Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

প্যারালিম্পিক্স: দিব্যাঙ্গরা আমাদের গর্ব

প্যারালিম্পিয়ানদের সাফল্যের কারণ মনে হয় সাধারণ মানুষের অবজ্ঞা। এই অবজ্ঞা থেকে তৈরি হয়েছে তাঁদের মধ্যে জেদ, যা বিশ্বক্রীড়ার আসরে পদক লাভের মনোবল বাড়িয়েছে। অন্যদিকে অলিম্পিক্সে দেখা যায়, যেসব ভারতীয় ক্রীড়াবিদ বিশ্ব আসরে সাফল্য এনে দেন, তাঁরা অলিম্পিক্সে চূড়ান্ত ব্যর্থ। ভারতীয় অলিম্পিক্স সংস্থার এদিকটায় নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

(উপরে বাঁদিক থেকে) অবনী লেখারা, নীতেশ কুমার, সুমিত আন্টিল, হরবিম্দর সিং, (নীচে বাঁদিক থেকে) ধরমবীর, পরভীন কুমার, নভদীপ সিং।

Share Links:

অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

এ বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারালিম্পিক্সে ভারত ৮৪ জনের একটি দল পাঠিয়েছিল। তাতে ভারতীয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ক্রীড়াবিদরা অসামান্য সাফল্য এনে দিয়েছেন ভারতকে, যা আগে কখনও ঘটেনি। ভারত ৭টি স্বর্ণপদক, ৯টি রৌপ্যপদক এবং ১৩টি ব্রোঞ্জ পদক-সহ মোট ২৯টি পদক লাভ করে ১৭০টি দেশের মধ্যে ১৮তম স্থান পেয়েছে।

অবনি লেখারা ১১ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় চোট পেয়েছিলেন। কোমরের নীচের অংশ অসাড় হয়ে যায়, যাকে সাধারণভাবে প্যারালাইসিস বলে। তিনি চলাফেরা করার জন্য  হুইল চেয়ার ব্যবহার করেন। ২০২১ সালে টোকিও এবং ২০২৪ সালে প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিংয়ে ভারতকে দু’টি স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি টোকিও প্যারালিম্পিক্সে ৫০ মিটার থ্রি পজিশন শ্যুটিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন।

২০০৯ সালে বিশাখাপত্তনমে এক রেল দুর্ঘটনায় নীতেশ কুমার তাঁর বাঁ পা হারিয়েও প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে পুরুষদের সিঙ্গলস ব্যাডমিন্টনে স্বর্ণপদক লাভ করেন। দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নীচের অংশ বাদ দিতে হয়। তারপর তিনি কৃত্রিম পা লাগিয়ে প্যারালিম্পিক্সের পুরুষদের সিঙ্গলস ব্যাডমিন্টনে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

২০১৫ সালে এক বাইক দুর্ঘটনায় সুমিত আন্টিলের বাঁ পা বাদ যায়। তিনি কৃত্রিম পা নিয়ে পুরুষদের বর্শা নিক্ষেপে প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে স্বর্ণপদক লাভ করেন। এর আগে তিনি ২০২১ সালে টোকিও প্যারালিম্পিক্সেও বর্শা নিক্ষেপে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

অন্য পোস্ট: নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ

১৮ মাস বয়সে হরবিন্দর সিং ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন  ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তিনি তাঁর দু’পায়ের কর্মক্ষমতা হারান। যুক্ত হয় দু’টি কৃত্রিম পা।  তিনি পুরুষদের রিকার্ভ তিরন্দাজিতে ভারতকে আরও একটি স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে। এর আগে গত টোকিও প্যারালিম্পিক্সেও তিনি এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেছিলেন।

ধরমবীর তাঁর গ্রামের একটি বড় খালের জলে ডাইভ দিতে গিয়ে কোমরে মারাত্মক জখম হয়ে তাঁর জীবনসংশয় দেখা দিয়েছিল। তাঁর কোমরের নীচের অংশ অসাড় হয়ে যায়। তাঁকে হুইল চেয়ারের সাহায্যে চলতে হয়। বিপদে তাঁর পরিবার তাঁকে মানসিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি ক্লাব থ্রো অনুশীলন শুরু করেন। এতে তাঁর বাহু এবং কাঁধের শক্তির প্রয়োজন হয়। তিনি প্যারালিম্পিক্সে প্রথম অংশগ্রহণ করেন ২০১৬ সালে লন্ডন প্যারালিম্পিক্সে। সেখানে তিনি অষ্টম স্থান পান। তারপর ২০২০ সালে টোকিও প্যারালিম্পিক্সেও তিনি যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। সেখানে তিনি সপ্তম স্থান লাভ করেন। অবশেষে তিনি ২০২৪ সালের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছন। তিনি  পুরুষদের ‘ক্লাব থ্রো’ প্রতিযোগিতায় ভারতকে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন।

প্রভীন কুমারের একটি পা জন্মগতভাবে ছোট।  সেই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এবারের প্যারালিম্পিকে তিনি হাইজাম্পে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

আর নভদীপ সিংয়ের উচ্চতা মাত্র ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি। তিনি বর্শা নিক্ষেপকে তাঁর জীবনের ধ্যানজ্ঞান করে নিয়েছিলেন। তিনি প্রথম টোকিও প্যারালিম্পিকে বর্শা নিক্ষেপে অংশগ্রহণ করে চতুর্থ স্থান পেয়েছিলেন। আর এবারের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে  ৪ ফুট ৪ ইঞ্চির নভদীপ সিং বর্শা নিক্ষেপে  স্বর্ণপদক লাভ করেন।

রৌপ্য পদক জয়ী মণীশ নরওয়ালের ডান হাত জন্মগতভাবে অকেজো। তিনি প্যারিস প্যারালিম্পিকে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে রৌপ্যপদক লাভ করেন। এর আগে তিনি গত টোকিও প্যারালিম্পিক্সে মিক্সড শ্যুটিংয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

৬ বছর বয়সে নিজেদের চাষের জমিতে ঘাস কাটার যন্ত্রে দুর্ঘটনায় নিষাদ কুমারের ডান হাতের কনুইয়ের নীচের অংশ কাটা পড়ে। সেই অবস্থা থেকে তিনি নিজেকে একজন উচ্চমানের হাইজাম্পার তৈরি করেন। তিনি এ বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারালিম্পিক্সে উচ্চলম্ফনে রৌপ্যপদক জয় করেন। এর আগে গত টোকিও প্যারালিম্পিক্সেও উচ্চলম্ফনে রৌপ্যপদক পেয়েছিলেন।

অন্য পোস্ট: প্রেমিক বিভুতিভূষণ তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আন্তরিক

যোগেশ কাঠুনিয়া একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অ্যাথলিট। তিনি ন’বছর বয়সে  স্নায়ুতন্ত্রের এক বিরল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর হাত ও পায়ের পেশির কোনও শক্তি ছিল না। তাঁকে হুইল চেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হত। চিকিৎসক তাঁকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মা  মীনা দেবী তাঁকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি নিজে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নিয়ে ছেলের চিকিৎসা শুরু করেন। মায়ের দৃঢ়তা ও কঠোর পরিশ্রমে তাঁর পুত্র তিন বছরের মধ্যে হাঁটতে শুরু করে। ২০১৭ সালে তাঁর এক বন্ধুর পরামর্শে প্যারালিম্পিক্সের খেলা দেখে তিনি উৎসাহিত হন। তিনি ডিসকাস থ্রো ইভেন্টে মনঃসংযোগ করেন।  তিনি এ বছর প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারালিম্পিক্সে ডিসকাস নিক্ষেপে রৌপ্যপদক জয় করেন। তিনি গত টোকিও প্যারালিম্পিক্সেও রৌপ্যপদক লাভ করেছিলেন।

থুলসিমাথি মুরুগেসানের বাঁ হাত জন্মগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তাঁর বুড়ো আঙুল নেই। নার্ভজনিত রোগ এবং পেশির ক্ষয়জনিত রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি মহিলাদের সিঙ্গলস ব্যাডমিন্টনে ভারতকে একটি রৌপ্যপদক এনে দিয়েছেন।

সুহাস ইয়াথিরাজ জন্মগতভাবে তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালি দুর্বল হলেও পুরুষদের সিঙ্গলস ব্যাডমিন্টনে রৌপ্যপদক লাভ করেন।

এক রেল দুর্ঘটনায় অজিত সিং যাদবের বাঁ হাতের নিম্নবাহু কেটে বাদ দিতে হয়। তিনিও বর্শা নিক্ষেপে রৌপ্যপদক লাভ করেন।

পোলিও রোগের ফলে শরদ কুমারের বাঁ পা প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর পেশির কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এই অবস্থাতেও তিনি প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে উচ্চলম্ফনে রৌপ্যপদক লাভ করেন।

ছাত্রজীবনে এক সাইকেল দুর্ঘটনায় শচীন খিলারি বাঁ হাতে আঘাত পান। ফলে তাঁর বাঁ হাত দুর্বল হয়ে যায়। হাতের সাধারণ সঞ্চালন বিঘ্নিত হয়। কিন্তু তিনিও ভারতকে লৌহ বল নিক্ষেপে রৌপ্যপদক এনে দিয়েছেন। এছাড়া তিনি একজন কৃতী মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার এবং ভিজিটিং অধ্যাপক।

২০১১ সালে ১৬ বছর বয়সে প্রণব সুরমা এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। তাঁর মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর হাত, দেহ এবং পায়ের সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। এই অবস্থায় তিনি তাঁর হাত, বাহু এবং কাঁধের জোরে হুইল চেয়ারে বসে ‘ক্লাব থ্রো’তে রৌপ্যপদক লাভ করেন।

পোলিও রোগের কারণে মোনা আগরওয়ালের দু’টি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবস্থাতেই তিনি ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শ্যুটিংয়ে ভারতকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন।

অন্য পোস্ট: মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ

কৈশোরে প্রীতি পাল সেরিব্রাল পলসি রোগে আক্রান্ত হয়েও ১০০ মিটার এবং ২০০ মিটার দৌড়ে দু’টি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে অ্যাথলেটিক্সে ইতিহাস গড়েছেন।

রিকেট রোগে আক্রান্ত রুবিনা ফ্রান্সিসের ছোটবেলা থেকেই হাঁটার সমস্যা। এমনকী ঠিকভাবে দাঁড়াতেও তাঁর সমস্যা। এই প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন।

মহিলাদের প্যারা ব্যাডমিন্টনের সিঙ্গলস প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন বাঁহাতি মনীষা রামদাস। তাঁর জন্মের সময় ডাক্তার ‘ফরসেফ’ ডেলিভারি করেন এবং কাঁধ আগে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর ডান কাঁধ  ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শীতল দেবী ‘ফোকোমেলিয়া’ নামক এক বিরল রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় তাঁর হাত দু’টি ছিল না। এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে পা এবং মুখের সাহায্যে তিনি তির ছুড়ে তিরন্দাজির মিক্সড ইভেন্টে রাকেশ কুমারের সঙ্গে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।

নিথ্যশ্রী শিভম খর্বাকায়। তাঁর উচ্চতা মাত্র ৪ ফুট। তিনি মহিলাদের প্যারাসিঙ্গলস ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। দীপ্তি জীবনজি জড়বুদ্ধিসম্পন্ন। তিনিও ৪০০ মিটার দৌড়ে ভারতকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন।

মারিয়াপ্পান থাঙ্গভালুকে ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময় এক মাতাল বাস ড্রাইভার তাঁকে ধাক্কা মারেন এবং তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নীচের অংশ গুরুতর জখম হয়। এই প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি প্যারাহাইজাম্পে ভারতকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন।

পুরুষদের প্যারাবর্শা নিক্ষেপে সুন্দর সিং গুরজার ভারতকে ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন। ১৯ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর বাঁ হাত হারান। এক বন্ধুর বাড়ির টিনের চাল ঠিক করতে গিয়ে তাঁর বাঁ হাত দুর্ঘটনায় পড়ে ও পরে তা কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। এই অবস্থা থেকে তাঁর অসাধারণ মনের জোর তাঁকে প্যারালিম্পিয়ান বানিয়েছে। ২০১৬ রিও প্যারালিম্পিক্সে ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন সুন্দর সিং গুরজার। কিন্তু সেখানে তিনি ‘কল রুমে’ পৌঁছতে ৫২ সেকেন্ড দেরি করায় তাঁকে বাতিল করে দেন অফিসিয়ালরা। কল রুমে প্রথমে অ্যাথলিটদের রিপোর্ট করতে হয় ইভেন্ট ঘোষণার পর। সেখানে পৌঁছতে দেরি করায় তাঁর আর রিও প্যারালিম্পিক্সে নামা হয়নি। কিন্তু ২০২১ সালে টোকিও প্যারালিম্পিক্স এবং ২০২৪ সালে প্যারিস প্যারালিম্পিকে তিনি অংশগ্রহণ করে উভয় প্যারালিম্পিক্স থেকে বর্শা নিক্ষেপে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন

