Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

যাত্রাপালায় বাড়ছে আস্থা ও ভরসা (শেষ পর্ব)

প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান সময়ে যাত্রাপালা ক্ষয়িষ্ণু কেন? উত্তর একটাই, এখন যাত্রাপালা খুব বেশি ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু নয়। যাঁরা খবর রাখেন না, তাঁরা ক্ষয়িষ্ণু ক্ষয়িষ্ণু বলে চিৎকার করেন। সিনেমা কি বিংশ শতাব্দীর সাত-আটের দশকের মতো আছে? বহু সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কলকাতার বুকে থিয়েটার হলগুলি ভেঙেচুরে গিয়েছে। যাত্রাপালার তেমন দুর্দিন আজও আসেনি। রাজ্য সরকার ও বহু অপেশাদার যাত্রা কমিটি থেকে আজও যাত্রা উৎসবের আয়োজন করা হয়। বাংলার যাত্রামঞ্চে তরুণ প্রজন্মের বহু শিক্ষিত-শিক্ষিতা প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছেন।

বর্তমান প্রজন্মের খুবই পছন্দ অনল-কাকলি জুটিকে। আর যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে অনীক-মৌসুমি জুটিও অনেক দূর যাবে।

Share Links:

শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়

যাত্রাপালা নিয়ে ১৮৮২ সালে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়। একসময় যাত্রাপালা দিনেরবেলাতেও অভিনীত হত। আজও জঙ্গল ঘেরা বহু গ্রামে দিনেরবেলায় যাত্রাপালা অভিনীত হয়। বর্তমান সময়ে যাত্রাপালার গরিমা ও জনপ্রিয়তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ফাঁকা মাঠে টিন দিয়ে ঘেরা চট বা মোটা কাপড়ের আচ্ছাদনের প্যান্ডেলে টিকিটের যাত্রাপালা এখন খুব কম হয়। পাঁচ-ছয়-সাতের দশকের সেই কিংবদন্তি অভিনেতা-অভিনেত্রী, পালাকার, দলমালিকরা আর নেই। যাত্রার ঐতিহ্যপূর্ণ চিৎপুরের গদিঘরগুলি এখন অনেকটা ফিকে। গদিঘরের তক্তপোশে বিছানো সাদা ধপধপে গদি আর নেই। তক্তপোশের উপর গদি পলটে গিয়ে এসেছে আধুনিক আসবাবপত্র। পালাকার, সুরকারদের আগে অগ্রিম দেওয়া হত। সে অগ্রিমকে বলা হত ‘সাইদ’। রথের দিন প্রথম সুর দেওয়া হত। তাকে বলা হত ‘সুরভাঙা’। একসময় পেশাদার যাত্রাপার্টি বলে কিছু ছিল না।

অনল চক্রবর্তী ও কাকলি চৌধুরী।

যাত্রার আদি মঞ্চ শৌখিন যাত্রা। এ নিয়ে একটি গল্প রয়েছে। এক অলস দুপুরে কলকাতার বড়বাজারের একটি বৈঠকখানায় শখের যাত্রা করবেন বলে মতিলাল গোষ্ঠী, বাঁড়ুজ্যে গোষ্ঠী, ধর গোষ্ঠী আলোচনায় বসেছিল। মহড়াও শুরু হয়। একদিন মহড়া চলছে। ঠিক সে মুহূর্তেই একজন কলা বিক্রেতা সুর করে ‘চাই পাকা কলা’ বলে হাঁকতে-হাঁকতে পেরোচ্ছিলেন। বিশ্বনাথ, মতিলালরা কণ্ঠ শুনেই কলা বিক্রেতাকে ঘরে ডেকে পাঠালেন। নাম-ধাম জিজ্ঞেস করে জানলেন, ফেরিওয়ালার নাম গোপাল উড়ে। ওড়িশার জাজপুরে বাড়ি। গোপালের কণ্ঠস্বরের প্রশংসা করে যাত্রাপালায় অভিনয় করার প্রস্তাব দিলেন। গোপাল রাজি। রাধামোহন সরকার তক্ষুনি মাসিক ১০ টাকা বেতনে ‘বিদ্যাসুন্দর’ যাত্রাপালার ‘মালিনী’ চরিত্রে অভিনয় করার জন্য গোপাল উড়েকে বেছে নিলেন। ওস্তাদ হরিকিষণ মিশ্রর কাছে খেয়াল, ঠুংরি প্রভৃতি সংগীতে তালিম নিতে পাঠিয়ে দিলেন। নাচ-গান-অভিনয়ে গোপাল উড়ে ‘বিদ্যাসুন্দর’ পালার ‘মালিনী’কে জীবন্ত করে তুললেন। ভীষণ জনপ্রিয় হল পালাটি। ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে মঞ্চস্থ হয়েছিল পালাটি। পালাটির বিপুল সাফল্যের পর গোপাল উড়ের বেতন মাসিক ১০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছিল ৫০ টাকা। ওই যাত্রাপালাটি ছিল বঙ্গের প্রথম শৌখিন যাত্রা। পরে রাধামোহন সরকারের মৃত্যু হলে গোপাল উড়ে নিজেই একটি যাত্রাদল গড়েন। ওই যাত্রাদল ছিল চিৎপুরের প্রথম যাত্রাদল। সেটাই ছিল প্রথম পেশাদার যাত্রাদল।

প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান সময়ে যাত্রাপালা ক্ষয়িষ্ণু কেন? উত্তর একটাই, এখন যাত্রাপালা খুব বেশি ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু নয়। যাঁরা খবর রাখেন না, তাঁরা ক্ষয়িষ্ণু ক্ষয়িষ্ণু বলে চিৎকার করেন। সিনেমা কি বিংশ শতাব্দীর সাত-আটের দশকের মতো আছে? বহু সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কলকাতার বুকে থিয়েটার হলগুলি ভেঙেচুরে গিয়েছে। যাত্রাপালার তেমন দুর্দিন আজও আসেনি। রাজ্য সরকার ও বহু অপেশাদার যাত্রা কমিটি থেকে আজও যাত্রা উৎসবের আয়োজন করা হয়। বাংলার যাত্রামঞ্চে তরুণ প্রজন্মের বহু শিক্ষিত-শিক্ষিতা প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী এসেছেন।

পশ্চিমবঙ্গের একটি বর্ধিষ্ণু শিল্পের নাম যাত্রাশিল্প। আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি মানুষের সংসার নির্বাহ হয় যাত্রাশিল্প থেকে। অনল চক্রবর্তী, অনীক ব্যানার্জি, উৎপল রায়, মঞ্জিল ব্যানার্জি, ব্রহ্মময় চট্টোপাধ্যায় নীলকমল চট্টোপাধ্যায়, মেঘদূত গঙ্গোপাধ্যায়, বাবলি ভট্টাচার্য, ডা. তাপস কুমার, কানন মাইতি, বিদ্যুৎ গঙ্গোপাধ্যায়, সুকান্ত মুখার্জি, ভোলানাথ রায়, সজল ঘোষ, ভগীরথ গিরি, আশিস পতি, প্রবাল ব্যানার্জি, জি কর, কুমার বিশ্বনাথ, মনসুর আলিরা ভালো যাত্রাপালা লিখছেন। বর্তমান সময় মোবাইল ফোনের যুগ। নতুন প্রজন্মের চোখ এখন মোবাইল ফোনের নানারকম বিনোদনে। ঘরে ঘরে টিভি সিরিয়ালের রমরমা। সাত-আট কিংবা নয়ের দশকে যাত্রাপালাকে এই সস্তা ও সহজলভ্য বিনোদনের বিরদ্ধে লড়াই করতে হয়নি। এখন ভয়ানক লড়াই করে যাত্রাপালাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। কোনও একটি যাত্রাপালা দর্শকদের ভালো না লাগলে মুহূর্তের মধ্যে তা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে দেওয়া হয়। যাত্রাপালার মরশুম চলাকালীন লুকিয়ে-চুরিয়ে পালাটির ভিডিয়ো পোস্ট করে তার গণেশ উলটে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বেশকিছু স্বার্থপর, অব্যবসায়ী মালিকের হাতে পড়েও যাত্রা অবনমনের দিকে যাচ্ছে।

অন্য পোস্ট: নারীজাতি আজও প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি

চিৎপুর যাত্রার ‘বড়দা’ মাখনলাল নট্ট বলেছিলেন, ‘যাত্রার বাঁচার আশা নাই। অব্যবসায়ীর হাতে যাত্রা পড়লে ফল যা হয়, তাই-ই হয়েছে। মালিকরা ধরে আনছেন টিভি সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের। কই, যাত্রার হিরো-হিরোইনদের তো সিরিয়ালওয়ালারা ডাকছেন না! যাত্রা মালিকরা টিভির হ্যাংলামি ছাড়বেন না, তাই যাত্রাও বাঁচবে না।’

এছাড়াও বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাত্রাপালাকে টেনে নিয়ে যেতে হয়। তবুও আশার কথা, ছোট, মাঝারি, বড় দল মিলিয়ে আজও এই ইন্ডাস্ট্রিতে আনুমানিক ২০ হাজারের বেশি মানুষ রোজগার করে চলেছেন। আজও অনল চক্রবর্তী, কাকলি চৌধুরী, রুমা দাশগুপ্ত, সুবীর চট্টোপাধ্যায়, রাজেশ ভট্টাচার্য, অনীক ব্যানার্জি, মৌসুমী চ্যাটার্জি, রাজু বড়ুয়া, পল্লব মুখোপাধ্যায়, সমতা দাস, নভনীল, রোমিও চৌধুরী, কুমার রোহন, চন্দন হাটি, মৌ ব্যানার্জি, মঞ্জিল ব্যানার্জি, পিয়া দাস, তুষার পাল, অমিতকান্তি ঘোষ, কুমার সঞ্জু, পদ্মপ্রিয়া, ঐন্দ্রিলা, কুমার অনুভব, সুচন্দ্রিমা, দীপ, জিনা, নীলাদ্রি দাস, অরূপ ব্যানার্জি, চম্পা হালদার, মোনালিকা, সুদীপ্তা, প্রীতম বিশ্বাস, স্বপ্না চক্রবর্তী, পল মুখার্জি, রাহুল চ্যাটার্জি, পামেলা ভৌমিক, কৃষ্ণ কুমার, ঋত্বিক মুখার্জি, কুমার সবুজ, সঞ্জু কর, যোশেফ রাজ, জিৎ বসু, তিস্তা বসু, পিয়ালি বসু, প্রেমজিৎ, যুবরাজ, মিতালি চক্রবর্তী, দিপীকা, তরুণ কুমার, তিতলি, সুস্মিতা, কুমার শুভ, তাপস চ্যাটার্জি, রাজীব গুপ্তা, আঁচল, চৈতালি দাস, সব্যসাচী মৌলিক, বিবেকানন্দ মণ্ডল, প্রদীপ রুজ-সহ আরও বহু নতুন-পুরোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁদের অভিনয় দক্ষতায় যাত্রাপালাকে উজ্জ্বল ও জনপ্রিয় করে চলেছেন। এছাড়াও যাত্রাপালায় অভিনয় করতে এসেছেন বহু নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রী। তবে বর্তমান প্রজন্মের খুবই পছন্দ অনল-কাকলি জুটিকে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তবে এই জুটি অনেক দূর যাবে।

বাংলা ১৪৩১ সালে চিৎপুর-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক পেশাদার যাত্রাদল তৈরি হয়েছে। তা যাত্রার উন্নতি ও জনপ্রিয়তারই প্রমাণ দেয়। পালাকার ব্রহ্মময় চট্টোপাধ্যায় ও প্রযোজক নীলকমল চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এ বছর কলকাতায় ৩৫ থেকে ৪০টি নতুন যাত্রাদল তৈরি হয়েছে। কর্মসংস্থানও বেড়েছে। তাই বলাই যায়, যাত্রাপালার ওপর ভরসা ও আস্থা ক্রমশ বাড়ছে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Tuhin pal
Tuhin pal
1 year ago

Nice

Sakti Kumar Chattopadhyay
Sakti Kumar Chattopadhyay
1 year ago

অনবদ্য । সুন্দর ছাপাই । মহাশোরগোল ডট কম খবর ও প্রতিবেদনের মহাভারত ।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए