দিগন্ত চক্রবর্তী

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অধ্যয়ন করলে উঠে আসে বহু বিপ্লবীর নাম, তাঁদের বীরত্বের কাহিনি, জীবন উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের বিষয়। তবে সরাসরি ময়দানে লড়াই না করেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে মহামানবের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। নিজে প্রত্যক্ষভাবে লড়াই না করলেও হাজার হাজার বিপ্লবীর মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ তিনি বপন করেছিলেন। ব্রিটিশ অফিসারদের বক্তব্য ও লেখনী থেকেও জানা যায়, সে সময় বিপ্লবীদের আখড়া অনুসন্ধান করলে তিনটি বই পাওয়া যেত— ‘শ্রীমদ্ভাগবদগীতা’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ এবং স্বামী বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’।
বহু বছর ধরে লাঞ্ছিত পরাধীন দেশমাতাকে স্বাধীন করার জন্য স্বামীজি মন্ত্র দেন ভারতমাতার পুজো করার। ১৮৯৭ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী ৫০ বছর গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা হোক। অন্যান্য অকেজো দেবতাকে এই ক’বছর ভুলে থাকলে কোনও ক্ষতি নেই।’
স্বামীজির ‘জ্ঞানযোগ’, ‘রাজযোগ’, ‘বর্তমান ভারত’, ‘পরিব্রাজক’ প্রভৃতি গ্রন্থ ও পত্রাবলি ছিল বিপ্লবীদের প্রেরণার অন্যতম প্রধান উৎস। নেতাজি তাঁর অসম্পূর্ণ আত্মজীবনী ‘ভারত পথিক’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘স্বামীজির বাণী ও রচনাবলী আমার চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।’ গান্ধীজি বলেছিলেন, ‘তাঁর রচনাবলি পাঠ করে মাতৃভূমির প্রতি আমার ভালোবাসা সহস্র গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।’ আবার গণেশ ঘোষ লিখেছেন, ‘মাস্টারদা সূর্য সেন, যদুগোপাল মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বিপ্লবী আন্দোলনের নেতার সঙ্গে দীর্ঘকাল অতি ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ আমার হয়েছিল। তাঁদের কাছে এবং বিপ্লবী আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় অন্য নেতৃবর্গের কাছে আমি স্বামীজির কথা অনেক শুনেছি। প্রত্যেকেই স্বামীজির কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন। আমার সতীর্থ অনন্ত সিংহের বেলাতেও ঠিক তাই। প্রথম প্রথম তাকেও বিবেকানন্দের সাহিত্য, বিশেষত স্বামীজির শিকাগো বক্তৃতা সে যুগে অবশ্যই অনেকবার পড়তে হয়েছে।’
অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র
ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা পড়লেও আমরা জানতে পারব যে, স্বামীজি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন। ভূপেন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘স্বামীজি নিজেই একথা বেলুড় মঠে ইতিহাস লেখক পণ্ডিত সখারাম দেউস্করের সঙ্গে আলোচনাকালে একবার বলেছিলেন। পণ্ডিত দেউস্কর বিপ্লবী দলের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেউস্করের প্রশ্নের উত্তরে স্বামীজি বলেছিলেন, ‘সমস্ত দেশটা একটা বারুদখানায় পরিণত হয়েছে। একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গই একে প্রজ্বলিত করে দিতে পারে। আমার জীবদ্দশাতেই আমি বিপ্লব প্রত্যক্ষ করে যাব।’
স্বামীজির উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়েই যে যুবসম্প্রদায় স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা অকপটে বলেছিলেন বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ। আবার অরবিন্দ ঘোষের ‘বন্দে মাতরম্’ পত্রিকার বিভিন্ন নিবন্ধে বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লেখা হয়েছে, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁকে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী হিসাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে বন্দে মাতরম্ পত্রিকায়।পুণ্যভূমি ভারতকে তিনি জীবনের একমাত্র সত্য বলে মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, ‘ভারতের মৃত্যু হলে সত্যের মৃত্যু ঘটবে।’ কেবল সাহসী শক্তিমানরাই যে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন, তিনি এ কথা অকপটে বলেছিলেন। তাই ভারতকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি বারবার আহ্বান জানিয়েছিলেন তরুণদের। তিনি চেয়েছিলেন ১০০ নির্ভীক যুবক। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ১০০ খাঁটি আদর্শবাদী যুবক মিলিত হলে ভারতের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী। তিনি চেয়েছিলেন, যুবসমাজ আগুন ছড়িয়ে দেবে হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী, উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত। স্বামীজি বলতেন, ‘দুর্বলতাই পাপ। তা থেকে হিংসা-দ্বেষের উৎপত্তি। চাই লৌহের মতো পেশি ও ইস্পাতদৃঢ় স্নায়ু। ক’দিনের জন্য জীবন? জগতে যখন এসেছিস, তখন একটা দাগ রেখে যা। আজ থেকে ভয়শূন্য হ। যা চলে আপনার মোক্ষ ও পরার্থে দেহ দিতে।’
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজির প্রভাব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষ বলেছেন, ‘শিকাগোর ধর্মমহাসভায় স্বামীজির সেই আবির্ভাবের সংবাদ ব্রিটিশ পদানত ভারতের ওপর যেন একটা প্রচণ্ড ইলেকট্রিক শকের মতো কাজ করেছিল। ওই আকস্মিক আঘাতেই ভারতের ঘুম ভেঙেছিল। আর সেটাই ছিল বর্তমান ভারতের জাগরণের প্রথম স্পষ্ট চিহ্ন, তার প্রায় হাজার বছরের গভীর জড়তা ভেঙে উত্থানের প্রথম সুস্পষ্ট লক্ষণ।’
স্বামীজি বলতেন, পরাধীন জাতির কোনও ধর্ম হয় না। তাই ভারতে ধর্মরাজ্য স্থাপনের জন্য তাঁর লক্ষ্য ছিল যে কোনও মূল্যে ভারতকে স্বাধীন করা। অত্যাচারী ব্রিটিশদের সঙ্গে স্বামীজি কখনও আপসের কথা চিন্তা করেননি। তিনি বলতেন, ‘লুঠেরাদের মেরে ছিঁচে দিবি।’
অন্য পোস্ট: স্বাধীন, তাই স্বাধীনতায়
স্বামীজির বাণীগুলি ছিল বিপ্লবীদের কাছে সঞ্জীবনী সুধার মতো। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশে শ্রীরামচন্দ্র ও মহাবীরের পূজা চালিয়ে দে দিকি। বৃন্দাবনলীলা-ফিলা এখন রেখে দে। গীতা সিংহনাদকারী শ্রীকৃষ্ণের পূজা চালা, শক্তিপূজা চালা। এখন ওই পূজায় (বৃন্দাবনবিহারী শ্রীকৃষ্ণের পূজায়) তোদের দেশে ফল হবে না। বাঁশি বাজিয়ে দেশের কল্যাণ হবে না। এখন চাই তোপ-তাপ, গোলাগুলি, ঢাল-তরোয়াল নিয়ে খেলা। মার মার কাট কাট করে উঠে পড়ে লাগতে হবে। (দেশের অধিকাংশ লোক) ঘোর তমোভাবাপন্ন। অধিকাংশই full of morbidity, অস্বাভাবিক দুর্বলতায় সমাচ্ছন্ন! মহাবীরের পূজা চালাতে হবে, শক্তিপূজা চালাতে হবে, শ্রীরামচন্দ্রের পূজা ঘরে ঘরে করতে হবে। তবেই তোদের কল্যাণ, দেশের কল্যাণ। নতুবা উপায় নাই।’
ভারত সম্পর্কে ১৬ জানুয়ারি, ১৮৯৭ কলম্বোর ঐতিহাসিক ভাষণে স্বামীজি বলেছিলেন, ‘যদি এই পৃথিবীর মধ্যে এমন কোনও দেশ থাকে, যাকে পুণ্যভূমি নামে বিশেষায়িত করা যেতে পারে, যদি এমন কোনও স্থান থাকে, যেখানে পৃথিবীর সকল জীবকেই তার কর্মফল ভোগ করার জন্য আসতে হবে, যেখানে ঈশ্বরের অভিমুখী জীবমাত্রকেই পরিণামে আসতে হবে, যেখানে মনুষ্যজাতির ভিতর সর্বাপেক্ষা অধিক ক্ষমা, দয়া, পবিত্রতা, শান্ত ভাব প্রভৃতি সদগুণের বিকাশ হয়েছে, যদি এমন কোনও দেশ থাকে, যেখানে সর্বাপেক্ষা অধিক আধ্যাত্মিকতা ও অন্তর্দৃষ্টির বিকাশ হয়েছে, তবে নিশ্চয়ই বলতে পারি, তা আমাদের মাতৃভূমি এই ভারত।’ এই পুণ্যভূমি, মোক্ষভূমি ভারতের পরাধীনতার কারণগুলি কী কী এবং তা থেকে মুক্তির উপায় কী, সেসবই রয়েছে স্বামীজির স্বদেশমন্ত্রের মধ্যে।
