কাজল মুখার্জি
গণেশ চতুর্থী এখন সারা ভারতের অন্যতম প্রধান উৎসব। সারা ভারতের মানুষ, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র, কর্নাটকের মানুষ এই উৎসবের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। সারা দেশে পালিত হলেও মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটক রাজ্যে এটি সবচেয়ে উৎসাহের সঙ্গে গণপতি উৎসব নামে পালিত হয়।
গণেশ চতুর্থী একটি উৎসব, যা হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। এই উৎসবটি হিন্দু পুরাণ অনুসারে যেদিন পালিত হয়, সেটি হল গণেশের জন্মদিন। গণেশকে সমস্ত বাধাবিঘ্ন অপসারণকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, গণেশ প্রতি বছর সমৃদ্ধি এবং সাফল্য নিয়ে আসেন।
ভক্তরা গণেশকে তাঁদের বাড়িতে এবং উৎসব প্রাঙ্গণে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, গণেশ তাঁদের সমস্ত কষ্ট দূর করবেন। গণেশ চতুর্থী বা গণপতি উৎসবে গণেশকে গণপতি বাপ্পা মোরিয়া বলে পুজো করা হয়। চতুর্দশ শতকে এক ভক্তের নাম অনুসারে গণপতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় মোরিয়া শব্দ। মোরিয়া গোসাবি নামের ওই ব্যক্তি গণেশের অতি বড় ভক্ত ছিলেন। কথিত আছে, তিনি গণেশের কাছ থেকে বর চেয়ে নিয়েছিলেন, যাতে গণেশের নামের সঙ্গে তাঁর নাম বরাবরের মতো জুড়ে যায়। তার পর থেকে ভক্তরা গণেশকে ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’ বা ‘মঙ্গল মূর্তি মোরিয়া’ বলে অভিহিত করে থাকেন।
গণেশ চতুর্থীর বিশেষত্ব:
মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকে গণেশ চতুর্থী ১১ দিন ধরে পালিত হয়। এটি চতুর্থীতে শুরু হয়, যখন ভক্তরা তাঁদের বাড়িতে এবং মন্দিরে গণেশের মূর্তি স্থাপন করেন। এই উৎসব অনন্ত চতুর্দশীতে গণেশ বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়। ভগবান গণেশের ভক্তরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। তাঁরা গণেশের ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করেন এবং গণেশ বন্দনায় গণেশ মন্ত্র পাঠ করেন। গনেশের আরতি করার পর ভক্তরা তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। গণেশকে ১৬টি বিভিন্ন ধরনের নৈবেদ্য দেওয়া হয়, যেমন, ফুল, ফল, মিষ্টি প্রভৃতি।
অভিষেক (স্নান): গণেশ মূর্তিকে পবিত্র জল, দুধ এবং অন্যান্য তরল দিয়ে স্নান করানো হয়।
আরতি (আলো দিয়ে পুজো): গণেশ মূর্তিকে প্রদীপ বা দিয়া দিয়ে পুজো করা হয়।
অন্য পোস্ট: যাত্রাপালায় বাড়ছে আস্থা ও ভরসা (শেষ পর্ব)
শ্রীশ্রীগণেশ পুজোর মন্ত্র:
ওঁ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্রবদনং লম্বোদরং সুন্দরম্, প্রস্যদন্মদগন্ধলুব্ধমধুপব্যালোলগণ্ড স্থলম্। দন্তাঘাত বিদারি তারিরুধিরেঃ সিন্দূরশোভাকরং। বন্দে শৈলসুতা সুতং গণপতিং সিদ্ধিপ্রদং কামদম্ (কর্মসূ)৷৷
ওঁ একদন্তং মহাকায় লম্বোদর গজাননম্। বিঘ্ননাশকরং দেবং হেরম্বং প্রণামাম্যহম্।।
পুষ্পাঞ্জলী মন্ত্র:
সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্বমঙ্গল হেতবে। পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নম নমঃ।।১
ওঁ একদন্তং মহাকায় লম্বোদর গজাননম্। বিঘ্ননাশকরং দেবং হেরম্বং প্রণামাম্যহম্।।২
হাতে ফুল নিয়ে হাতজোড় করে তৃতীয় মন্ত্রটি পাঠ করবেন।
ওঁ দেবেন্দ্র মৌলিমন্দার মকরন্দ কণারূণাঃ। বিঘ্নং হেরন্তু হেরম্ব চরণাম্বুজরেণবঃ৷৷৩
ভক্তরা প্রভু গণেশকে তাঁর প্রিয় মিষ্টি মোদক নিবেদন করেন। মোদক তৈরি করা হয় নারকেল এবং গুড় দিয়ে ভিজিয়ে বা ভাপিয়ে। ঠিকমতো তৈরি করতে পারলে এই মিষ্টি খুব সুস্বাদু হয়।
গণেশ চতুর্থীর উদযাপন:
১১ দিনব্যাপী এই উৎসবের সূচনা হয় প্রথম দিন ভক্তদের সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নানের মাধ্যমে। এই উৎসবের জন্য যেসব নতুন জামাকাপড় কেনা এবং তৈরি করা হয়, তাঁরা সকালে স্নানের পর সেগুলি পরে মন্ত্র এবং গান জপ করার ঐতিহ্যগত আচার অনুসরণ করেন।
অনেক বছর আগে মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকে বিশেষ কয়েকটি পরিবার, মন্দির এবং সর্বজনীন উৎসবের মাধ্যমে গণেশ চতুর্থী পালিত হত। কিন্তু এখন এটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থী সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকে গণপতি বাপ্পা মোরিয়া বা ভগবান গণেশের দৃষ্টিনন্দন বিশাল বিশাল মূর্তি তৈরি করা হয়। গণেশ উৎসবের শেষে সেই মূর্তি বিরাট শোভাযাত্রা সহকারে নদী, সাগর বা নিকটবর্তী জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। তারপর ফের পরবর্তী বছরের জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে ভগবান গণেশের আগমনের জন্য অপেক্ষা করেন।
গণেশ চতুর্থী হল ভগবান গণেশের সম্মানে একটি আনন্দপূর্ণ উৎসব। সমগ্র ভারতে, বিশেষ করে মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকে এই আনন্দপূর্ণ উৎসবের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র, সাধারণ মানুষ, বিখ্যাত মানুষ নির্বিশেষে সকলেই একত্রিত হয় এবং অত্যন্ত আন্তরিক ভক্তি এবং আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করে।
কলকাতায় ২০২৪ সালের গণেশ চতুর্থীর নির্ঘণ্ট— ৬ সেপ্টেম্বর, দুপুর ৩টে ৩১ মিনিট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর, বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত।