কপিল পারমার তাঁর ন’বছর বয়সে এক মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। মধ্যপ্রদেশের শিবম গ্রামের পারমার কিশোর বয়সে একদিন মাঠে খেলতে খেলতে একটি জলের পাম্পে হাত দিয়ে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেখানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। তাঁকে ভোপালের একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি এতটাই গুরুতর আহত হন যে, তাঁকে ৬ মাস কোমায় থাকতে হয়েছিল। সেই কঠিন অবস্থা কাটিয়ে এবারের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে জুডোর জে১-এর ৬০ কেজি বিভাগে ভারতকে জুডোয় প্রথম ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়েছেন। এই বিভাগে তাঁরাই অংশগ্রহণ করতে পারেন, যাঁদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ বা একেবারে নেই। কপিল পারমা ৬ মাস কোমায় থাকার পর তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়।

অন্য পোস্ট: প্লাস্টিক নিষ্ক্রিয়তায় জোর দেওয়া দরকার

হোকাতো হোকোজে সেমা  অসম রাইফেলসের ৯ নম্বর ব্যাটেলিয়নের  নায়েব সুবেদার। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার দু’বছর পর ২০০২ সালে ১৯ বছর বয়সে কাশ্মীর সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখায় সেনাবাহিনীর এক অভিযানে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তাঁর বাঁ পা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর পা অপারেশন করে কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে একটি কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তারপর তিনি ৩২ বছর বয়সে লৌহ বল (শটপাট) খেলার প্রতি মনোযোগ দেন এবং কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। তাঁর পরিশ্রমের ফল হল এ বছরের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে ব্রোঞ্জ পদক লাভ।

সিমরন শর্মা একজন দৃষ্টিশক্তিহীন দিব্যাঙ্গ প্যারা অলিম্পিয়ান। তিনি তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট সময় আগে পৃথিবীতে আসেন (pre-mature baby)। তখন তাঁর বয়স সাড়ে ছ’মাস। তাই তাঁকে পরবর্তী ছ’মাস ‘ইনকিউবেটরে’ রেখে চিকিৎসা করতে হয়। তখন থেকেই তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তিনি তাঁর মায়ের হাত ধরে চলতে শুরু করেন। তাঁর হাঁটা নিয়ে প্রতিবেশীদের থেকে টিটকিরি শুনতে শুনতে বড় হন সিমরন শর্মা। তাঁর বাবা মনোজ শর্মা মেয়েকে খেলাধুলায় উৎসাহিত করেন। আজকের প্যারালিম্পিক্সে সাফল্যের জন্য তাঁর স্বামীর অবদানও অসাধারণ। তাঁর কোচ ভারতীয় সেনাবাহিনীর দিল্লির ২২৭ কোম্পানির নায়েব পদে চাকরি করতেন। তাঁর কাছেই সিমরন অনুশীলন শুরু করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় সিমরন আন্তর্জাতিক প্যারালিম্পিক্সে পদক জয়ের স্বপ্ন দেখেন। তিনি তাঁর কোচের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।  অবশেষে সিমরন ২০২৪ সালের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তিনি ১০০ মিটার দৌড়ের হিটে প্রথম হয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু ফাইনালে তিনি চতুর্থ স্থান লাভ করেন। ২০০ মিটার দৌড়ে তিনি ব্রোঞ্জ পদক পেয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণ করেন।

মানুষের পক্ষে অসম্ভব কিছুই নেই। প্যারালিম্পিক্সে ভারতীয় খেলোয়াড়রা যেসব শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বাধাকে উপেক্ষা করে আজ নিজেদের প্রমাণ করেছেন, তার নজির ভূ-ভারতে আর কোথাও নেই। তাঁদের স্যালুট।

প্যারালিম্পিয়ানদের সাফল্যের কারণ মনে হয় সাধারণ মানুষের অবজ্ঞা। এই অবজ্ঞা থেকে তৈরি হয়েছে তাঁদের মধ্যে জেদ, যা বিশ্বক্রীড়ার আসরে পদক লাভের মনোবল বাড়িয়েছে। অন্যদিকে অলিম্পিক্সে দেখা যায়, যেসব ভারতীয় ক্রীড়াবিদ বিশ্ব আসরে সাফল্য এনে দেন, তাঁরা অলিম্পিক্সে চূড়ান্ত ব্যর্থ। ভারতীয় অলিম্পিক্স সংস্থার এদিকটায় নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

3 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sanjoy Roy
Sanjoy Roy
1 year ago

খুব উৎসাহব্যঞ্জক সুন্দর লেখা

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए