রিম্পা হোড়
কথায় বলে, বাঙালির পায়ের তলায় সরষে। কথাটা সত্যি কি না, জানি না। তবে মাঝেমধ্যে মনটা কেমন উড়ু উড়ু করে। কিন্তু কোথায় যাব? পাহাড় আমার অলটাইম ফেভ। পাহাড় আমাকে সব সময় যেন ডাকে। তাই গত ফেব্রুয়ারিতে যখন সুয্যি মামা তার তেজ জানান দিচ্ছিলেন, তখন আর দেরি না করে ঠিক করলাম, ঘুরে আসি প্রতিবেশী রাজ্য সিকিম থেকে। ঘুরব সে রাজ্যের পশ্চিম আর দক্ষিণ প্রান্ত। অনেক কষ্টে জোগাড় হল ট্রেনের টিকিট। রওনা দেব পয়লা বৈশাখ। শুরু হল প্রি-টুর প্ল্যানিং। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আরও দু’জন।
গত বছর ১৪ এপ্রিল, রবিবার রাতে দার্জিলিং মেল ছাড়ল যথাসময়। গরমের কলকাতাকে জানালাম বাই বাই। ট্রেনেই ডিনারটা সেরে নিলাম। রাতের ট্রেন সফরে বিশেষ কিছু করার থাকে না। যে যার বার্থে শুয়ে পড়লাম। আনন্দে তো ফুটছি অনেকটা ঠান্ডা মেখে আসব বলে।
সকালে ঘুমটা একটু লেট করেই ভাঙল। ফোনে দেখলাম, নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা আগেই ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন পৌঁছে যাবে। আগে থেকেই এক ড্রাইভার দাদার সঙ্গে কথা বলা ছিল। তিনি আগেই স্টেশনে পৌঁছে গিয়েছিলেন। আমরাও স্টেশন থেকে বেরিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। মাঝখানে সেবকের এক জায়গায় ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম। যদিও যে উদ্দেশ্যে কলকাতা ছাড়া, তা কিন্তু তখনও পাইনি, মানে ঠান্ডা। যাই হোক, খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা ফের রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে। দু’পাশে বেশ ঘন জঙ্গল, মিলিটারি ক্যাম্প। মাঝখানে পিচ রাস্তা দিয়ে আমরা চলেছি দেশের ক্ষুদ্রতম রাজ্যের দিকে। সিকিম ঢুকতে ঢুকতে বেলা প্রায় গড়িয়ে এল। রাস্তায় খুবই ভিড় পেয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, সে সময় সিকিমে লোকসভা নির্বাচন ছিল। আমাদের হোটেলে পৌঁছতে অনেকটা লেট হয়ে যায়। রাস্তায় এক জায়গায় আমরা লাঞ্চটা সেরে নিই। দেরি হওয়ার জন্য অতিরিক্ত জার্নিটা কিন্তু গায়ে লাগেনি। কারণ পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে রাস্তা দিয়ে উপরে ওঠার এক অনাবিল আনন্দ রয়েছে। দু’চোখ মেলে শুধু পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করা। একপাশে খাড়াই পাহাড়, আর একপাশে খাদ। অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় বইকি। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য, সিকিমের রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও কিন্তু যথেষ্ট শিক্ষণীয়।
অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র
আমাদের প্রথম ডেস্টিনেশন ছিল পেলিং। সেখানে আমরা দু’দিন ছিলাম। আমাদের হোটেলটা ছিল মূলত আপার পেলিংয়ে। আর হ্যাঁ, বিকেল হতে গরমটা কিন্তু অনেকটাই কমে গিয়েছিল। রাত বাড়লে যথেষ্ট ঠান্ডা পড়ে। কলকাতায় দু’-একদিন যে ঠান্ডা অনুভূত হয়, ওখানকার তাপমাত্রা সেরকম ছিল। পৌঁছতে যেহেতু অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই লাঞ্চ করিনি। সরাসরি স্ন্যাক্সই দিতে বলেছিলাম। তারপর ঝটপট ফ্রেশ হয়ে আমরা চারজন বসলাম আড্ডা দিতে। স্ন্যাকসে ছিল চা আর ভেজ পকোড়া। আড্ডার বিষয়বস্তু ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। কারণ আমরা যে রুমটায় ছিলাম, তার ব্যালকনি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা খুব পরিষ্কার দেখতে পাওয়ার কথা, যদি আকাশ মেঘলা না থাকে। তাই খুব আশায় ছিলাম, সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পারব। এর আগে কোনওদিন ওই শৃঙ্গের শ্বেতশুভ্র রূপ চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য হয়নি। তাই কিছুটা উত্তেজনা নিয়েই ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল। পরদিন ভোর ছ’টায় ঘুম থেকে উঠে দেখলাম আকাশ মেঘলা। কয়েক হাত দূরত্বের কিছুও চোখে পড়ছে না, কাঞ্চনজঙ্ঘা তো দূরের কথা। প্রায় সাড়ে ৭টা অবধি অপেক্ষা করেও ঘুমন্ত বুদ্ধের দর্শন মিলল না। অগত্যা দেরি না করে রেডি হয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম স্কাইওয়াকের উদ্দেশে।