তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাক্তন সংস্কৃতি অধিকর্তা এবং সাহিত্য অকাদেমি,
বঙ্কিম, বিএফজেএ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক
কিছুকাল আগে সল্টলেকের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক তরুণী শিক্ষিকা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁদের স্কুলে গিয়ে ছাত্রীদের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য মিলিত হতে। বাংলা সাহিত্য নিয়ে ছাত্রীরা আলোচনা করতে চায় সাহিত্যিকের সঙ্গে৷ আমি কিছুটা অবাক, একেই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, তায় সল্টলেক! সেখানকার মেয়েরা সাহিত্য পড়ে কি না, এ বিষয়ে আমি ঘোর দ্বিধান্বিত ছিলাম৷
স্কুলে উপস্থিত হয়ে দেখি ছড়াকার ভবানীপ্রসাদ মজুমদারও সেখানে উপস্থিত৷ রীতিমতো একটি ছোট মঞ্চও বাঁধা হয়েছে। সেখানে সারাদিন ধরে সাংস্কৃতিক উৎসব চলবে। তার মধ্যে হঠাৎ একপশলা সাহিত্য–সাহিত্য বৃষ্টি৷ আর এক তরুণী শিক্ষিকা ছিলেন সঞ্চালিকা। তিনি সম্ভবত বাংলাই পড়ান।
প্রাথমিক আলোচনার পর শুরু হল প্রশ্নোত্তরের আসর৷ আমি বড়দের সাহিত্যই বেশি লিখেছি। শিশুসাহিত্য তুলনায় কম। কিন্তু ভবানীপ্রসাদ শুধুই শিশুসাহিত্যিক। তাঁর ছড়া বেশ জনপ্রিয়। সুতরাং আলোচনায় ঘুরে ফিরে এল ছোটদের নানা সাহিত্যের বিষয়৷
উপস্থিত কিশোরীরা খুবই মেধাবী ও চালাক–চতুর। তারা বাংলা সাহিত্য নিয়ে খবরাখবর রাখে এবং নানা চমকপ্রদ প্রশ্ন উত্থাপন করে বেশ অভিভূত করল আমাদের৷ প্রশ্নোত্তর চলাকালীন অনুভব করেছিলাম, তাদের এই সাহিত্যবোধের পিছনে স্কুলের শিক্ষিকাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তাঁরা পাঠ্যপুস্তকের নীরস পঠনপাঠনের মধ্যেই নিয়মিত সাহিত্য আলোচনা করেন। ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করেন পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যে বিশাল পৃথিবী রয়েছে, তার সন্ধান করতে৷ কিন্তু তাদের উদ্বুদ্ধ করলেই যে তারা সাহিত্য পাঠ করবে, তা নয়। তাদের অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে কিছু টিপস দেন, যাতে তাঁরাও উপলব্ধি করেন, সাহিত্যপাঠের কিছু প্রয়োজনীয়তা রয়েছে৷
সেদিন অনুষ্ঠানান্তে আমরা অনুভব করেছিলাম, ইদানীংকার ছোটদের সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা রয়েছে, তা হয়তো সর্বার্থে ঠিক নয়৷ ছোটরা কেউই সাহিত্য পড়ে না, এ ধারণা পোষণ করা উচিত হবে না৷ ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’র মতো ছোটদের কেউ কেউ ভালোই সাহিত্য পড়ে৷ সেই পড়ুয়ার সংখ্যা ঠিক কত, তা যাচাই করতে হলে স্কুলগুলির মধ্যে একটি সমীক্ষা করতে হয়, যা বাস্তবে সম্ভব নয়৷ পরিচিতদের মধ্যে অনেক ছোটর মধ্যে সাহিত্য পড়ার একটা প্রবণতা রয়েছে৷ কারও কারও প্রবলভাবে রয়েছে, তবে বেশির ভাগেরই অতটা নেই৷ এই ‘নেই’য়ের সংখ্যা বহু, কারণ যা আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলেছে, তার একটা চিত্র আমাদের প্রত্যেকরই জানা৷
আমরা যে সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি, তাতে শিশুদের কোনও শৈশব নেই। তারা জন্ম থেকেই সর্ববিদ্যায় বিশারদ, রিমোট টিপলেই তাদের হাতের সামনে টিভির নানা রঙিন চ্যানেল, মাউসে ক্লিক করলেই ইন্টারনেটে সমস্ত বিশ্ব, মোবাইল ফোনের সুইচ অন করলেই দূর পৃথিবীর মানুষ কানের দোরগোড়ায়৷ এই শিশুর কাছে কোনও শৈশব থাকা সম্ভব নয়। অতিদ্রুত কৈশোর পেরিয়ে পৌঁছে যায় বয়ঃসন্ধিতে৷ এ এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল! তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিভাবকরা তাকে উন্নীত করছেন সেই অকালযৌবনে। তার চোখে তখন একটাই স্বপ্ন, কী করে করায়ত্ত করা যায় পৃথিবীর যাবতীয় ভোগবিলাস৷ তারা মনে করে না, এ দেশটা বসবাসযোগ্য, তাদের মাতৃভাষাটা কোনও ভদ্রলোকের ভাষা, প্রতিবেশীরা মেলামেশার যোগ্য৷ ফলে অতিশৈশব থেকে তাদের একটা বড় অংশ হয়ে ওঠে প্রবল উন্নাসিক, একলষেঁড়ে, স্বার্থপর৷
এই প্রজন্মের কাছে সুস্থ, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে বড় হল প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া ও প্রথম হতে চেষ্টা করা৷ ফলে শৈশব–কৈশোর যাচ্ছে অকালে হারিয়ে৷ অথচ শৈশব ও কৈশোরকাল মানবজন্মের বিশ্বাসের কাল৷ তখন অধিকাংশ শোনা কথাই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। সেই বিশ্বাসটা রয়ে যায় বাদবাকি জীবন৷
শৈশব–কৈশোরের নরম অনুভূতির মাটিতে যা রোপিত হয়, সেই শিকড় চারিয়ে যায় এমন গভীরে, যা ক্রমে হয়ে ওঠে অচ্ছেদ্য৷ তার ফলে প্রতিযোগিতাই যদি বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন বলে মনে হয়, সে বিশ্বাসটাই তাকে তাড়া করে ফিরবে অবশিষ্ট জীবন৷ আর প্রতিযোগিতাসর্বস্ব জীবনে কোনও আনন্দ নেই, স্বস্তি নেই, কেবল দৌড়, দৌড় আর দৌড়৷ এই অনন্ত দৌড়ে শামিল হলে শুধু যে তার শৈশব–কৈশোরই ধবংস হয়ে যাচ্ছে, তা নয়, যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়ও চূর্ণ হয়ে যায় প্রতিযোগিতার চাপে৷ কিন্তু হয়তো একটু চেষ্টা করলেই ধরে রাখা যায় তাদের শৈশব–কৈশোরের সেই নরম অনুভূতিগুলি৷
রবীন্দ্রনাথ কোনও একসময় লিখেছিলেন, একজন মানুষের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন হাত। তা হলে তার শোয়া–বসা–থাকার জন্য সাড়ে তিন হাত মাপের একটি ঘর হলেই তো যথেষ্ট হত, কিন্তু সে কেন একটি বড় মাপের ঘর তৈরি করে তার বসবাসের জন্য? কারণ তার বেঁচে থাকার জন্য একটু অতিরিক্ত স্পেস চাই৷ তা হলে তার জীবনযাপন হয় একটু আনন্দের৷ ঠিক তেমনই শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে একজন শিশু বা কিশোরকে যদি বেঁধে রাখা যায়, তার অবস্থা হবে ওই সাড়ে তিন হাত ঘরে বাস করার মতো৷ কিন্তু তাকে যদি পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে তার জীবনের স্পেস অনেক বড় হয় ও তার বেঁচে থাকাটা হয় আনন্দের৷ তার এই স্পেস কমানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় অতিশৈশবেই৷
এখনকার দিনের ছোটরা আর ছড়া শেখে না। শেখে রাইম৷ ‘রানি রাঁধতে শেখেনি’ সুর করে বলার চেয়েও তাকে বেশি তোল্লাই দেওয়া হয়, যদি সে সুর করে বলতে পারে, ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাক শিপ’ বা ‘টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার’৷ ফলে শিশুর ভালোবাসার প্রথম জগৎটাই যায় ইংরেজির পিছনে। তার মাতৃভাষা হয় অবহেলিত৷ তাই বাংলার অমূল্য সম্পদ ছড়াগুলি হয়তো কালক্রমে চাপা পড়ে যাবে ইংলিশ মিডিয়ামের দৌলতে। তেমনই তার কাছে মাতৃভাষা হবে অবহেলিত৷
আমরা অনেকেই চাই, আমাদের নবীন প্রজন্ম স্কুলে গিয়ে রাইম বলতে শিখুক, ইংরেজিতে পণ্ডিত হয়ে পাড়ি দিক বিলেত বা আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে বিশ্বজয় করুক। কিন্তু বিশ্বজয় করে যেন না ফিরে আসে এই পোড়ার দেশে। তাদের সন্তানসন্ততি সেখানেই দুধেভাতে বড় হয়ে উঠুক৷ না, দুধেভাতে নয়, হ্যামবার্গার বা এরকম সব বিদেশি আহার্য গ্রহণ করে হয়ে উঠুক বিদেশ ও দশের একজন৷ কিন্তু যে সম্পদ একসময় রচনা করে গিয়েছেন আমাদেরই মা, ঠাকুমা, দিদিমারা, রাতে ঘুম পাড়ানিয়া ছড়া কেটে আকর্ষণ করে নিয়ে আসতেন ছোটদের চোখে ঘুম, সেই ছেলে ভোলানো ছড়া কি কালক্রমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বাংলার ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে? ঠিক একইরকমভাবে ছড়ার মতোই নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে রূপকথাও৷ আমরা জানি একদিকে নিত্যনতুন রূপকথা, অন্যদিকে রকমারি ছড়া। এ নিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলার প্রথম শিশুসাহিত্য৷ সেই সম্পদের এক বিপুল অংশই মুখে মুখে রচিত হয়েছিল। কিন্তু দুই মলাটের মধ্যে ধরে রাখার কোনও উদ্যোগ বা উপায় ছিল না বলে তার অধিকাংশই একসময় অন্তর্হিত হয়ে গিয়েছে চিরতরে৷ কিছু রূপকথা ধরে রাখতে উদ্যোগী হয়েছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। কিন্তু রূপকথার বিপুল সম্ভারের তুলনায় তা খুব সামান্যই৷ কিছু লোককথা ধরে রেখেছেন লালবিহারী দে। তাও যৎসামান্য।
আর সবচেয়ে দামি ঐশ্বর্য সেই ছড়ার সম্ভার ধরে রাখতে উদ্যোগী হয়েছিলেন আমাদের সব অগতির গতি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ৷ কেন তিনি ছড়া সংগ্রহ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন, তা বিবৃত করেছিলেন ‘লোকসাহিত্য’ নামের বইটিতে। লিখেছিলেন, ‘বাংলা ভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে সকল মেয়েলি ছড়া আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহা সংগ্রহ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম৷ আমাদের ভাষা এবং সমাজের ইতিহাস নির্ণয়ের পক্ষে সেই ছড়াগুলির বিশেষ মূল্য থাকিতে পারে, কিন্তু তাহাদের মধ্যে যে একটি সহজ স্বাভাবিক কাব্যরস আছে, সেইটিই আমার নিকট অধিকতর আদরণীয় বোধ হইয়াছিল৷’ ছড়ার এই ‘সহজ স্বাভাবিকতা’ই কিন্তু তার প্রকৃত ঐশ্বর্য৷ কিন্তু শুধু তাই নয়, ছড়ার মধ্যে তিনি যে রসাস্বাদন করতেন, তার সঙ্গে মিশে থাকত তাঁর ছেলেবেলাকার স্মৃতি৷ বিস্মিত হয়ে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, মানবের এত প্রাণপণ প্রযত্ন, এত গলদঘর্ম ব্যায়াম প্রতিদিন ব্যর্থ ও বিস্মৃত হচ্ছে, অথচ এসব অসঙ্গত, অর্থহীন, যদৃচ্ছাকৃত শ্লোক লোকস্মৃতিতে চিরকাল প্রবাহিত হচ্ছে৷ রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির মধ্যেই কিন্তু নিহিত রয়েছে ছড়াগুলির অমরত্বের জাদু৷ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, আপাতনিরীহ ছড়াগুলির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে অসঙ্গতি, অর্থহীনতা ও একধরনের স্বেচ্ছাচারী সরলতা৷
এমন ছড়া, রূপকথার পৃথিবী থেকে ছোটদের নির্বাসন ঘটিয়ে অভিভবকরা তাদের কী উন্নয়ন ঘটাতে চলেছেন, তা তাঁরা নিজেরাও বোধ হয় অবহিত নন৷ আমরা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার পর থেকেই তো ছোটদের সাহিত্যের সোনালি সম্ভারটি আবিষ্কার করেছিলাম একটু একটু করে৷ সেই কবে শৈশবে পড়েছিলাম পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলি। প্রতিটি গল্পই যেন এক একটি মণিমাণিক্য, যে গল্প একবার পড়লে সারা জীবন থেকে যায় মগজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কুঠুরিতে, যে গল্প চেষ্টা করলেও ভোলা কঠিন৷ জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়, বিশেষ করে সংকটময় মুহূর্তে মনে পড়ে যায় পঞ্চতন্ত্রের গল্পগুলি৷ আর যদি সত্যিই কারও মনে পড়ে যায়, তার পক্ষে অনেক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব৷
‘পঞ্চতন্ত্র’ বহু বছর ধরে বহুজন অনুবাদ করে পৌঁছে দিয়েছেন ছোটদের হাতে। সেই বইগুলি একসময় পঠিত হতে হতে হারিয়ে গিয়েছে কালের গহ্বরে৷ কিন্তু হারায়নি এখনকার বড়দের মগজ থেকে৷
ইদানীং কোনও কোনও প্রকাশক আকৃষ্ট হয়েছেন বইটি পুনর্বার ছোটদের দরবারে হাজির করতে। নানা রঙের ছবিতে মুড়ে প্রয়াসী হয়েছেন ছোটদের আকর্ষণ করতে।
কিন্তু সেসব অনুবাদ সব সময় যে ভালো বা সহজবোধ্য হয়, তা নয়। আজও কি ভুলতে পেরেছি জাতকের গল্পগুলি কিংবা বেতাল পঞ্চবিংশতির গল্প অথবা হেমেন্দ্রকুমার রায়ের ‘যখের ধন’ বা ‘আবার যখের ধন’? সে সময়কার স্বপনকুমারের রহস্য গল্প বা শশধর দত্তর মোহন সিরিজ আজ আর পছন্দ না হলেও তার জাদুস্পর্শ কি কম রোমাঞ্চিত করেছিল শৈশবে? এবেলা একটি বই শেষ করে ওবেলা নতুন আর একটি বই শুরু করতাম একইরকম উৎসাহে৷
আশাপূর্ণাকে কীভাবে আবিষ্কার করেছিলাম প্রথম, শৈশবের সেই পৃষ্ঠাগুলি খুললে আজও কীরকম শিহরিত ও রোমাঞ্চিত বোধ করি৷ শুধু কি আশাপূর্ণা? অবনীন্দ্রনাথ কি কম রোমাঞ্চিত করেছেন তাঁর ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘শকুন্তলা’ আমাদের হাতে তুলে দিয়ে কিংবা উপেন্দ্রকিশোর টুনটুনির বই বা গুপী গাইন বাঘা বাইনের গল্প পড়িয়ে! আরও কত লেখক ছিলেন! আমাদের শৈশব–কৈশোরে ছিলেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, জলধর সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, কুলদারঞ্জন রায়, সুনির্মল বসু, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, সুকুমার রায়, কার্তিকচন্দ্র দাশগুপ্ত, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়…
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
