Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

Share Links:

ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ
প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক, 
স্নাতকোত্তর সরকারি শারীরশিক্ষা কলেজ, রানাঘাট

কমনওয়েলথ বিজয়ী খেলোয়াড়দের সঙ্গে গত ৯ অগস্ট ৭ নম্বর লোক কল্যাণ মার্গে ৩৯ জন ভারতীয় ক্রীড়াবিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক আলাপচারিতায় মিলিত হয়েছিলেন। পরপর তিনটি কমনওয়েলথ গেমসে বক্সিংয়ে স্বর্ণপদক বিজয়ী মিরাবাই চানু এক অনন্য নজির গড়েছেন। বাঙালি মেয়ে অস্মিতা দে কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে এই প্রথম জুডোতে স্বর্ণপদক লাভ করে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। ত্রিপুরার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে ছোটবেলা থেকেই পাড়ায় ডানপিটে বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাবা একটি সাইকেল সারাইয়ের দোকানে কাজ করে সংসার চালান। এই অবস্থা থেকে আজ অস্মিতা দে পাদপ্রদীপের আলোয়।

গ্লাসগোতে দু’টি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা খেলোয়াড়রা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেয়ার করেন। গেমসের শেষ দিন ছিল ভারতীয় বক্সারদের দিন। ওই দিন ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা বক্সাররা সাতটি স্বর্ণপদক এবং তিনটি রৌপ্য পদক পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে স্থানীয় এক ভারতীয় রেস্তোরাঁয় আনন্দ উদ্‌যাপন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ভারতীয় বক্সার লাভলিনা বরগোহাঁ লক্ষ করেন, রেস্তোরাঁর ন্যাপকিনে ছাপা ভারতের বিকৃত মানচিত্র। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে ফেটে পড়েন লাভলিনা। মানচিত্র থেকে উধাও উত্তর-পূর্বাঞ্চল। তাঁর প্রতিবাদে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল এবং সেই ন্যাপকিন বাতিল করেছিল রেস্তোরাঁ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লাভলিনার এই দৃঢ়তায় খুশি হন।

অপর ঘটনাটি উল্লেখ করেন বক্সার নরেন্দ্র বেরওয়াল। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সেই ঘটনার কথা জানান। বলেন, ঘটনাটি ২০১৫ সালের ওয়ার্ল্ড মিলিটারি গেমসের। ওই প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ডে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পাকিস্তানের এক বক্সার। তাঁর সহকর্মী সেনারা তাঁকে আগেই জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনওভাবেই হারা চলবে না। সহকর্মীদের কথায় নরেন্দ্র বেরওয়াল আরও উজ্জীবিত হয়েছিলেন। প্রথম দু’টি রাউন্ডেই পাকিস্তানি প্রতিদ্বন্দ্বীকে নকআউট করেন। কিন্তু দু’জনের মুখেই আঘাত লাগায় একই গাড়িতে তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে গাড়িতে পাকিস্তানি বক্সার নরেন্দ্রকে একটি কথা বলার অনুমতি চান। বেরওয়ালের সম্মতি পেয়ে পাকিস্তানি বক্সার বলেন, ‘তোমার নাম নরেন্দ্র। তোমার কোচের নাম নরেন্দ্র। আবার তোমাদের প্রধানমন্ত্রীর নামও নরেন্দ্র। এই নরেন্দ্র নামটির প্রতি ঘৃণা জন্মে গিয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীকে সেই ঘটনা বলতে গিয়ে হাসি চাপতে পারেননি নরেন্দ্র বেরওয়াল। হাসি চাপতে পারেননি নরেন্দ্র মোদিও। উপস্থিত সব পদকজয়ীও হেসে উঠেন।

গত বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসের ক্রমতালিকায় ভারত চতুর্থ স্থানে শেষ করেছিল। এবারের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসেও ভারত চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে। যদিও গত কমনওয়েলথ গেমসের ভারতীয়দের অন্যতম সফল ইভেন্টগুলি এবারের কমনওয়েলথ গেমসে বাদ ছিল।

