Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

সত্য প্রসঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন (পর্ব ১)

শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর জীবনে সত্যকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তুলসীদাস তাঁর এক দোঁহায় বলেছেন,  ‘সত্য বচন অধীনতা পরস্ত্রী মাতৃ সমান।/ ইসসে্ না হরি মিলে, তুলসী ঝুট জবান।।’ তুলসীদাস খুব দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, ‘সত্য কথা বললে, ভগবানের শরণাপন্ন হলে এবং অপরের স্ত্রীকে মায়ের দৃষ্টিতে দেখলে ভগবান লাভ অবশ্যই হবে।’

Share Links:

মানস চক্রবর্তী 

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব হাতে ফুল নিয়ে মায়ের কাছে প্রার্থনা করছেন, ‘মা, এই নাও তোমার জ্ঞান, এই নাও তোমার অজ্ঞান, আমায় শুদ্ধা-ভক্তি দাও মা। এই নাও তোমার শুচি, এই নাও তোমার অশুচি, আমায় শুদ্ধা-ভক্তি দাও মা। এই নাও তোমার ভালো, এই নাও তোমার মন্দ, আমায় শুদ্ধা-ভক্তি দাও মা। এই নাও তোমার পুণ্য, এই নাও তোমার পাপ, আমায় শুদ্ধা-ভক্তি দাও মা।’ ঠিক তারপরই বলছেন, ‘যখন এইসব বলেছিলুম, তখন এ কথা বলিতে পারি নাই, ‘মা, এই নাও তোমার সত্য, এই নাও তোমার অসত্য। সব মাকে দিতে পারলুম, সত্য মাকে দিতে পারলুম না।‘ ঠাকুর মাকে সত্য দিতে পারলেন না কেন? ঠাকুর বললেন, ‘তাহলে মাকে যে সর্বস্ব দিলাম, এই সত্য রাখব কী করে।’

ভগবান ব্যাসদেব মহাভারত গ্রন্থে বলেছেন, সত্য ত্রয়োদশ প্রকার। যথা: ১) সমদর্শিতা ২) ইন্দ্রিয়নিগ্রহ ৩)অমৎসরতা ৪) ক্ষমা ৫)লজ্জা ৬) তিতিক্ষা ৭) অনসূয়া ৮) ত্যাগ ৯) ধ্যান ১০) সরলতা ১১) ধৈর্য্ ১২) দয়া এবং ১৩) অহিংসা।

সত্যের লক্ষণগুলি আমাদের মধ্যে নীতি-নৈতিকতার প্রবৃত্তি গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু ‘আমাদের লক্ষ্যশূন্য লক্ষ বাসনা গভীর আঁধারে ছুটিছে।’ তাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে সত্যপালনে বিশেষ তিনটি দিকের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া দরকার। প্রথমত, সত্য বাক্য, দ্বিতীয়ত, সত্য কর্ম, তৃতীয়ত, সত্য চিন্তা।

চিন্তার সত্যতা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ? বলা হয়, কলিতে মনের পাপ পাপ নয়। এ ধরনের কথা নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার একটি উপায়। সত্য চিন্তাই হল সত্য কাজের জনক। ‘গীতা’য় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,  ‘কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরণ্।/ ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে।।’

অন্য পোস্ট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ

মূঢ়বুদ্ধি ব্যক্তি কর্মেন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে মনে মনে ইন্দ্রিয়গুলির বিষয়ে চিন্তা করে তাকে মিথ্যাচারী বলে জানবে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব ঠিক এ কথাই বলেছেন, ‘মিথ্যা ভেক ভালো নয়। ভেকের মতো যদি মনটা না হয়, তবে ক্রমে সর্বনাশ হয়।’ অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণদেব বাহ‌্যাড়ম্বর চাননি। তিনি চেয়েছেন মন-মুখ এক করার সাধনা। অনেক লোকের হাততালির মোহে পড়ে সৎ হলে সেই সততা বেশিদিন থাকবে না। ঠাকুর চেয়েছেন, আমরা যেন ভিতর থেকে সৎ হই।

আমরা যদি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনযাপনটি একটু লক্ষ করি, তাহলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাব, ‘সত্য কথা কলির তপস্যা’, নিজের এই মহাবাক্যটিকে তিনি কীভাবে মান্যতা দিয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি এই ভেবে যদি কখনও বলে ফেলি যে, বাহ‌্যে যাব, যদি বাহ্যে নাও পায়, তবুও একবার গাড়ুটা সঙ্গে করে ঝাউতলার দিকে যাই। ভয় এই, পাছে সত্যের আঁট যায়।’

আর একবার যোগেনকে শ্রীরামকৃষ্ণদেব বাজার থেকে পালো দেওয়া ক্ষীর আনতে পাঠালে ঠাকুরের অসুখের কথা মাথায় রেখে যোগেন বলরাম বসুর বাড়ি থেকে তৈরি ক্ষীর পরদিন সকালে আনলে ঠাকুর তা গ্রহণ করেননি সত্যভঙ্গের ভয়ে। কারণ ওই ক্ষীর বাজারের ছিল না এবং দুপুরেই আনার কথা ছিল। বলেছেন, ‘রামের বাড়ি গেলুম কলকাতায়। বলে ফেলেছি, লুচি খাব না। যখন খেতে দিলে, তখন আবার খিদে পেয়েছে। কিন্তু লুচি খাব না বলেছি, তখন মেঠাই দিয়ে পেট ভরাই।’

শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর জীবনে সত্যকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তুলসীদাস তাঁর এক দোঁহায় বলেছেন,  ‘সত্য বচন অধীনতা পরস্ত্রী মাতৃ সমান।/ ইসসে্ না হরি মিলে, তুলসী ঝুট জবান।।’ তুলসীদাস খুব দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন, ‘সত্য কথা বললে, ভগবানের শরণাপন্ন হলে এবং অপরের স্ত্রীকে মায়ের দৃষ্টিতে দেখলে ভগবান লাভ অবশ্যই হবে।’ এ কথার সত্যতা রক্ষাকে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব একটি সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন। এই আদর্শটি জগতে স্থাপনের জন্য তিনি নিজেই এই বাণীর পরাকাষ্ঠা হয়েছেন। যদু মল্লিকের বাগানে যাবেন বলেছেন। সারাদিনের কাজের ভিড়ে তিনি সে কথা ভুলে গিয়েছেন। পুনরায় ওই কথা যখন স্মরণ হয়েছে, তখন রাত্রি। তিনি তখনই যেতে ইচ্ছুক। এমনকী সকলের নিষেধ অগ্রাহ্য করে ওই রাতেই হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি হেঁটেই গিয়েছেন মল্লিক বাড়িতে। গিয়ে দেখেন সদর দরজা বন্ধ। সকলে তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। দরজাটা একটু ফাঁক করে পা-টা একটু গলিয়ে মাটি স্পর্শ করে তিনবার বলেন, ‘আমি এসেছি, আমি এসেছি, আমি এসেছি।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए