
মতিউর রহমান
বর্তমান ইঁদুরদৌড় তথা প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে শিশুদের আর নেই সেই শৈশব। হারিয়ে গিয়েছে। আমরা অভিভাবকরা তাদের ওপর কত কিছুই না চাপিয়ে দিচ্ছি! পড়াশোনা তো ভালোভাবে করতেই হবে, পাশাপাশি শিখতে হবে নাচ, গান, সাঁতার, ক্যারাটে-সহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা। এককথায়, এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ছোট্ট শিশুকে। এত কিছুর চাপে তারা হাঁপিয়ে ওঠে। তাদের থাকে না আনন্দের অবকাশ। পূরণ হয় না তাদের ইচ্ছে বা সাধ।
অনেক শিশু কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছন্দ অনুভব করে। সেখানে শ্রম ও মনোযোগ দিলে তাতে সে সফল হতে পারত। কিন্তু তাকে সেখান থেকে সরিয়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ে শামিল করা হয়। এতে তার মানসিক শান্তি, তৃপ্তি ও আনন্দকে টুঁটি টিপে মারা হয়। নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্ণতার বাসিন্দা হয়ে ওঠে ছোট্ট শিশু।
বর্তমানে শিশুদের নেই মাথার উপর একখণ্ড আকাশ। সে বন্দি ঘর ও বাইরে। টানা পড়াশোনা, টিউশন, স্কুল। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, ছোটাছুটি বা ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ কোথায়! কোথায় অনাবিল আনন্দে ভেসে যাওয়ার সুযোগ! বাবা-মা কড়া শাসনে তাদের আগলে রাখেন। শেষমেশ মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে ওঠে শিশু। স্মার্টফোনে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টুইটারে হারানো আনন্দ খোঁজে। ফটো, ভিডিয়ো পোস্ট করে। এই সমাজ বদল, জীবন বদল সত্যিই কি শিশুদের ভালো করে? কখনও ভেবে দেখেছেন অভিভাবকরা?
শিশুদের জীবনের এই বাঁকবদল তাদের অশেষ ক্ষতি ডেকে আনছে। শিশুরা যেমন খেলার সঙ্গী পায় না, তেমন তাদের মনের কথা বলার মতো কাউকে পায় না। এতে খেলাধুলা বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ইচ্ছে নষ্ট হয়ে যায়। বাড়ে মানসিক অস্থিরতা, শিশু হয়ে উঠে এককেন্দ্রিক। শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়। সামাজিক দিক দিয়েও সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার মানসিকতা নষ্ট হয়। সে একাকী, অসামাজিক হয়ে ওঠে।
খেলাধুলা শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশসাধন করে। কয়েক বছর আগেও শিশুরা বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে মাঠে যেত। খেলত, হইহুল্লোড়, চেঁচামেচি, সবই চলত। এতে তারা প্রচুর আনন্দ পেত। একাকিত্ব, অবসাদ, একঘেয়েমি দূর হত। পুনরায় সতেজ মন নিয়ে ফিরে যেত পড়াশোনায়। ঐক্যবদ্ধ, সুষ্ঠু, সুস্থ পরিবেশে শিশুর বিকাশ ঘটত। কিন্তু বর্তমানে আর সে দিন নেই বললেই চলে। মাঠের পরিবর্তে তারা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। খেলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
আগেকার দিনে বাড়ির বড়দের কাছে ছোটরা নানারকম গল্প শুনত। দাদু-দিদিমা, বাবা-মায়েরা গল্পের ঝুলি নিয়ে বসতেন। ঠাকুরমার ঝুলি, রূপকথার গল্প, ভূতের গল্প গভীর আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে শুনত শিশুরা। বর্তমানে দিন বদলেছে। সেসব গল্প আর টানে না তাদের। বর্তমানে তারা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে। সময় পেলেই তাতে নানারকম গেম খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সহনশীলতা, পারিবারিক মেলামেশা, মানবিক বোধ বিপন্ন হচ্ছে। সুস্থ সমাজভাবনার শেকড় ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।
অন্যদিকে রয়েছে অভাব ও দারিদ্রের দুষ্টচক্রে বিপন্ন শৈশবের ছবি। এমন অনেক শিশু রয়েছে, যাদের পড়াশোনা, খেলাধুলা বা বিনোদনের কোনও সুযোগ নেই। খেটে পেটের ভাত জোগাড় করতে হয় তাদের।
২০১৭ সালের এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, ভারতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। নিজের পেটের খাবার জোগাড়ের পাশাপাশি পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদের ইটভাটা, কারখানা, হোটেল, রেস্তোরাঁ বা চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়। শিশুশ্রম রোধে আইন রয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়ি হচ্ছে কতটা, সেটাই প্রশ্ন। পুলিশ-প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের জীবনযন্ত্রণা দূরীকরণে উদাসীন। শিশুদের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে কে জোগাবে তাদের বাঁচার রসদ? কীভাবে চড়বে হাঁড়ি? উত্তরহীন প্রশ্ন রয়েই যায়।