স্বামীজি স্বদেশমন্ত্রের শুরুতেই ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের পরাধীনতার কারণগুলি। স্বদেশমন্ত্রের প্রথমেই তিনি বলেছেন, ‘হে ভারত, এই পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা, এই দাসসুলভ দুর্বলতা, এই ঘৃণিত জঘন্য নিষ্ঠুরতা, এইমাত্র সম্বলে তুমি উচ্চাধিকার লাভ করিবে?’ ভারতের পরাধীনতার কারণ হিসাবে তিনি দেখিয়েছেন পরানুবাদ, পরানুকরণ, পরমুখাপেক্ষা। তিনি দেখিয়েছেন ভারতবাসীর মধ্যে দাসসুলভ দুর্বলতাকে। এছাড়াও ভারতের মানুষের একে অপরের প্রতি ঘৃণা মানসিকতা, নিষ্ঠুরতা এবং কাপুরুষসূচক মনোভাবকেই পরাধীনতার অন্যতম কারণ হিসাবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
বিবেকানন্দ স্বদেশমন্ত্রে পরাধীনতার কারণ যেমন বলেছেন, তেমনই বলেছেন স্বাধীনতা বা পুনরুত্থানের উপায়ও। তিনি ভারতবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘হে ভারত, ভুলিও না, তোমার নারীজাতির আদর্শ সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী। ভুলিও না, তোমার উপাস্য উমানাথ সর্বত্যাগী শঙ্কর। ভুলিও না, তোমার বিবাহ, তোমার ধন, তোমার জীবন ইন্দ্রিয় সুখের, নিজের ব্যক্তিগত সুখের জন্য নয়। ভুলিও না, তুমি জন্ম থেকেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত। ভুলিও না, তোমার সমাজ সে বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র। ভুলিও না, নীচ জাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই। হে বীর, সাহস অবলম্বন করো। সদৰ্পে বলো, আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। বলো, মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই।’ অর্থাৎ প্রাচীন ভারতের সেসব মহীয়সী নারীকে আমাদের পাথেয় করা উচিত, তাঁদের কথা তিনি বলেছেন। যতদিন ভারত নারীজাতিকে সম্মান দিয়েছে, ততদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ থেকেছে। নারীজাতিকে অপমান যে ভারতের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ, তা তিনি এই অংশে বুঝিয়েছেন। তাই ভারতের পুনরুত্থানের জন্য যে নারীজাতির উত্থানের প্রয়োজন, তা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর সেই ভাবনাও তিনি স্বদেশমন্ত্রের মধ্যে তুলে ধরেছেন। তিনি স্মরণ করিয়েছেন আমাদের উপাস্য সর্বত্যাগী শঙ্করকে। আমাদের এই জীবনধারণ যে নিজেদের ইন্দ্রিয় সুখের জন্য নয়, তা যে দেশ মায়ের চরণে নিবেদিত, তাও তিনি স্বদেশমন্ত্রে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। নীচজাতিকে অপমান ভারতের অবনতির অন্যতম কারণ। তাই তিনি বলেছেন নীচজাতি, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর সকলের পারস্পরিক মেলবন্ধন গড়ে তোলার কথা, পরস্পরের মধ্যে এক ভ্রাতৃভাব জাগরণের কথা।
ভারতবাসীর করণীয় কী, তারও নির্দেশ স্পষ্টভাবে স্বদেশমন্ত্রের মধ্যেই স্বামীজি দিয়েছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘হে বীর, সাহস অবলম্বন করো। সদৰ্পে বলো, আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই। বলো, মূর্খ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী, আমার ভাই। তুমিও কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত হয়ে সদৰ্পে ডেকে বলো, ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী। বলো, ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বৰ্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ।’ তিনি দেশবাসীকে দেশের জন্য গর্বানুভবের কথা বলেছেন। সাহস এবং বীরত্বের কথা বলেছেন। মূর্খ, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল— সকলেই যে একে অপরের ভাই, তা গর্বের সঙ্গে বলতে বলেছেন। দেশমাতৃকার প্রতি কীরকম শ্রদ্ধা থাকা উচিত, তা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভারতের মৃত্তিকা আমাদের স্বর্গ।’
স্বদেশমন্ত্রের একেবারে শেষ অংশে স্বামীজি দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাকুল প্রার্থনার জন্য। প্রার্থনা কীসের জন্য? নিজের কাপুরুষতা দূর করে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। প্রার্থনায় তিনি বলেছেন, ‘হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে, আমায় মনুষ্যত্ব দাও। মা, আমার দুর্বলতা, কাপুরুষতা দূর করো। আমায় মানুষ করো।’
