ড. রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া 
শিক্ষককে আমরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে গুরু বলে সম্বোধন করলেও এই শব্দটি কখনওই গুরু শব্দটির প্রতিশব্দ হতে পারে না। আর এটা হতে পারে না এ কারণে যে, ভারতীয় রীতি অনুযায়ী গুরু তিনিই হবেন, যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। ওই ব্রহ্মজ্ঞানী গুরু যাকেই শিষ্যরূপে গ্রহণ করুন না কেন, তাকে তিনি নিজ দায়িত্বে আত্মজ্ঞান লাভে সহায়তা করে থাকেন। আসলে এই পথ আধ্যাত্মিকতার পথ। গুরু ও শিষ্য উভয়েই উভয়ের প্রতি চরমভাবে আকর্ষিত হবে। তাই তো দেখা যায়, জগৎগুরু শঙ্করাচার্যকে যোগশিক্ষা দেওয়ার জন্য গৌড়পাদের শিষ্য গোবিন্দপাদ দীর্ঘকাল অপেক্ষা করেছিলেন। ইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য শঙ্কর চরিত-এ লিখেছেন, ‘শঙ্কর কত নদী, পর্বত, নগর, প্রান্তর অতিক্রম করিয়া, কত লোকের নিষেধ বাধা না মানিয়া, কত অনিদ্রা অনাহার সহ্য করিয়া বহুদিনে নর্মদা তীরে গোবিন্দপাদের গুহায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তিনি গুহা প্রদক্ষিণ করতঃ তাহাতে প্রবেশ করিয়া ভক্তি গদগদ কণ্ঠে গুরুদেবকে স্তুতি করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে গোবিন্দপাদের সমাধি ভঙ্গ হইল। শঙ্কর কি উৎসাহ লইয়া কত উদ্যমে গুরুর দর্শন পাইয়াছেন।’ গুরুও তাঁর সুযোগ্য শিষ্যকে তাঁর অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করে তবেই তৃপ্তি পেলেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘গুরু-শিষ্য উভয়কে পাইয়া পরম প্রীত হইলেন। গোবিন্দ দেখিলেন শিশু মূর্তির দেহ ও মনটি পবিত্র, পূর্ণ জ্ঞান ধারণে সমর্থ। শঙ্কর বুঝিলেন, শাস্ত্রে সদগুরুর যে সকল লক্ষণ বর্ণিত হইয়াছে, ইনি সেইসব লক্ষণযুক্ত গুরু। শিষ্য গুরুর সেবায় মন-প্রাণ অর্পণ করিলেন। আর গুরু শিষ্যকে আধ্যাত্মবিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তুলিতে যত্নবান হইলেন।’
আসলে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে থাকতে হবে অকপট বিশ্বাস। তবে আধ্যাত্মিকতার জগৎ এবং ইহজগতের যে অসাধারণ মেলবন্ধনও ঘটতে পারে, তা আমরা দেখি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্কের মধ্যে। গুরুর কৃপায় বিবেকানন্দের আত্মদর্শন তো হয়েইছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও রামকৃষ্ণ তাঁকে দিয়েই সারাবিশ্বের আপামর জনসাধারণ কীভাবে শান্তি পেতে পারে, তার সোপান তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন। অবশ্য অকপট বিশ্বাসের নিরিখে গিরীশ ঘোষ সকলকেই ছাপিয়ে গিয়েছিলে। তাই তো রামকৃষ্ণকে তিনিই প্রথম অবতার বলে বিশ্বাস করতেন। আর রামকৃষ্ণও নিয়েছিলেন তাঁর ওই সুযোগ্য শিষ্যের আধ্যাত্মিক সোপানের ব-কলমা।
প্রাচীন গ্রিসেও গুরু-শিষ্য সম্পর্ক যে কোন পর্যায়ের হতে পারে, তা আমরা পাই সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলদের জীবনচর্চা ও চর্যায়। যুক্তির কষ্টিপাথরে না ঘষে বিনা বিচারে মেনে নেওয়ার কথা বলায় সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড তাঁর সুযোগ্য শিষ্য প্লেটো মেনে নিতে পারেননি। প্রতিবাদস্বরূপ তিনি পরবর্তীকালে অ্যাকাডেমি তৈরি করে ছাত্রদের মধ্যে সক্রেটিসের দর্শন এমনভাবে প্রচার করা শুরু করেন যে, অচিরেই তা তাঁর শিষ্য অ্যারিস্টটলের দ্বারা পুষ্ট হয়। বিচারের নামে প্রহসন করে সক্রেটিসকে যারা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করেনি। কিন্তু সক্রেটিসের মতাদর্শ গুরু-শিষ্য পরম্পরা ক্রমে আজও সুরক্ষিত।
তবে শিক্ষকও যে গুরুর কাছাকাছি যেতেই পারেন, তারও পরিচয় আমরা আমাদেরই পরম্পরায় পাই। আর এই ভাবনাচিন্তার মূলে রয়েছে শিক্ষকতা নামক পেশার স্বমহিমা। এই পেশা স্বতঃমূল্যেই মূল্যবান। আর এই পেশায় যাঁরা নিযুক্ত ছিলেন, তাঁদের মহান কাজে ব্রতী বলেই মনে করা হত। এখন দিনকাল বদলে গিয়েছে। শিক্ষক সত্যিই বর্তমানে গুরু হয়ে উঠতে পারবেন কি না, সে সম্পর্কেও সন্দেহ দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষকতা করাটাও অন্যান্য পেশার মতো পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শিক্ষক নিজের কাছে নিজেই দায়বদ্ধ নন। ফলস্বরূপ ছাত্ররা তাঁর দ্বারা আকর্ষিতই হয় না। শিক্ষকদের জ্ঞানের গভীরতাও নিতান্তই কম। চেষ্টা ও দায়বদ্ধতা– দুটোই তলানিতে ঠেকেছে। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিই। ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিলেতে এমআরসিপি (লন্ডন) এবং এফআরসিএস (ইংল্যান্ড) ডিগ্রি একসঙ্গে করার জন্য তৎকালীন ডিন ডা. শৌরের কাছে প্রায় ৩০ বার আবেদন করার পর সুযোগ পেয়েছিলেন। নগেন্দ্রকুমার গুহরায় ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের আত্মজীবনী নামক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘শেষবার তিনি ডিনের নিকট উপস্থিত হলে ডিনের অনমনীয় মনোভাবের পরিবর্তন হইল।’ মেডিসিন ও সার্জারি ডিগ্রি সফলভাবে লাভ করার পর ডা. শৌর বিদায়বেলায় বলেছিলেন, ‘ডা. রায়, তোমাকে আমাদের শিক্ষায়তনে প্রথম ভর্তি হতে অনুমতি দিই নাই বলিয়া আমি সত্যি সত্যিই লজ্জিত। বাংলাদেশ হইতে কোনও ছাত্র যদি তোমার পরিচয়পত্র লইয়া ভর্তি হইবার জন্য আসে, তবে কোনওপ্রকার দ্বিধা না করিয়া তাহাকে ভর্তি করিয়া নিব।’ ডা. বিধান রায় ডা. শৌরকে বাংলাদেশ থেকে ছাত্র ভর্তির জন্য চিঠি লিখেছিলেন কি না, জানা নেই, তবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুযোগ্য ছাত্র সৈয়দ মুজতবা আলির জন্য এরকমই একটি পরিচয়পত্র লিখে দিয়েছিলেন। সেটি সৈয়দ মুজতবা আলি তাঁর গুরুদেব নামক বইয়ে নিজেই জানাতে কসুর করেননি। তিনি লিখেছেন, ‘ইউরোপ যাওয়ার জন্য অর্থসংস্থান করতে গিয়েছিলুম কাবুলে। ফরাসি ও ফারসি জানি বলেই অনায়াসেই চাকরি পেয়েছিলুম। তখনকার দিনে বিশ্বভারতীই ছিল একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে ফরাসি, ফারসি জার্মান একসঙ্গে শেখা যেত। দু’শো টাকা মাইনেতে গিয়েছিলুম; কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই কাবুল সরকার আবিষ্কার করলে, আমি জার্মানও জানি। মাইনে ধাঁ করে ১০০ টাকা বেড়ে গেল। পাঞ্জাবি ভায়ারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওজিরে মাওয়ারিফের (শিক্ষামন্ত্রী) কাছে ডেপুটেশন নিয়ে ধরনা দিয়ে বললেন, সৈয়দ মুজতবা এক আনঅরগানাইজড বিদ্যালয়ের ডিপ্লোমাধারী। আমরা পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ, এমএ পাশ। আমাদের মাইনে শ’-দেড়শ’, আর তার মাইনে ৩০০! এ অন্যায়।
অন্য পোস্ট: দড়ির খাটিয়ার বিকল্প নেই
শিক্ষামন্ত্রীর সেক্রেটারি ছিলেন আমার বন্ধু। তিনি ঘটনাটা আমার কাছে বর্ণনা করেছিলেন ফরাসিতে। জানো বন্ধু, তখন শিক্ষামন্ত্রী কী বললেন? খানিকক্ষণ চুপ করে জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, বিলকুল ঠিক, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, তোমাদের ডিগ্রিতে দস্তখত রয়েছে পঞ্জাবের লাট সাহেবের। তাঁকে আমরা চিনি না, দুনিয়ায় বিস্তর লাট-বেলাট আছেন। আমাদের ক্ষুদ্র আফগানিস্তানেও গোটাপাঁচেক লাট আছেন । কিন্তু মুজতবা আলির সনদে আছে রবীন্দ্রনাথের দস্তখত। সেই রবীন্দ্রনাথ, যিনি সমগ্র প্রাচ্যের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।’
বর্তমানে শিক্ষক আছেন, ছাত্র আছে, শিক্ষক দিবসও রয়েছে। তবে যেটার সবচেয়ে বেশি অভাব, সেটা হল মূল্যবোধ। যার সাবধানবাণী কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৯৪৮ সালেই কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহারের শুরুতেই দিয়েছিলেন এভাবে, ‘মানুষের যেসব বৃত্তিকে লোক এতদিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে, বুর্জোয়া শ্রেণি তাঁদের মাহাত্ম্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসাবিদ, আইন বিশারদ, পুরোহিত, কবি, বিজ্ঞানী— সকলকেই তারা পরিণত করেছে তাদের মজুরিভোগী শ্রমজীবী রূপে।’ বর্তমানে ডিজিটালাইজড শিক্ষাব্যবস্থার কল্যাণে মোবাইল ফোন বা ট্যাবের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের হাতে জুটছে প্রভূত ইনফরমেশন। কিন্তু সেসব ইনফরমেশনকে আত্মস্থ করে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, তা তারা শিখতেই পারছে না। শেখার জন্য চাই শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ডিজিটালাইজড প্ল্যাটফর্ম যথেষ্ট নয়। যত দিন যাচ্ছে, ডিজিটালাইজড প্ল্যাটফর্মের দৌলতে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা দু’টি ভিনগ্রহের বাসিন্দা হয়ে পড়ছে। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সির সাহায্যে নির্মিত ভার্চুয়াল শিক্ষক ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে ক্লাস নিচ্ছে, যার সঙ্গে কোনওরূপ যোগাযোগই সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে গালভরা গল্প করা যায়, জীবনের পথে পাথেয় করাটা খুবই কঠিন। শিক্ষকই যেখানে বাস্তবিক পক্ষে নেই, সেখানে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক কেমনভাবে দাঁড়াবে? শিক্ষক দিবসের তাৎপর্যই বা কী হবে? সবচেয়ে বড় কথা, জীবনে চলার পথে ছাত্ররা কোনও না কোনও শিক্ষককে অনুসরণ করতে চায়। এখন প্রশ্ন হল, ভার্চুয়াল শিক্ষক কী করে আদর্শ হতে পারে? ভার্চুয়াল শিক্ষকের সাহায্যে কি আমরা রক্ত-মাংসের রোবট তৈরি করছি না? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
অন্য পোস্ট: সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ১)
একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে শিক্ষা এখন ক্রমশ পণ্যের পর্যায়ে চলা যাচ্ছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীরণ হয়েছে। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা টাকার বিনিময়ে ডিগ্রি কিনছে, সেখানে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের মধ্যে কতটা মূল্যবোধ রয়েছে, তা নিয়ে সত্যিই সংশয় দেখা দিতে শুরু করেছে। শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের নানা ধরনের উপঢৌকন দেওয়াটা যেন বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর কাছে হাল ফ্যাশন। কিন্তু এই উপঢৌকন দেওয়াটা কোনওভাবেই শিক্ষককে অর্ঘ্য দেওয়া নয়। এই উপঢৌকন দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষককে হাতে রেখে ছাত্রছাত্রীরা প্রায়শই তাদের সহপাঠীদের থেকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে চায়। দেখা যাচ্ছে যে, বেশকিছু শিক্ষকও তাঁদের মূল লক্ষ্যে ব্রতী না থেকে নিজেদের নানা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ছাত্রছাত্রীদের নানাভাবে বিপথে চালনা করছেন। সরকার বিভিন্নভাবে নানা পুরস্কারের মাধ্যমে শিক্ষকদের সম্মাননা দিচ্ছে বটে, কিন্তু তার মধ্যেও কোনও কোনও ক্ষেত্রে কতটা পক্ষপাতহীনতা রয়েছে, তা বলা বেশ কঠিন ।
এখন প্রশ্ন, তাহলে কি কোনও আশার আলো নেই? উত্তরটা হল, অবশ্যই আছে। গুটিকয়েক শিক্ষক আজও শিক্ষকতাকে মিশন হিসাবেই নিয়েছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে তাঁদের নিজ ঔরসজাত সন্তান বিদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত। বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের আশ্রয় লাস্ট বেঞ্চে বসা, পড়া না তৈরি করতে পারা সেই ফেলু মার্কা ছেলেটি, যে কি না বর্তমানে বাজারে সবজি বেচে। সে-ই সবার অলক্ষে শিক্ষক দিবসে রাতেরবেলায় শিক্ষককে তার ছেলেমেয়ে-বউ নিয়ে গিয়ে প্রণাম করে যায়। বলে, ‘আশীর্বাদ করুন, আমার ছেলেটি যেন মানুষ হয়। তবে আপনার ছেলের মতো বিদেশে না গেলেও চলবে।’ তা শুনে অশীতিপর বৃদ্ধ শিক্ষকের বুক যায় ভরে। একটা দলাপাকানো কান্নায় গলা বুজে আসে। এই দৃশ্য দেখে ওই বৃদ্ধ শিক্ষকের দেওয়ালে টাঙানো ড. রাধাকৃষ্ণাণের ছবি কেবল ছবি থাকে না, তার চোখ আনন্দাশ্রুতে ভিজে যায়। মনে মনে ভাবে, মনুষত্ব বিনা শিক্ষক দিবস পালন মূল্যহীন। সারকথা এই যে, শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যোকার যে পবিত্র সম্পর্ক, তা একেবারেই মরুভূমির মরীচিকায় পরিণত হয়নি, মরূদ্যানও কিছু রয়েছে। তাই তো বছরে দু’-একবার খবরে দেখাই যায়, অমুক স্কুলে শিক্ষকের বদলি আটকাতে সারা গ্রাম ভেঙে পড়েছে। হতে পারে সংখ্যাটা নগণ্য, তবে তা এখনও শূন্য হয়ে যায়নি।


Excellent sir