
শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
অতীতের রেলগাড়ি আর বর্তমানের রেলগাড়ির অনেক তফাত। নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে গিয়েছে স্টিম ইঞ্জিনে টানা রেলগাড়ি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে অপু-দুর্গার কাশবনে ছুটতে ছুটতে রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার দৃশ্য সবাই দেখেছে। দৃশ্যটিকে স্বর্গীয় করে রেখেছেন কিংবদন্তি চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়।
কু ঝিকঝিক শব্দে কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বিশাল ইঞ্জিনটা অনেকগুলি বগিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এমন দৃশ্য নয়ের দশকেও দেখা যেত। বড় বড় চাকা। হিস্ হিস্ শব্দে সাদা বাষ্প আর কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে রাজার চালে লাইনের উপর দিয়ে পার হয়ে যেত। পুঁ-পুঁ হুইসেল দিত।
আজ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে রেলের স্টিম ইঞ্জিন। ২০০০ সাল শুরুর পরপরই তুলে নেওয়া হয়েছে স্টিম ইঞ্জিনগুলি। কু ঝিকঝিক শব্দ এবং পুঁ-উ-উ হুইসেল এখন ষাটের বেশি বয়স যাঁদের, তাঁদের কাছে এক স্মৃতিমেদুরতা। বর্তমানে রেলগাড়ি খুবই উন্নত। ভারতীয় রেল ট্র্যাক বেশ উন্নত। গতি বেড়েছে ভারতীয় রেলের।
ভারতীয় রেলপথের রেললাইনে আর ফাঁক থাকে না। সাত-আটের দশকে পরীক্ষায় প্রশ্ন আসত, দু’টি রেললাইনের মধ্যে ফাঁক থাকে কেন? উত্তরে লেখা হত, ট্রেনের চাকার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে উত্তপ্ত হয়ে রেললাইনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। সে কারণে দু’টি রেললাইনের মধ্যে ফাঁক থাকে।
অতীতে একটি ট্রেনের ১৫০ কিলোমিটার দূরত্ব যেতে সময় লাগত চার ঘণ্টার বেশি। বর্তমানে এই দূরত্ব আড়াই ঘণ্টাতেই যেতে পারে। ভারতীয় রেলের অতীতের সিগন্যাল ব্যবস্থা উঠে গিয়েছে। নয়ের দশকেও ম্যানুয়াল সিগন্যালিং ব্যবস্থা ছিল। কেবিন থেকে লিভার ফ্রেম টেনে পতাকার মতো সিগন্যাল ফেলা হত। রাতে সিগন্যালের পতাকা দেখা যেত না। সে কারণে রেলের বাবুরা সিগন্যালের উপরে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ‘পতাকা লণ্ঠন’ টাঙিয়ে দিয়ে আসতেন।
এখন পতাকা সিগন্যাল আর নেই। হারিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় রেলে উন্নত প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় মাল্টিপল অ্যাসপেক্টস কালার লাইট সিগন্যাল সংযোজিত হয়েছে। স্টিম ইঞ্জিন ভারতের যে কোনও বড় জংশন বা স্টেশনের সম্মুখে ঠাঁই পেয়েছে।
দার্জিলিং এবং নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়েতে আজও ঐতিহ্য অনুযায়ী রেলের ছোট স্টিম ইঞ্জিন চলাচল করে। স্টেশনে ট্রেন আসার ঘণ্টার ঢং-ঢং-ঢং-ঢং শব্দ আর বাজে না। বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এখন স্টেশনে ট্রেন আসার ঘোষণা মাইকে হয়। স্মার্ট ফোন ট্রেন আসার খবর দিয়ে দেয়।
স্বাধীনতার আগে এবং পরে কমবেশি তিন দশক কলকাতা ছাড়া গ্রাম ও মফস্সল জেলা শহরেও তেমন চিকিৎসক বা ডাক্তারবাবু ছিলেন না। গ্রামে গ্রামে চিকিৎসা করতেন চিকিৎসায় প্র্যাকটিস করা কিছু মানুষ। এডুকেশন হয়তো হায়ার সেকেন্ডারি ফেল। তবুও ডাক্তারি প্রাকটিস করতে করতে ওষুধপত্র ভালোই দিতেন। কাচের শিশিতে লাল জল রঙের ওষুধ, শিশির গায়ে কাগজের চৌকো দাগ বসিয়ে রোগীকে তিন দাগ, পাঁচ দাগ ওষুধ খেতে পরামর্শ দিতেন।
শহরে মেডিক্যাল পাস করা ডাক্তার বলতে এলএমএফরা ছিলেন। আরএমপি-রা ছিলেন। এলএমএফ বা লাইসেন্সশিয়েট অব দি মেডিক্যাল ফেকাল্টিরাই এমবিবিএস সমতুল্য ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে দেশে ডাক্তারিতে এমবিবিএস থাকলেও ছয়ের দশকেও পশ্চিমবঙ্গের মফস্সলে এমবিবিএস ডাক্তারবাবুরা ছিলেন হাতে গোনা।
অতীতে প্রেসক্রিপশন লেখার প্রথা ছিল না। পাঁচ-ছয়ের দশকে এমবিবিএস বা এমএস ডাক্তারবাবুরা প্রেসক্রিপশন লেখা চালু করেন। সেই প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ অনেক মফস্সল শহরেই মিলত না। আনাতে হত কলকাতা থেকে। এলএমএফ ডাক্তারবাবুরা রোগীদের শিশিতে জুলাফ লাল জলে ওষুধ দিতেন। কাগজের দাগ শিশিতে চিটিয়ে (সাঁটিয়ে) দিতেন। শিশির মুখে শোলার কর্ক বা ছিপি এঁটে দিতেন। জ্বর, পেটের অসুখ প্রভৃতি রোগের চিকিৎসা ১ টাকাতেই হয়ে যেত। ভাত বন্ধ, কাঁচাকলার ঝোল, সাবু, বার্লি, গাঁদাল পাতা, শুকনো মুড়ি ডাক্তারবাবুরা খেতে বলতেন।
স্বাধীনতার আগে পরে শহরে এবং গ্রামে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা খবুই জনপ্রিয় ছিল। বহু হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ফোঁড়া, পোড়ায় অপারেশন করতে পারতেন। অসাড় বা অজ্ঞান না করেই অপারেশন করতেন। শহরে পাস করা বড় বড় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন।
অতীতে কবিরাজদের পসার বেশ জমজমাট ছিল। হাড় ভাঙার চিকিৎসায় তাঁদের খুব সুনাম ছিল। অতীতে হাত-পা ভাঙলে হাসপাতালে যাওয়ার চল কম ছিল। সবাই ছুটতেন কবিরাজের কাছে। তাঁরা অসাড় বা অজ্ঞান না করেই ভাঙা জায়গা টানাটানি করে প্লাস্টার করে দিতেন। রোগী ভীষণ যন্ত্রণা পেতেন।
(চলবে)