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, পশ্চিম সিকিমের বেশিরভাগ ভিউ পয়েন্টে কিন্তু এন্ট্রি ফি লেগেছে। ৭,২০০ ফুট উচ্চতার স্কাইওয়াকে এন্ট্রি ফি দিয়ে ঢুকলাম। খুব সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা। নিয়মিত যে রক্ষণাবেক্ষণ চলে, তার ছাপ স্পষ্ট। তবে ব্যক্তিগতভাবে টেম্পারড গ্লাস দিয়ে তৈরি স্কাইওয়াক আমার একটু ওভার হাইপড লেগেছে। ওই স্কাইওয়াক দেশের মধ্যে প্রথম। অবশ্য চারপাশের পাহাড়ে ঘেরা প্রকৃতি মন ভালো করে দেয়। যাই হোক, স্কাইওয়াক পেরিয়ে বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি টপকে আমরা পৌঁছলাম বোধিসত্ত্ব চেনরেজিগের মূর্তির পাদদেশে। সেটির উচ্চতা ১৩৭ ফুট। ওই চত্বরে দু’পাশে ছিল গোল্ডেন প্রেয়ার হুইলস। স্ট্যাচুর ভিতরটা সাজানো ছিল ছবি-কথা দিয়ে। ভিতরে ঢুকে আমরা উঠে গিয়েছিলাম একেবারে উপরে, যেখান থেকে গোটা পেলিংয়ের একটা অদ্ভুত সুন্দর শোভা প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

স্কাইওয়াক থেকে বেরিয়ে আমরা চলে গিয়েছিলাম অসাধারণ সুন্দর একটি পাখিরালয়ে। সেখানে ছিল রংবেরঙের নানা বিদেশি পাখি। টিকিট কেটে গিয়ে দেখলাম পাখিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কী সুবন্দোবস্ত! যেহেতু বেশিরভাগ পাখি অচেনা, তাই তাদের পরিচিতির জন্য বিস্তারিত বর্ণনাও ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা হলাম পেলিংয়ের অন্যতম অফবিট আকর্ষণের উদ্দেশে। খুব কম লোক ওই জায়গার কথা জানে। পাখিরালয়ের ঠিক পাশের রাস্তাটা দিয়েই হেঁটে যেতে হয়। বলা হয়, একসময় গভীর জঙ্গলের মধ্যে সিকিমের কোনও রাজার দুর্গ ছিল। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সেখানে পৌঁছনোর রাস্তা আরও দুর্গম। একদিক বৃষ্টিভেজা কাদামাখা, অন্যদিক অত্যন্ত খাড়াই। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা! যাতায়াতের রাস্তায় পর্যটকের দেখা সেভাবে নেই। চারদিকে নিস্তব্ধতা ভাঙছে শুধু জঙ্গলের নাম না জানা পাখি, পোকামাকড়ের ডাক। ওই রাস্তায় বেশ কয়েকবার পা পিছলে গেলেও কেউ ফিরে আসার কথা ভাবিনি। অজানাকে জানার আকর্ষণে কেউই থেমে যাইনি।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য পৌঁছতে পেরেছিলাম সিকিমের সেই রাজার ভাঙাচোরা দুর্গে। প্রথমেই আমরা জায়গাটা ভালো করে ঘুরে দেখলাম। মনে প্রশ্ন জাগছিল, জঙ্গলের মধ্যে কেন দুর্গ বানিয়েছিলেন সেই রাজা? আন্দাজ করা যায়, হয়তো বিদেশি শক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি এই ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে সঠিক কারণ জানা যায়নি। সেখান থেকে ফিরে ওই পাখিরালয় সংলগ্ন এক জায়গায় আমরা সামান্য খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। সেখান থেকে চলে গেলাম খেচেওপালরি হ্রদে (KHECHEOPALRI LAKE)। ওই লেক বা হ্রদের জল হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের মানুষের জন্য খুবই পবিত্র বলে মনে করা হয়। কথিত আছে, মহাদেব সেখানে পা রেখেছিলেন। সেখানে গেলে মানুষের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। ৫,৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত ৩৫০০ বছরের ওই লেকের একটি আশ্চর্য বিষয়, চারপাশে জঙ্গল থাকলেও আজ পর্যন্ত একটি শুকনো পাতাও কেউ পড়ে থাকতে দেখেনি! শোনা যায়, যদি কোনও পাতা সেখানে পড়ে, কোনও না কোনও পাখি সেটি মুখে করে তুলে নিয়ে যাবে। আগে সেখানে মাছের খাবার দেওয়ার জন্য পর্যটকদের ছাড় ছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখন বন্ধ। লেকের একদিকে খাড়াই রাস্তা গিয়েছে একটি গুহার দিকে। বহু পর্যটক সেই রাস্তা দিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করলেও সফল হননি। আসলে রাস্তা নামেই, যা আদতে পাথর দিয়ে বানানো খাড়া সিঁড়িপথ, যেন সেই পথ পর্যটকদের বারবার সাবধান করে দেয়, আর ওঠা যাবে না। কিন্তু সেই রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় আবার লেখা আছে, ডোন্ট গিভআপ। সেটা দেখেই সম্ভবত আমাদের মতো পর্যটকরা উৎসাহ পেয়ে যায়। আবার উঠতে থাকে। একদম শীর্ষে পৌঁছনোর পর লেকজুড়ে যে ওভারভিউ পাওয়া যায়, তা দেখে মনে হয় কষ্ট সার্থক।

এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। ওই লেকে প্রবেশের ঠিক মুখে একটি খাবারের দোকানে পাওয়া যাচ্ছিল পিৎজা। পাহাড়ে কোনওদিন পিৎজা পাওয়া যেতে পারে, আন্দাজ করতে পারিনি। সেখান থেকে আমরা গেলাম সফরের অন্যতম সুন্দর জায়গায়। নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা ওয়াটার ফলস। শোনা যাচ্ছে জলের অদ্ভুত শব্দ। রাস্তা থেকে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি উপরের দিকে উঠে গিয়েছে। সিঁড়ির শেষ ধাপে যখন পৌঁছলাম, সত্যি বলছি, ওই সৌন্দর্যের যেন কোনও শেষ নেই। কল কল করে বইছে ঠান্ডা জল। বড় বড় পাথর একটির পর একটি রেখে যেন সুনিপুণ হাতে কেউ সাজিয়ে দিয়েছে। সেই পাথরের একটিতে বসে যখন জলের উৎস খুঁজতে উপরের দিকে তাকালাম, মনে হল, যেন ‘সব পেয়েছি’র দেশে পৌঁছে গিয়েছি। দু’পাশের পাহাড়ের সবুজ রঙের মাঝখান দিয়ে সাদা জল তোড়ে নীচে নেমে আসছে। পাথরগুলোকে ডিঙিয়ে যখন ফলসের প্রায় নীচে পৌঁছলাম, মনে হচ্ছিল, ‘এই তো আমি চাই’। জলে নামার অনুমতি ছিল না। তাই জলে হাত দিয়ে পাথরের উপর বসেছিলাম বেশ খানিকক্ষণ। ফিরতে মন চাইছিল না যে।
সেদিন হোটেলে ফিরতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় শুরু হয়েছিল প্রবল বৃষ্টি। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ভেসে যাবে সবকিছু।
অন্য পোস্ট: বাংলাকে গড়তে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব
পরদিন ফের সকাল সকাল উঠে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বৃষ্টি নেই বটে, কিন্তু আকাশ পরিষ্কার নয়। চললাম এমন একটি জায়গায়, যেখানে যাওয়ার জন্য আলাদা করে পারমিশন করাতে হয়। এশিয়ার সেকেন্ড হাইয়েস্ট হ্যাঙ্গিং ব্রিজ বা দ্য সিংশোর সাসপেনশন ব্রিজ। যথেষ্ট দীর্ঘ ওই ব্রিজ ধরে রেখেছে অসংখ্য তার। ব্রিজের নীচটা লোহার কংক্রিটের পাতের তৈরি। ওই ব্রিজে পৌঁছে যতটা ভালো লাগল, পৌঁছনোর রাস্তাটা কিন্তু ততটাই খারাপ ছিল। শুকিয়ে যাওয়া নদীপথ-রাস্তা দিয়ে ড্রাইভার দাদার দক্ষতায় আমরা খুব ভালোভাবে সেখানে পৌঁছতে পেরেছিলাম। চারদিকে পাহাড়। তার মধ্যে ডেন্টাম ও আটারে নামে দু’টি পাহাড়ি গ্রামকে কানেক্ট করেছে ব্রিজটি। ব্রিজের মাঝে দাঁড়িয়ে যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, কলকাতার ব্যস্ততা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে আছি। বাস্তবে দূরত্বটা এতটাই কম যে, আরও বেশি অবাক হতে হয়।
ওইদিন আমাদের বিশেষ আর কোথাও যাওয়ার ছিল না। সেখান থেকে আমরা দক্ষিণ সিকিমের একটি অফবিট জায়গায় যাব বলে ঠিক করেছিলাম। জায়গার নাম বোরং। সেটি রাবাংলার কাছে কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত একটি গ্রাম। বোরং যাওয়ার রাস্তাঘাটও বিশেষ ভালো ছিল না। কিছুটা বাড়তি অ্যাডভেঞ্চারের জন্যই আমরা ওই জায়গাটাকে বেছে নিয়েছিলাম। যে হোমস্টেতে থাকব বলে পৌঁছলাম, সেটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে অনেকটা ভিতরে। হোমস্টের ৩০০ মিটারের মধ্যে আর কোনও ঘরবাড়ি ছিল না। বিকেল ৪টেয় মনে হচ্ছিল, যেন সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। মেঘলা আকাশ এবং কুয়াশার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। এমনিতেই বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়া, তার ওপর অতটা নিরিবিলি। প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য, সাজসজ্জার তারিফ না করে উপায় নেই।
চলবে

