ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
প্রফেসর, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
জন্মেছিলেন ধনীর ঘরে। অভিজাত পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন প্রথম বাঙালি, যিনি স্কটল্যান্ডের অ্যাবার্ডিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেই সময়কার ব্যতিক্রমী ‘ডক্টর অব মেডিসিন’ (এমডি)ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। কেতাদুরস্ত, বিলাত ফেরত ডাক্তার পিতা চেয়েছিলেন পুত্রদ্বয়কে ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করতে। কেননা নিজের ডাক্তারি বিদ্যা দিয়ে বাংলা তথা ভারতের দুস্থ জনগণের সীমিত সেবাকার্য সম্পাদিত হলেও তাদের আর্থিক দুর্গতি ও ন্যায় বিচারের অধিকার প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভবপর ছিল না। ডাক্তারবাবুর শ্বশুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক, বাঙালি জাতিকে যিনি ঘুম থেকে তুলে, নতুন খাদ্য জোগান দিয়ে যুদ্ধের উপযোগী করে গড়ে তোলেন।
এখন এই চারটি চরিত্রের পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। প্রখ্যাত ডাক্তারবাবু হলেন কৃষ্ণধন ঘোষ, পুত্রদ্বয় ছিলেন অগ্নিযুগের দুই সাগ্নিক শ্রীঅরবিন্দ ও বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং শ্বশুর হলেন উনিশ শতকের ‘ভারতীয় জাগরণের ভোরের পাখি’ রাজনারায়ণ বসু। তাঁর কন্যা স্বর্ণলতা ছিলেন শ্রীঅরবিন্দের মাতা। ইতিহাসের কী আশ্চর্য সমাপতন! ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস, আর এই দিনেই আবির্ভূত হন শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ। মনে হয়, ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকেই পাশ্চাত্য(গ্রিস)-এর ইতিহাসের দেবী ক্লিও ভারতকে পাশ্চাত্য শাসন থেকে মুক্তিদানের জন্য এই দিনটি নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন!
উচ্চশিক্ষিত পিতা কৃষ্ণধন চেয়েছিলেন পুত্রকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। এজন্য ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে অরবিন্দকে মাত্র ছ’বছর বয়সে দার্জিলিঙের লরেটো কনভেন্টে ভর্তি করেন। এরপর পাশ্চাত্যের পরিবেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্য মাত্র আট বছর বয়সেই ম্যানচেস্টার শহরের এক বিখ্যাত স্কুলে তাঁকে পাঠানো হয়। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের সেন্ট পলস স্কুলে প্রবেশ করে অরবিন্দ ইংরেজি, গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তারপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কিংস কলেজে পাঠরত অবস্থায় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে আইসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। অরবিন্দের জীবনীকার পিটার হিস আমাদের জানিয়েছেন যে, এই পরীক্ষায় তিনি একাদশ স্থান লাভ করেন। শুধু তাই নয়, কেমব্রিজের ট্রাইপস পরীক্ষাতেও তিনি প্রথম স্থান লাভ করেছিলেন। এই সময়েই তিনি পাশ্চাত্যের পাশাপাশি প্রাচ্য সাহিত্যেও অনুরক্ত হন। বেদ, গীতা, পুরাণের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস পাঠ করেন। এই উপন্যাস কীভাবে তাঁর মানসক্ষেত্রের অভিমুখ পালটে দিয়েছিল, তিনি পরবর্তীকালে সে সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। আর এরই ফলস্বরূপ তিনি আইসিএস পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ঘোড়ায় চড়ার পরীক্ষায় গরহাজির হয়ে ব্রিটিশদের রাজ সরকারের অংশ হতে অস্বীকার করেন।
অন্য পোস্ট: কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরাট প্রভাব পড়তে চলেছে
বরোদার মহারাজা তৃতীয় সায়াজিরাও গায়কোয়াড় যখন ইংল্যান্ড পরিভ্রমণে যান, সে সময় জেমস কটনের সূত্রে উভয়ের আলাপ হয়েছিল। শ্রীঅরবিন্দ মনস্থির করেন, চাকরি করলে স্বদেশির অধীনেই করবেন, বিদেশি শোষকের তাঁবেদারি কখনও করবেন না। তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে বরোদা স্টেট সার্ভিসে যোগদান করেন। বরোদায় অবস্থানকালে তিনি সংস্কৃত, হিন্দি, ফারসি ও বাংলা সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। সেখান থেকেই তাঁর ‘দ্য ঋষি’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এজন্যই তাঁর ‘ঋষি’ নামকরণ হয়েছিল। ধীরে ধীরে তিনি স্বদেশের মুক্তিসাধনার যজ্ঞে নিজেকে সমর্পণ করেন। ধনীর দুলাল হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভগবান বুদ্ধের ন্যায় কৃচ্ছ্রসাধনেই পরিতৃপ্ত ছিলেন। তারপর তিনি ভারত মায়ের শৃঙ্খল মোচনকেই জীবনের অভীষ্ট করেন। এখানেও তাঁর পথ প্রদর্শক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকায় অরবিন্দ লেখেন, ‘কল্পনার স্বর্গরাজ্যে কীভাবে স্বপ্নের রঙিন বীজ বপন করতে হয়, তা সমকালে বঙ্কিমচন্দ্র অপেক্ষা আর কেহ এত সম্যকভাবে অবহিত ছিলেন না। প্রথম জীবনের বঙ্কিম ছিলেন একজন কবি ও বাহারি সাহিত্যিক, কিন্তু পরবর্তীকালের বঙ্কিম হলেন মার্গদ্রষ্টা ও রাষ্ট্র নির্মাণকারী।’
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর সৃষ্ট ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিংশ শতকের সূচনায় নব উত্থিত সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সমানতালে অগ্রসর হতে না পারার কারণে অনেক জাতীয়তাবাদী নেতাই ভিন্ন পথের সন্ধানী হন। শ্রীঅরবিন্দও সেই পথের পথিক হয়ে চরমপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাতীয় কংগ্রেস সে সময় ছিল ভারতের সকল রাজনীতি সচেতন মানুষের একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম। বরোদা থেকে বাংলায় এসে শ্রীঅরবিন্দ ভারতের সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের সলতেয় অগ্নি সঞ্চারের কাজটি শুরু করেন। আর তারই পরিণামে মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব এবং অপরাপর প্রদেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের সুখ-নিদ্রা হরণের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। অচিরেই বাংলা হয়ে উঠেছিল অবশিষ্ট ভারতের মুক্তি আবাহন যজ্ঞের চারণভূমি।
শ্রীঅরবিন্দ ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকায় ‘ন্যাশন্যালিজম, নট এক্সট্রিমিজম’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখেন, নব উত্থিত আন্দোলন প্রাথমিকভাবে একটি কুশাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত আন্দোলন নয়, এটি ধারাবাহিক ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এক আন্দোলন। এই নিয়ন্ত্রণ ভালো অথবা খারাপ, সঠিক অথবা বেঠিক, এটা গৌণ, এটি একটি অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ। বিলেতে অভিজাত ব্রিটিশ নাগরিকদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে পরাধীনতার আত্মগ্লানিতে ম্লান হয়ে তিনি আপন সংকল্পে নিজ মানসভূমিকে ঋদ্ধ করেছিলেন। হরিদাস ও উমা মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্রীঅরবিন্দ অ্যান্ড দ্য নিউ থট ইন ইন্ডিয়ান পলিটিকস’ গ্রন্থে শ্রীঅরবিন্দের বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা সুচারুরূপে বর্ণিত আছে। তিনি দেশমাতৃকার মুক্তিযুদ্ধে শিবের ত্রিশূলের ন্যায় ‘ত্রিমুখী নীতি’ গ্রহণ করে মদমত্ত সাম্রাজ্যবাদীদের বিনাশের কৌশল গ্রহণ করেন— ১) গুপ্ত সংগঠনের দ্বারা বৈপ্লবিক মতাদর্শ প্রচার ও সশস্ত্র অভ্যুত্থান, ২) সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করে তাদের উদ্বুদ্ধকরণ এবং ৩) অসহযোগ ও তীব্র প্রতিরোধের দ্বারা ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর নৈশনিদ্রা হরণ।
অন্য পোস্ট: জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাঁচির বাগানবাড়ি
উল্লেখ্য, শ্রীঅরবিন্দের এই ত্রিমুখী নীতি নির্ধারণের পিছনে ইতালির ঐক্য আন্দোলনের ইতিহাস অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। কাউন্ট ক্যাভুর, জোসেফ মাৎসিনি ও জোসেফ গ্যারিবল্ডির সংগ্রামের ইতিহাস কীভাবে ইতালির ঐক্য স্থাপনে সহায়ক হয়েছিল, সে গৌরবময় ইতিহাস থেকে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মায়, ইতালির কমবেশি ৩০০ লিগ যদি অভিন্ন জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে শামিল হতে পারে, তবে ভারতীয়রাও মাতৃভূমির শৃঙ্খল মোচনে একই আবেগের দ্বারা পরিচালিত হবে। বলা বাহুল্য, সে অনুমান অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আর এরই ফলশ্রুতিতে শ্রীঅরবিন্দের সক্রিয় নেতৃত্বে বঙ্গোপসাগর উপকূলে বিপ্লবী উন্মাদনার ‘সুনামি’ আছড়ে পড়ে, যার তীব্র জলোচ্ছ্বাসে ভারতে ব্রিটিশ রাজসিংহাসন ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ কলকাতার হেদুয়া অঞ্চলে সতীশচন্দ্র বসু ও প্রমথনাথ মিত্রের উদ্যোগে ‘অনুশীলন সমিতি’ গড়ে উঠলেও সমিতির বিপ্লবী উন্মাদনা তুঙ্গে ওঠে শ্রীঅরবিন্দের সক্রিয় যোগদানের ফলে। তিনি শুধু বাংলায় সীমাবদ্ধ না থেকে মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মারাঠাদেরও জাগানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে সফল হন। তিনি ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে মহারাষ্ট্রে অবস্থানকালে মোট ১৪টি বক্তৃতা প্রদান করে মারাঠাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজমন্ত্র ছড়িয়ে দেন। তাঁর সেই কার্যকলাপ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ প্রশাসকদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। ব্রিটিশ প্রশাসন শ্রীঅরবিন্দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হয়ে ওঠে। তাঁর সম্পাদিত ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এই অজুহাতে শ্রীঅরবিন্দ, হেমচন্দ্রনাথ বাগচি এবং অপূর্বকৃষ্ণ বোসকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। উল্লেখ্য যে, হেমচন্দ্রনাথ ছিলেন ওই পত্রিকার ম্যানেজার। আর অপূর্বকৃষ্ণ ছিলেন মুদ্রক। মুদ্রকের সাজা হলেও প্রমাণের অভাবে শ্রীঅরবিন্দ ও হেমচন্দ্রনাথ ছাড়া পেয়ে যান। সে সময় কলকাতার মুখ্য প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন কুখ্যাত মি. কিংসফোর্ড সাহেব।
‘বন্দেমাতরম্ মামলা’ চলাকালীন সময়ে সুশীল সেন নামে এক বালক আদালত চত্বরে ‘বন্দেমাতরম্’ স্লোগান দেয়। এই অপরাধে মি. কিংসফোর্ড ওই বালককে ১৫ বার সজোরে বেত্রাঘাত করার আদেশ দেন। ওই ঘটনায় বাংলার বিপ্লবীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এরই ফলশ্রুতিতে কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যা করার জন্য ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকির ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। তারপর ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে আলিপুর বোমা মামলায় অরবিন্দ ঘোষ সোপর্দ হন। সেই সুযোগে তাঁকে বন্দি করার ফন্দি ইংরেজরা হাতছাড়া করেনি। বিচারে তাঁর সাজা ঘোষিত হয়। তাঁকে ‘সলিটারি কনফাইনমেন্ট’-এ কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। আর কারারুদ্ধ থাকাকালীন অবস্থায় তাঁর মনে দিব্যজ্ঞানের উদয় হয়। জগতের সৃষ্টি ও নিখিলবিশ্ব সম্পর্কে তাঁর নবলব্ধ ধারণা তাঁকে এক ভিন্ন পরিমার্গের স্বপ্নসন্ধানী করে তোলে। আধ্যাত্মিক গুরু হিসাবে তাঁর নতুন পথচলার সূচনা হয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল তিনি পণ্ডিচেরি পৌঁছন।
প্রতিবছরই ভারতে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হবে। সেই জৌলুসে শ্রীঅরবিন্দের মহান আবির্ভাব দিবসটি যেন ঢাকা পড়ে না যায়। সুভাষচন্দ্র বসুর ‘আধ্যাত্মিক গুরু’ ঋষি অরবিন্দই বাংলার যুবকদের ক্ষাত্রতেজে উদ্দীপিত করে গতানুগতিক রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে গিয়ে অধিকারবোধ এবং অধিকার আদায়ের গুরুমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। আর সেই মহৎ কর্মপ্রচেষ্টাই আমাদের স্বাধীনতার পথে কয়েক কদম অগ্রসর করে দিয়েছিল। সেই মহামানবের জীবন সংগ্রামের কাহিনি আরও বেশি করে চর্চা হোক, এই প্রার্থনা করি।