গত তিন দশকের মধ্যে এবারের কমনওয়েলথ গেমস হল ক্ষুদ্রতম সংস্করণ। কারণ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজন করার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া শহরে। কিন্তু আর্থিক কারণ দেখিয়ে তারা নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। একটা সময় মনে হয়েছিল, এবারের কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এর বদলে ২০২৭-এ করতে হবে। কারণ হঠাৎ কোনও দেশই দায়িত্ব নিতে চায়নি। পরবর্তী সময়ে আলাপ আলোচনা করে গেমসের বাজেট কাটছাট করে স্কটল্যান্ড রাজি হয়। বাজেট কাটছাট হতেই কোপ পড়ে ইভেন্টের ওপর।

গত বার্মিংহাম (২০২২) কমনওয়েলথ গেমসের ১৯টি খেলার পরিবর্তে মাত্র দশটি খেলার প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয় গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে। এমন কয়েকটি ইভেন্ট বাদ পড়ে, যেগুলিতে বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সাফল্য বেশি ছিলা। বাদ যাওয়া কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, শ্যুটিংয়ে ভারত যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, এই চারটি ইভেন্টে ভারত জিতেছিল ২৫টি পদক।

ভারত যেসব আন্তর্জাতিক মাল্টিইভেন্ট স্পোর্টসে অংশগ্রহণ করে, সেগুলি হল, সাফ গেমস, এশিয়ান গেমস , কমনওয়েলথ গেমস এবং বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অলিম্পিক গেমস। সাফ গেমসে পদক তালিকায় ভারত বরাবরই শীর্ষস্থানে থাকে। গত এশিয়ান গেমসে (হ্যাংঝাউ চিন ২০২৩) ভারত ২৮টি স্বর্ণপদক, ৩৮টি রৌপ্য পদক এবং ৩৮টি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে মোট ১০৭টি পদক জিতে এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে সেরা ফল করে চতুর্থ স্থান পেয়েছিল। গত কমনওয়েলথ গেমসেও ২২টি সোনা-সহ ৬১টি পদক জিতে ভারত চতুর্থ স্থান পেয়েছিল। কিন্তু অলিম্পিক গেমসে আমাদের ১৫০ কোটির দেশের মানুষের পদক তালিকা কখনওই আশাব্যঞ্জক নয়।

অলিম্পিকস আসে, অলিম্পিকস যায়। প্রতিটি অলিম্পিকসে আমরা চাতক পাখির মতো একটি স্বর্ণপদকের প্রত্যাশায় তাকিয়ে থাকি। ভারতের অভিনব বিন্দ্রা অলিম্পিকসের ইতিহাসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে প্রথম স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন ২০০৮ বেজিং অলিম্পিকসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিংয়ে। ব্যক্তিগত ইভেন্টে দ্বিতীয় স্বর্ণপদক আসে ১২ বছর পর টোকিও ২০২০ অলিম্পিকসে নীরজ চোপড়ার হাত ধরে। তাছাড়া অলিম্পিক ইতিহাসে দলগত খেলা হকিতে ৮টি স্বর্ণপদক পেয়েছে ভারত।

অলিম্পিক গেমসের পদক তালিকায় ভারতের ক্রমতালিকা আমাদের ব্যথিত করে। এর জন্য বোধ হয় ভারত সরকার সাফ গেমস সংগঠন করে পদক তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে তৃপ্তি লাভ করে। এতে ভারতীয় খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পদক মেলে বটে, অলিম্পিকের মতো কি সম্মান মেলে?

কমনওয়েলথ গেমস কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলির মধ্যে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মাল্টি স্পোর্টস ইভেন্ট। কমনওয়েলথভুক্ত দেশ কারা? যেসব দেশ একসময় ব্রিটিশদের অধীনে ছিল, সেসব দেশ নিয়ে ১৯৩০ সালে কানাডার হ্যামিল্টন শহরে প্রথম একটি মাল্টি স্পোর্টস ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন এর নাম ছিল ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস। বিভিন্ন সময় এই গেমসের নাম পরিবর্তন হয়ে ১৯৭৮ সালে নামকরণ করা হয় কমনওয়েলথ গেমস।

২৩তম কমনওয়েলথ গেমসে পদক তালিকায় বরাবরের মতো এবারেও অস্ট্রেলিয়া ৭০টি স্বর্ণপদক, ৪৫টি রৌপ্য পদক এবং ৫৬টি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেছে। দ্বিতীয় স্থান এবং তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে, ইংল্যান্ড এবং কানাডা। আর ভারত চতুর্থ স্থান লাভ করে।

এবারের কমনওয়েলথ গেমসে সবচেয়ে সফল হয়েছেন ভারতীয় বক্সাররা। বক্সিংয়ে সাতটি স্বর্ণপদক এবং তিনটি রৌপ্য পদক-সহ দশটি পদক জিতে রেকর্ড করেন ভারতীয় বক্সাররা। কমনওয়েলথ গেমসে বক্সিংয়ে এটাই কোনও একক দেশের সর্বোচ্চ পদক জয়।

ত্রিপুরার বাঙালি মেয়ে অস্মিতা দে-র কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় স্বর্ণপদক জয় আমাদের কাছে একটা আলাদা অনুভূতি এনে দিয়েছে। গত এশিয়ান গেমসে ভারত চতুর্থ স্থান লাভ করেছিল। চিন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পরে ছিল ভারতের স্থান। গত সাফ (৮টি দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত মাল্টি স্পোর্টস ইভেন্ট) গেমসে ভারত পদক তালিকার শীর্ষস্থান লাভ করেছিল। গত অলিম্পিক গেমসে (প্যারিস ২০২৪) ভারতের পদক সংখ্যা একটি রৌপ্য পদক এবং পাঁচটি ব্রোঞ্জ পদক-সহ মোট ৬। পদক তালিকায় স্থান ৭১তম।

ভারত যে কটি আন্তর্জাতিক মাল্টি স্পোর্টস ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে, তার মধ্যে অলিম্পিকস বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। সেখানে বরাবরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য দেখা যায়। গত প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিকসে পদক তালিকায় শীর্ষস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় স্থানে চিন এবং তৃতীয় স্থানে জাপান। এর মধ্যে এশিয়া মহাদেশের দু’টি দেশ চিন এবং জাপান দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে ছিল।

এই পরিসংখ্যান থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান যে অনেক পিছিয়ে, তা সহজেই অনুমেয়। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও ভারতীয় ক্রীড়া ক্ষেত্র আন্তর্জাতিক স্তরে অনেক পিছিয়ে। কিন্তু কেন? ভারতে কীসের অভাব? ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশে সত্যি কি মেধার অভাব, নাকি সরকারি উদাসীনতা এর জন্য দায়ী? তার ওপর সর্বভারতীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলির অচলাবস্থা দীর্ঘদিনের। নিজেরা পদের পিছনে ছুটতে গিয়ে সকলেই ক্রীড়া রাজনীতির শিকার। ভারত ক্রিকেটে এখন প্রথম এক বা দুই ক্রমতালিকায় থাকে। হকিতেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে। কিন্তু ফুটবলের ক্রমতালিকায় ভারত এখন ১৩৮তম স্থানে। তাই বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা রাত জেগে বিদেশি দলের খেলা দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান।

ভারত সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রকের একটি সুনির্দিষ্ট ক্রীড়া নীতি থাকা জরুরি, যার মাধ্যমে মাল্টিইভেন্ট প্রতিযোগিতার খেলাগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, সঠিক কোচের মাধ্যমে বিদ্যালয় স্তর থেকে ক্রীড়া মেধা বাছাই করে তাদের অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না করলে অলিম্পিকসে একটি স্বর্ণপদকের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করাই সার হবে। সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে জাতীয় এবং রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাগুলিকে পরিচালনার গাইড লাইন দিয়েছে, অন্যান্য সর্বভারতীয় এবং রাজ্য ক্রীড়া সংস্থাকেও তার আওতায় নিয়ে আসুক ভারত সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রক। আমৃত্যু পদ ধরে রাখার রাজনীতি বন্ধ হোক। তার জন্য চাই সরকারের সদিচ্ছা। চাই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্রীড়াঙ্গনে নাক গলানো বন্ধ করা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা