অধ্যাপক ড.জয়ন্তকুমার দেবনাথ

দু’দিন একরাতে সহজেই ঘুরে আসা যায় এক সময়ের ‘পাগলা গারদ’ নামে খ্যাত রাঁচি থেকে। বর্তমানে তাকে গবেষণাগার (Ranchi Institute Of Neuro-Psychiatry and Allied Sciences) করা হয়েছে। রাঁচি বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের রাজধানী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। রাঁচি এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রয়েছে বেশ কিছু মনোরম জলপ্রপাত। রয়েছে রক গার্ডেন, পট্রাটু ড্যাম বা জলাধার, পট্রাটু ভ্যালি এবং শহরের কাছে টেগোর হিল, যেখানে শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এক মহাজীবন। তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ এবং সারদা দেবীর পঞ্চম পুত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বনামধন্য অগ্রজ। কবিগুরু তাঁর চেয়ে ১২ বছরের ছোট ছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবন ভালোভাবে কাটেনি। তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী মাত্র ২৫ বছর বয়সে পরলোকে গমন করেন। শেষ জীবনে তিনি কলকাতা ছেড়ে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচির মোরাবাড়ি পাহাড়ে একটি বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর শেষ জীবন সেখানেই কাটে। তিনি ৭৬ বছর বয়সে রাঁচির মোরাবাড়ি পাহাড়ে তৈরি নিজ বাসভবনে পরলোকে গমন করেন।
রাঁচি শহরের উপকন্ঠে রক গার্ডেন এবং পট্রাটু ভ্যালি। পট্রাটু ভ্যালি থেকে নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় পাহাড়, বন ছাড়িয়ে পাহাড়ে ওঠার আঁকাবাকা রাস্তা। সেও এক অপরূপ সুন্দর দৃশ্য। মোরাবাড়ি পাহাড়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘টেগোর হিল’ নামে পরিচিত, বাংলার মানুষ হিসাবে সেটা দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। কিন্তু তা দেখার পর আমরা হতাশ। একটি বড় প্রাসাদোপম অট্টালিকা পরিত্যক্ত অবস্থায় অনাদরে পড়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও একজন গুণী মানুষ ছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী। কিন্তু এমন একজন গুণী মানুষের বাসস্থানের দেখভালের কোনও ব্যবস্থাই করেনি ঝাড়খণ্ড সরকার। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া কয়েকটি শ্বেতপাথরের ফলক ছাড়া আর কিছুই করেনি ঝাড়খণ্ড সরকার। অপরিচ্ছন্ন। দরজা-জানালা উধাও। বাড়ির ছাদে সান্ধ্য সময় কাটানোর জন্য কংক্রিটের বসার ব্যবস্থা করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। ওখান থেকে রাঁচি শহরের সুন্দর ভিউ আপনার মন ভালো করে দেবে। তাই বাঙালি পর্যটকরা রাঁচি গেলে একবার তাঁরা যাবেনই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি দেখতে।

এরপর আপনি দেখতে যেতে পারেন চারটি জলপ্রপাত। সীতা ফলস, জোনা ফলস, হান্ড্রু ফলস এবং লোধ ফলস। আরও একাধিক ছোট-বড় জলপ্রপাত রয়েছে রাঁচির চারপাশে। পাহাড়ের উপর থেকে অবিরাম গতিতে পাহাড়ের গা বেয়ে জল পড়েই চলেছে। ভূগোল বইয়ে পড়া ছোটবেলার স্মৃতি চাক্ষুষ করার পালা। পাহাড়ের উপর থেকে অবিরত ধারায় জল যেখানে পড়ে নদী হয় বেরিয়ে যাচ্ছে, সেই জায়গাটা অনেকটা নীচে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়। সবচেয়ে বেশি পার হতে হল হান্ড্রু ফলস দেখতে। আসা যাওয়ায় ১৫০০ সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়েছে। সব জলপ্রপাতের বৈশিষ্ট্য মোটামুটি একইরকম। পাহাড়ের যত বেশি উপর থেকে জল নেমে আসছে, তার সৌন্দর্য তত মনোমুগ্ধকর। পর্যটকদের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ফটো তোলার ধুম। দীর্ঘদিন রয়ে যাবে অবিরত ধারায় পাহাড়ের গা বেয়ে জল পড়ার কল কল শব্দের স্মৃতি।
হান্ড্রু ফলস দেখার পর আমাদের গাড়ি ছুটল ঝাড়খণ্ডের বৃহত্তম জলাধার বা ড্যাম দেখতে। গিতাল সুদ ড্যাম বা সুবর্ণরেখা নদীর জলাধার। জলাধারের বাঁধের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে রাস্তা। সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে কিছু সময় কাটালাম গিতাল সুদ ড্যামের উপর। জলাধারের বাঁধের উলটোদিকে দিগন্ত বিস্তৃত ধানচাষের জমি। হেমন্তের ধান খেত সোনালি বর্ণ ধারণ করেছে। পড়ন্ত বিকেলের রোদে তা যেন এক মোহময়ী নারী। পট্রাটু ড্যামে রয়েছে নৌকো ভ্রমণ বা স্পিড বোটে ঘোরার ব্যবস্থা। স্পিড বোটে প্রতিজনের ভাড়া ১০০ টাকা। একটু দরাদরি করে নিতে হবে।
অন্য পোস্ট: ক্ষোভ-অনাস্থা থেকে অভ্যুত্থান, কোন পথে বাংলাদেশ! (শেষ পর্ব)
হাওড়া থেকে প্রতিদিন ছাড়ে ক্রিয়াযোগ এক্সপ্রেস (হাওড়া-হাতানিয়া এক্সপ্রেসে) রাত সাড়ে ৯টায়। হাওড়া থেকে রাঁচির ট্রেনে চেপে বসলাম। ট্রেন ছাড়ল রাত সাড়ে ৯টায়। পৌঁছলাম সকাল ৭টায়। ওখান থেকে সরাসরি হোটেলে পৌঁছে সকালের খাবার সেরে বেরিয়ে পড়লাম রাঁচির দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে।
প্রাচীন ওই শহরে থাকার মতো প্রচুর হোটেল আছে। হাজার টাকা থেকে ২,০০০/৩,০০০ টাকায় ভালো হোটেল পেয়ে যাবেন। ডাবল বেড A/C, Non A/C সবরকমের হোটেল পেয়ে যাবেন। রাঁচিতে পেয়ে যাবেন বিভিন্নরকম প্রাইভেট কার। ওই গাড়ি ভাড়া করে দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে পারবেন। চারচাকা গাড়ির ভাড়া প্রতিদিন ৩,০০০ টাকা। ১২ বা ১৬ সিটের গাড়ির প্রতিদিনের ভাড়া মোটামুটি ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকা।

Valo hoyache sir ❤️