Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নেতাজি ও ডাক্তারজি: আদর্শের দুই ভিন্ন রূপ

এখনও পর্যন্ত ভারতের তামাম ছাত্রকুলের কাছে ডাক্তারজির জীবন-সংগ্রামের প্রতি ভীষণভাবে অবিচার করা হয়েছে। স্কুলপাঠ‍্য বইয়ে সচেতনভাবে ডাক্তারজির অধ‍্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অত‍্যন্ত দায়সারাভাবে তাঁর নাম উল্লেখ করে তাঁকে 'সাম্প্রদায়িক' হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এমনকী রামচন্দ্র গুহের মতো বামপন্থী তাত্ত্বিক 'গাঁধী উত্তর ভারতবর্ষ' নামক প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থে ডাক্তারজির নাম না উল্লেখ করে তাঁকে 'মহারাষ্ট্রের এক ডাক্তার' বলে যখন সম্বোধন করেন, তখন এই শ্রেণির ঐতিহাসিকদের প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার (ডাক্তারজি)।

Share Links:

ড. গৌতম মুখোপাধ‍্যায়
অধ‍্যাপক, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

বিংশ শতক ছিল ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির শতক। ওই শতকের প্রথমার্ধে যে দুই কৃতি ভারত-সন্তান ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী চেতনাকে দেশমুক্তির সংগ্রামে যূথবদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং ডাক্তারজি কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার। সম্পূর্ণ ভিন্ন মত ও পথে উভয়েই ভারতমাতার জন‍্য বলিপ্রদত্ত ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে উভয়ের জীবনের সারণিতেও অদ্ভুতরকমের সাযুজ্য চোখে পড়ে। আমাদের গভীর পরিতাপের বিষয়, নেতাজি সম্পর্কে অনেক তথ‍্য অবহিত হলেও ডাক্তারজির জীবনকাহিনির ওপর সেভাবে আলোকপাত করা হয়নি। উপরন্তু তাঁকে ইতিহাসের দুয়োরানি করে রাখা হয়েছে।

সাযুজ্যের প্রসঙ্গে আসা যাক। (এক) এই দুই মহানায়কই ছাত্রাবস্থায় দেশপ্রেমে দীক্ষিত হন,(দুই)দু’জনই ব্রিটিশ পোষিত ইংরেজি মাধ‍্যম স্কুলে ভর্তি হয়ে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি সগর্বে উচ্চারণ করায় প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হন, (তিন) উভয়েই প্রথম জীবনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস‍্য ছিলেন, (চার) পরবর্তীকালে  উভয়েই  নতুন সংগঠনের জন্ম দিয়েছিলেন, (পাঁচ) নেতাজি একটি রেজিমেন্টেড সৈন‍্যদল (ইন্ডিয়ান ন‍্যাশন‍্যাল আর্মি)-এর সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠেন, অনুরূপভাবে ডাক্তারজিও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরসংঘচালক হিসাবে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন, (ছয়) দুই মহাপুরুষই মোটা অর্থ উপার্জনের পথ ত‍্যাগ করে দেশমাতৃকার মুক্তিসাধন যজ্ঞে শামিল হন, (সাত)  উভয়েই তাঁদের বৌদ্ধিক পরাকাষ্ঠার প্রমাণ রেখেছিলেন, নেতাজি আইসিএস পরীক্ষায় সফল হয়ে ব্রিটিশদের গোলামি করেননি, ডাক্তারজিও নাগপুর থেকে কলকাতায় এসে ন‍্যাশন‍্যাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে  ডাক্তারি পাশ করে সরকারি চাকরি না করে গরিব, আর্তের সেবায় নিয়োজিত হন, (আট) তাঁদের দু’জনই ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাবলি, বিশেষত ‘আনন্দমঠ’ উপন‍্যাস ও স্বামী বিবেকানন্দের দর্শন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের জন্য যুদ্ধনীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এর জন্য বিদেশি সাহায্য লাভেও ছিলেন কুণ্ঠাহীন। কিন্তু ডাক্তারজি স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা নির্দেশিত পথে দেশবাসীকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে বলিষ্ঠ করে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতি ধাবিত করার প্রচেষ্টা করে গিয়েছেন সারা জীবন। ব‍্যক্তিগত সাংসারিক সুখভোগের বাসনাকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেন। ডাক্তারজির কাছে সমগ্র ভারতই ছিল তাঁর সংসার।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

এমন দুই দেশবরেণ‍্য মনীষীর জীবন-সংগ্রামের কাহিনির প্রতি স্কুল বা কলেজের পাঠ‍্য ইতিহাস গ্রন্থে সুবিচার করা হয়নি। স্বাধীনতার অব‍্যবহিত পরেই ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেসের কর্তৃত্ব  কমিউনিস্টদের করতলগত হওয়ায় ঐতিহাসিক মূল‍্যায়নের ক্ষেত্রে এই দুই মনীষীর ভূমিকাকে লঘু করে দেখানো হয়েছে। নেতাজির প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত কারণে একসময় নানান কটুকাটব‍্যও করা হয়েছিল। সে বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করলাম না। কিন্তু দুঃখগাথার অন‍্য দিকটি হল, এখনও পর্যন্ত ভারতের তামাম ছাত্রকুলের কাছে  ডাক্তারজির জীবন-সংগ্রামের প্রতি ভীষণভাবে অবিচার করা হয়েছে। স্কুলপাঠ‍্য বইয়ে সচেতনভাবে ডাক্তারজির অধ‍্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অত‍্যন্ত দায়সারাভাবে তাঁর নাম উল্লেখ করে তাঁকে ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এমনকী রামচন্দ্র গুহের মতো বামপন্থী তাত্ত্বিক ‘গাঁধী উত্তর ভারতবর্ষ’ নামক প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থে ডাক্তারজির নাম না উল্লেখ করে তাঁকে ‘মহারাষ্ট্রের এক ডাক্তার’ বলে যখন সম্বোধন করেন, তখন এই শ্রেণির ঐতিহাসিকদের প্রকৃত উদ্দেশ্য আমাদের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

অন্য পোস্ট: প্রেমিক বিভুতিভূষণ তাঁর প্রকৃতিপ্রেমের মতোই আন্তরিক

তবে আশার কথা, বৃহত্তর ভারতে রাজনৈতিক পালাবদলের ফলে অনেক অজানা বিষয় ধীরে ধীরে পাদপ্রদীপের সামনে আসছে। এই বঙ্গেও অনুরূপ বিষয় আলোকিত হবে, সে স্বপ্নের ভরসায় আছি। যখন ‘ডগমা’-কে পরাস্ত করে প্রকৃত ঘটনার প্রতি ফিরে দেখার সৎ প্রচেষ্টার দ্বারা বৌদ্ধিক সম্প্রদায় সন্নিবিষ্ট হবেন, তখনই ইতিহাসের রাহুর দশা কাটা সম্ভব। বুদ্ধিজীবী যদি একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, তা আত্মহত‍্যারই শামিল। দ্বান্দ্বিক জগতে বৈপরীত্যের মেলবন্ধন ভিন্ন সৃজনশীলতা অসম্ভব।  আসলে বিরুদ্ধ মতের প্রতি আমরা চরম অসহিষ্ণু হওয়ায় তার উৎকর্ষতার দিকটি ভেবে দেখি না। নেতাজি ও ডাক্তারজি, দু’জন পৃথক ভাবাদর্শে আদর্শায়িত হলেও উভয়ের কর্মকাণ্ডকে নতুনভাবে ব‍্যাখ‍্যা করে ভারতাত্মার নবরূপের সংশ্লেষণে শরিক হওয়া জরুরি।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए