অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ
কোনও দুর্নীতিই সহজে আদালতে প্রমাণিত হচ্ছে না এবং অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না। অপরাধীরা হয় জেল হেফাজতে, না হয় জামিন নিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতদিন কয়লা, গরু, বালি এবং শিক্ষা দুর্নীতি নিয়ে রাজ্য তোলপাড় ছিল। সম্প্রতি আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ঘটনায় সারা বিশ্ব স্তম্ভিত।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনায় সিবিআই তদন্ত চলছে। একমাসের বেশি সময় অতিক্রান্ত। এখনও খুনের কূলকিনারা নেই। তবে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যেমন সাপ বেরোয়, তেমন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়া ছাত্রীর নৃশংস খুনের কিনারা করতে গিয়ে গোয়েন্দারা ডাক্তারি পড়ুয়াদের পাশফেল করার পিছনে যে বিশাল পরিমাণ টাকার আদান-প্রদান হয়, তা দেখে তাজ্জব হয়ে গিয়েছেন।
এতদিন স্কুল শিক্ষায় টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতিতে হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই এবং ইডি যে তথ্য সাধারণ মানুষের সামনে এনেছে, তার চেয়েও ভয়ংকর দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডা. সন্দীপ ঘোষেকে দীর্ঘদিন ধরে একটানা জেরা এবং অবশেষে গ্রেফতারের মাধ্যমে। কে কোন সেমিস্টারে কত নম্বর পাবেন, কাকে ফেল করানো হবে, সবই নির্ধারিত হত নাকি টাকার বিনিময়ে এবং ডা. সন্দীপ ঘোষ এবং তাঁর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এই চক্র শুধু আর জি কর মেডিক্যাল কলেজেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের সব মেডিক্যাল কলেজে।
অন্য পোস্ট: কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরাট প্রভাব পড়তে চলেছে
এতদিন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তারদের ওপর সাধারণ মানুষের বড় ভরসা ছিল। কিন্তু আর জি কর কাণ্ডে মানুষের সেই ধারণা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। রাজ্যে বড় বড় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরির কথা সরকার ফলাও করে ঘোষণা করলেও কয়েকদিন আগে কোন্নগরে দুর্ঘটনায় পড়া যুবককে শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালে তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হলেও সেখানে তাঁর চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। তাই ওখানকার ডাক্তার রোগীকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার রোগীকে সেখানে না নিয়ে গিয়ে কেন আর জি কর হাসপাতালে নিয়ে গেলন, এটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দেশ জানে, আর জি কর হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসকরা ডাক্তারি পড়ুয়ার নৃশংস খুনের প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করছেন। অথচ অ্যাম্বুল্যান্সের ড্রাইভার রোগীকে আর জি কর হাসপাতালেই নিয়ে চলে গেলেন! সেখানে সেই রোগীর মৃত্যু হয়। মৃত্যু নিশ্চিতভাবেই দুঃখের। কিন্তু কার নির্দেশে ড্রাইভার রোগীকে মেডিক্যাল কলেজে না নিয় গিয়ে আর জি কর হাসপাতালে নিয়ে গেলেন, এটাও জানা দরকার।
সম্প্রতি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, স্বাস্থ্য দফতরে ঘুঘুর বাসা রয়েছে এবং সেজন্য তিনি বিগত বামফ্রন্ট সরকারের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। প্রশ্ন হল, তিনি যদি একথা জানেন, তাহলে গত ১২ বছরে তিনি তা ভাঙার ব্যবস্থা করেননি কেন? প্রশ্ন তো উঠবেই।
বর্তমানে বিপদগ্রস্ত বাংলার শিক্ষিত বেকার সমাজ। বিপদগ্রস্ত আমাদের সন্তানরা। তাদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নেই, আছে শুধু দুর্নীতি আর দুর্নীতি। মানুষের সবচেয়ে জরুরি পরিষেবা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান আজ তলানিতে। তাই হয়তো আজ মানুষের এভাবে স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ।
বক্তব্য লেখকের নিজস্ব



একদম সঠিক কথা দাদা।