্তরপ্রদেশে প্রতিষ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সুখী এবং ব্যস্ত।
তারপর আসে সেই সময়, যখন প্রকৃতির নিয়মেই শিবচরণ রামরতন গুপ্তার বয়স হতে থাকে এবং ব্যবসা গুটিয়ে নিতে থাকেন। রাজা সিকান্দারও তা-ই করেছিলেন। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ইউনানে জন্ম নেওয়া একটি ছেলে হয়তো কখনও ভাবেননি, তিনি একদিন মেসোডেনিয়ার রাজা হবেন। কিন্তু ২০ বছর বয়সে তিনি রাজা হন। শুধু রাজা নন, ভূগোল-সহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল। ১০ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন এবং সেই সময়ে অনেক যুদ্ধের মধ্যে ২০টি বড় যুদ্ধ লড়েছিলেন। ইউনান থেকে মরক্কো, সিরিয়া, ইরান এবং আফগানিস্তান পর্যন্ত এলাকা জয় করেছিলেন।
যুদ্ধে অনেক সাধারণ মানুষ-সহ নিজের পরিচিতদেরও হত্যা করতে হয়েছিল। েসই হত্যা পরে তাঁকে কুরে কুরে খেতে থাকে। সমস্ত কিছু ছেড়ে দিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতে থাকেন এবং ৩২ বছর বয়সে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তিনি বলে যান, ‘যখন আমার মৃতদেহ নিয়ে কবরস্থানে যাবেন, তখন আমার হাত দু’টিকে বাইরে দু’দিকে বের করে রাখবেন, যাতে দুনিয়া যেন জানতে পারে, মানুষ খালি হাতে আসে, আর এই দুনিয়া থেকে খালি হাতে যায়।’
শিবরতন ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার পরে পরিচিত পরিধি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। পরিস্থিতি একদিন এমন হয় যে, সরিতা নামের এক মহিলা দু’বছর পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করেন এবং খাবার দেন। আর সেই সময় তিন কন্যা বাবা-মায়ের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নেন। কিন্তু হলিউড সিনেমা ভেনদেট্টা (vendetta) য় একজন পিতা ক্লাইভ স্ট্যান্ডেন (clive standen) পিতার চরিত্রাভিনেতা তাঁর মেয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে নিজের জীবনকে বাজি লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
ধীরে ধীরে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষ দু’জন একদিন মুম্বাই থেকে পাড়ি দেন হরিয়ানার সোনপতে। একটি বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নেন। সেখানে আশ্রয় নেওয়ার তিন বছর পরে মীনা গুপ্তা মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুর দু’বছর পরে শিবরতন রামচরণ গুপ্তাও মারা যান। বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তখন তিন কন্যার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে পিতার সৎকারে কেউ উপস্থিত থাকতে পারবেন না জানালে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ সৎকারের দায়িত্ব নেয়।
নেপালে থাকা জ্যেষ্ঠা কন্যা বাবার সৎকারের জন্য ৫,০০১ টাকা পাঠিয়ে দেন আর ভিডিয়ো কলে বাবার দেহ পঞ্চভুতে বিলীন হয়ে যাওয়া দেখেন। তবে ঘটনা হৃদয়বিদারক হয়, যখন তিনি কর্তৃপক্ষকে বলেন, ‘আর কতক্ষণ লাগবে? আমাকে স্নান করতে হবে। অনেক কাজ পড়ে আছে।’
জন্মদাতা পিতার অন্তিম যাত্রা, দেহ পুড়ছে বেওয়ারিশের মতো শ্মশানে। উচ্চশিক্ষিত তিন মেয়ের একজনও উপস্থিত হননি। বড় মেয়ের কাছে পিতার মৃত্যু বা দেহ পুড়ে যাওয়াটা বড় নয়, তাঁর স্নান করাটাই মুখ্য। পিতার অন্তিম যাত্রায় কাছের কোনও মানুষ নেই। উচ্চশিক্ষিত মেয়ে, সফল ব্যবসায়ী পিতা। তাহলে কি তিনি হেরে গেলেন, নাকি হেরে গিয়েও আসলে জিতে গেলেন, আর আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতিতে রেখে গেলেন একটি প্রশ্ন মূল্যবোধের!

