শ্রীমন্ত পাঁজা
আদিম যুগ থেকে মানুষ আজ আধুনিক হয়েছে। নিজেদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের চাহিদা মেটানোর জন্য নিজেদের পরিবর্তন করে নিয়েছে। খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের আধুনিকীকরণ করেছে। আদিম যুগে মানুষ জন্তু-জানোয়ারকে হত্যা করে পাথরের দ্বারা ঠুকে ঠুকে আগুন জ্বালিয়ে ঝলসে খেত। বস্ত্র বলতে গাছের ছাল ও বিভিন্ন গাছগাছালি এবং বাসস্থান বলতে ছিল পাথরের গুহা অথবা কুঁড়েঘর। ধীরে ধীরে মানুষ নিজেদের রুচির পরিবর্তন করে সভ্যতার সঙ্গে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে লৌহ যুগ হয়ে ইস্পাতের যুগে পদার্পণ করেছে। এর পরবর্তী যুগ কীসের হয়, সেটাই এখন দেখার।
লজেন্স, জোয়ান থেকে এক টাকার পাউচ শ্যাম্পু অথবা এক টাকার পাউচ আচার, সবই এখন প্লাস্টিকবন্দি। চানাচুর হোক কিংবা বিস্কুট, পানমশলা থেকে রান্নার মশলা, চায়ের কাপ থেকে জলের গ্লাস, বিড়ি থেকে সিগারেট, সবই এখন প্লাস্টিকের মোড়কে উপলব্ধ। মানুষের ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয় প্লাস্টিকের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক। টুথপেস্টের মোড়ক প্লাস্টিকের, দাঁত মাজার পরেই চায়ের কাপে চুমুক। চা, দুধের প্যাকেটও প্লাস্টিকের। চায়ের অন্তরঙ্গ সঙ্গী বিস্কুট, এই বিস্কুটও প্লাস্টিক বন্দি। জলখাবারের আয়োজনেও তেলেভাজা অথবা তরকারিতে যে তেল প্রয়োজন, সেই রিফাইন তেল অথবা সরষের তেলও প্লাস্টিকের প্যাকেটে বন্দি। দুপুরের খাদ্যতালিকায় থাকা ভাত, ডাল, সবজি ও মাছ, সবই বাজার থেকে আসে প্লাস্টিকের প্যাকেট অথবা পলিথিনের ক্যারিব্যাগে। এগুলি রান্না করতে যে মশলার প্রয়োজন হয়, বর্তমানে তার সবই প্লাস্টিকের প্যাকেটে। সান্ধ্যকালীন খাদ্যতালিকার স্ন্যাক্স জাতীয় সবই প্লাস্টিকের মোড়কে উপলব্ধ। আর রাতের খাবার রুটির তৈরির জন্য আনা আটার প্যাকেটও এখন প্লাস্টিক এবং মিষ্টি, যেমন, রসগোল্লা, পান্তুয়া মাটির হাঁড়ির পরিবর্তে এখন পলিথিনের মধ্যে আবদ্ধ। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের খাবার বিস্কুট অথবা কেক, চকোলেট, সবই প্লাস্টিকের মোড়কে বদ্ধ। অর্থাৎ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টাই প্লাস্টিক যে আমাদের নিত্যসঙ্গী, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন হোক অথবা রাজনৈতিক ব্যানার কিংবা ফেস্টুন, সবই এখন প্লাস্টিকের উপর হচ্ছে।
প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে মানুষকে সচেতন করার কাজ চলছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হচ্ছে প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ। নদীর পাড়গুলিতে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পড়ে থাকার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। বর্ষার সময় আমরা দেখতে পাই অতি অল্প বৃষ্টিতেই জল জমে যায়। গ্রাম, শহর এলাকার কোথাও কোথাও নর্দমার দূষিত জল ও বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। নর্দমাগুলি পরিষ্কার করার সময় জল, কাদা ও ব্যবহৃত প্লাস্টিক-সহ বিভিন্ন আকারের নানা রঙের ক্যারিব্যাগের সমাহার লক্ষ্ করা যায়। নর্দমায় স্তূপীকৃত ক্যারিব্যাগের ছবি প্রমাণ করে মানুষের অসচেতনতার বিষয়টি।
প্লাস্টিক আমাদের ছায়ার মতো পিছু ছাড়তে চাইছে না। কম দামে প্লাস্টিকের বিকল্প এখনও পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠেনি। তাই প্লাস্টিককে সঙ্গী করেই আমাদের চলতে হবে, এটা ধরে নিয়ে কতকগুলি বিষয় মেনে চললে সমাধান সূত্র বার করা যাবে বলে মনে হয়। বাস, ট্রাম, ট্রেন, এমনকী মেট্রোরেলের প্রতিটি বগিতে থাকবে একটি করে ডাস্টবিন। সেখানে শিশু, যুবক-যুবতী থেকে বয়স্করাও খাদ্যদ্রব্যের প্লাস্টিক প্যাকেট ফেলতে পারবেন। বাস, ট্রাম ও ট্রেনের বগিতে লেখা থাকবে ডাস্টবিন ব্যবহারের জন্য। শুধু তাই নয়, বাস, ট্রাম, ট্রেনে হকাররাও দ্রব্য বিক্রির পাশাপাশি ডাস্টবিন ব্যবহারের কথাও প্রচার করবেন। চা থেকে পান-গুঠকার দোকানে থাকবে ডাস্টবিন। সেখানে প্লাস্টিকের চায়ের ভাঁড়, পান, গুটকা, খৈনি ও তামাক জাতীয় দব্যের প্যাকেট এবং চর্বিত পিক ফেলা হবে। দোকানের উচ্ছিষ্ট ময়লা, প্লাস্টিকের প্যাকেট ও চায়ের ভাঁড় গ্রাম পঞ্চায়েত অথবা পুরসভা বা পুরনিগমের মাধ্যমে সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে অবশ্য গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্র চিপস জাতীয় খাদ্য, ভুজিয়া, মুগডাল, চানাচুর, ছোলা, মটর ভাজা প্রভৃতি নজরকাড়া নানা রঙে রঞ্জিত প্লাস্টিকের মোড়কে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। অনেক খদ্দের দোকানে দাঁড়িয়েই রসনা তৃপ্তি করেন। তাই প্রত্যেকটি দোকানের সামনেও ডাস্টবিন আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেলস্টেশনের মতো প্রত্যেকটি বাসস্টপে যাত্রী প্রতীক্ষালয়ে থাকুক যাত্রীদের জন্য ডাস্টবিনের ব্যবস্থা। যাত্রীরা নিজেদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক যাতে ডাস্টবিনের মধ্যেই ফেলেন, তার জন্য লিখিত নির্দেশিকা টাঙিয়ে দিতে হবে।
অন্য পোস্ট: গীতোক্ত জন্মান্তরবাদ ও পুনর্জন্ম
বর্তমান দিনে জলাশয়গুলি ক্রমশ ডাস্টবিনে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত শহর ঘেঁষা গ্রামগুলিতে লক্ষ করা যাচ্ছে, সংসারের যাবতীয় খাদ্যদ্রব্যের প্লাস্টিকের প্যাকেট ছাড়াও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের প্যাকেট এবং মাছ-মাংসের পলিথিন জলাশয়ে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ফলে জলাশয়গুলি ক্রমশ দূষিত হয়ে চলেছে। মাছের বেঁচে থাকার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দূষিত হওয়ার ফলে পুকুরঘাটে স্নান অনেকে বন্ধ করে দিচ্ছে। তাই প্রত্যেকটি জলাশয়ের সামনে পঞ্চায়েত ও কর্পোরেশনকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যবহৃত প্লাস্টিক জলাশয়ে নিক্ষেপ বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও প্রত্যেকটি গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিদিন সকালে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ডাস্টবিন থেকে ময়লা সংগ্রহ করতে হবে। অঙ্গনওয়াড়ি শিক্ষাকেন্দ্র থেকে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে ডিগ্রি কলেজেও ডাস্টবিন বাধ্যতামূলক করতে হবে। ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা নিজেদের কাজের প্রয়োজনে ব্যবহৃত প্লাস্টিকদ্রব্য ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করবেন এবং তা পঞ্চায়েত অথবা কর্পোরেশন সংগ্রহ করবে। প্রত্যেকটি তীর্থস্থান তথা মন্দির, মসজিদ ও গির্জায় ডাস্টবিনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সেখানে ধূপের প্যাকেট, বাতির প্যাকেট ও প্রসাদের পাত্র ফেলার জন্য ডাস্টবিন বাধ্যতামূলক হওয়া চাই। সরকারি অথবা বেসরকারি সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে প্লাস্টিক দূষণের কুফল ও ডাস্টবিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক ছাড়া চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্লাস্টিককে সঙ্গী করে নিয়েই আমাদের এগিয়ে চলতে হবে। প্লাস্টিক উৎপাদন যেমন প্রতিনিয়ত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমন মানুষের মধ্যে ডাস্টবিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যেখানে সেখানে ময়লা অথবা প্লাস্টিক ফেললে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চায়েত এবং কর্পোরেশনকে প্রত্যেকদিন ডাস্টবিনের ময়লা সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম যাতে পরিবেশে সুস্থভাবে বসবাস করতে পারে, তার জন্য আমাদের এই কর্তব্যগুলি মেনে চলা প্রয়োজন। দৈনন্দিন জীবনে যেমন প্লাস্টিকের গুরুত্ব অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তেমন তার দূষণের পরিমাণও ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সুতরাং আমাদের সামগ্রিক সচেতনতার মাধ্যমেই প্লাস্টিককে কীভাবে নিষ্ক্রিয় করা যায়, তার ওপর জোর দিতে হবে। তবেই প্লাস্টিক উৎপাদন ও নিষ্ক্রিয়তার সামঞ্জস্য বজায় থাকবে।
