Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

নত হলে উন্নত হওয়া যায়

সম্পর্ক আসলে ভেঙে যায় না। মাঝেমধ্যে শুধু ভুল বোঝাবুঝির ধোঁয়াটা পরিষ্কার করতে হয়। সময়মতো একটু নত হওয়া পুরো সম্পর্কটাকেই বাঁচিয়ে দিতে পারে।

Share Links:

ভাস্কর সেনগুপ্ত

সম্পর্ক আসলে ভেঙে যায় না। মাঝেমধ্যে শুধু ভুল বোঝাবুঝির ধোঁয়াটা পরিষ্কার করতে হয়। সময়মতো একটু নত হওয়া পুরো সম্পর্কটাকেই বাঁচিয়ে দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে একটি গল্প আছে। আদালতের ঘরে শেষ কাগজে সই পড়তেই আইনজীবী হালকা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, এই তো ম্যাডাম, সব শেষ। আইনি বিচ্ছেদ হয়ে গেল। ত্রিশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মিলেছে, মাসে কুড়ি হাজার খরচও চলবে। এবার নিশ্চয়ই স্বস্তি?

কবিতা খুব অল্প হেসে বলেছিল, হ্যাঁ, এখন আর কারও কাছে কিছু চাইবার নেই।

আইনজীবী নথি গুছিয়ে নিলেন, আর কবিতা বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল।

আদালতের এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল নির্বাণ। কবিতা একবারও পিছনে তাকাল না। গাড়ির দরজা বন্ধ হল। একটা সম্পর্কও চুপচাপ বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথম মাস

মায়ের বাড়িতে সবাই খুব যত্ন নিল। মা বারবার জিজ্ঞেস করতেন, ঠিক আছিস তো?

বাবা চুপচাপ পাশে বসে থাকত। কবিতার মনে হয়েছিল, এই তো বুঝি স্বাধীনতা, এই তো শান্তি।

দ্বিতীয় মাস

বাড়ির কথাবার্তার সুর বদলাতে শুরু করল। দাদা মাঝেমধ্যে একটু কড়া গলায় বলত, সারাদিন ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না।

বউদি ঠান্ডা গলায় খোঁচা দিত, এত বড় হয়ে গিয়েছিস, একটু দায়িত্ব নিলে ভালো হয় না?

ভাইপো হেসে হেসে একদিন বলে ফেলল, পিসি, তুমি কবে নিজের বাড়ি যাবে?

তৃতীয় মাস

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। যেখানে আগে আদর ছিল, সেখানে এখন অস্বস্তি। কবিতা কথা কমিয়ে দিল, কিন্তু বুকের ভিতর জমে উঠছিল অদ্ভুত চাপা কষ্ট।

চতুর্থ মাস

কবিতার ওঠাবসার দিকেই সবার নজর। বাইরে পা রাখলেই পাড়ার ফিসফাস কানে আসে, ওই যে, ডিভোর্স হয়েছে… এখন বাপের বাড়িতেই থাকবে বুঝি!

সেই প্রথম কবিতা বুঝতে পারল, শ্বশুরবাড়িতে সম্পর্ক জটিল ছিল, কিন্তু সেটা ছিল তার নিজের সংসার। আর এখানে সে যেন না অতিথি, না গৃহকর্ত্রী, অকারণ বোঝা। একরাতে ছাদের কোণে বসে অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। টাকা আছে, স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সম্মান, আপন ভাব, একটা ঘরের নিশ্চয়তা কি সত্যিই আছে? নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলেছিল, আমি ভুল করেছি। রাগ আর কষ্টে শুধু যন্ত্রণাটাই দেখেছিলাম, ভবিষ্যতের দিকটা ভাবিনি। সে বুঝে গেল, ভাঙা সম্পর্কের পর একজন মেয়ের সবচেয়ে বেশি দরকার ভরসা। কিন্তু সমাজ আগে বিচার করে। আর মায়ের বাড়ি, যাকে সে নিজের ভাবত, সেখানেই অধিকারটা সবচেয়ে কম। চোখ ভিজে উঠেছিল তার। এখন সে নিজের সিদ্ধান্তের ভুল বুঝতে পারছে। প্রতিদিন একই প্রশ্ন তাড়া করত, আমি কী হারালাম? রাগের বশে কি সবটা নষ্ট করে ফেললাম? একটু নত হলে ক্ষতি কী ছিল! স্বামীই তো, অন্য কেউ তো নয়। ছাদে বসে নির্বাণের কথা মনে পড়ত অনুক্ষণ। তার অভ্যাস, ছোটখাটো তর্ক, আর সবকিছুর শেষে যে মানুষটা পাশে থাকত, সেই উপস্থিতিটাই আজ সবচেয়ে দূরে। একরাতে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কাঁপা হাতে ফোন তুলে নম্বর ডায়াল করল।

কল ধরতেই শোনা গেল, হ্যালো।

কবিতা ধীরে বলল, নির্বাণ, আমরা কি আবার চেষ্টা করতে পারি? আমি তোমাকে খুব মিস করছি। আমি আবার তোমার সঙ্গে থাকতে চাই।

দু’দিকেই কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর গভীর নিশ্বাস নিয়ে নির্বাণ বলল, আমি নিজেও পারছি না তোমাকে ছাড়া। ভুল দু’জনেরই ছিল। যদি ঠিক করতে চাই, দু’জনকেই এগোতে হবে। একে অপরের কাছে নত হতে হবে। একটু ত্যাগ। আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে কিছু বদল আমাদের দু’জনেরই দরকার। তুমি রাজি থাকলে আমি এখনই রওনা দিচ্ছি।

কবিতার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। খুব আস্তে বলল, হ্যাঁ, আমি প্রস্তুত।

ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। নির্বাণ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। শীতের রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু তার মনে একটাই কথা, ওকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে হবে। পাঁচ ঘণ্টা একটানা ড্রাইভ। ভোরের আলো ফোটার সময় সে কবিতার বাবার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে।

কবিতা বাইরে এল। চোখে লজ্জা, ভয় আর স্বস্তির মিশেল। বাবা-মা দরজা খুললেন। নির্বাণ মাথা নিচু হয়ে প্রণাম করল। কবিতা ছোট্ট ব্যাগটা তুলে নিল। কোনও কথার প্রয়োজন পড়ল না। দু’জনই বুঝে গিয়েছিল, এই সিদ্ধান্তটা মন থেকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি চলল। কবিতা ফিরছিল তার নিজের ঘরে, যেটা সে একদিন তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে এসেছিল।

হ্যাঁ, একটু নত হতে হবে। যে নত হতে পারে, সেই বড় হতে পারে। যে মা নিজের রক্ত দিয়ে আমার জীবন গড়েছেন, তাঁর কাছে মাথা নত করতে হবে। যে বাবা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আমাকে দাঁড় করিয়েছেন, তাঁর কাছে নিচু হতে হবে। যে শিক্ষক আমাকে জগৎ চিনিয়েছেন, তাঁর কাছে মাথা নত করব না! যে গুরুদেব ভগবান কে জানিয়েছেন, তাঁর কাছে তো মাথা নত করতেই হবে।

গীতায় দেখেছি, যতক্ষণ অর্জুন নিজের বিচারবুদ্ধি, অহংকারকে আশ্রয় করেছিলেন, ততক্ষণ সংশয়ক্লিষ্ট ছিলেন। যে মুহূর্তে বললেন, নষ্টমোহ স্মৃতি লব্ধ করিষ্যে বচনং তব, যে মুহূর্তে মাথা নত করলেন, তখনই হলেন দুর্ধর্ষ। মহাভারতে কর্ণ চরিত্র ঠিক সেরকম। চিরকাল অহংকারকে পুষ্ট করেছেন। তাই চিরকাল ব্যর্থ হয়েছেন। কখনও নত হতে শেখেননি।

​কর্ণ অর্জুনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কি না, তা চিরকালই বিতর্কের বিষয়। তবে অর্জুন ছাড়াও তিনি অনেকবার অন্য যোদ্ধা ও মহারথিদের কাছে পরাস্ত হয়েছেন। এমনকী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রমাণও ইতিহাসে রয়েছে।

​বন পর্বে পাণ্ডবরা যখন দ্বৈতবনে শান্তিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন দুর্যোধন, কর্ণ ও শকুনি একটি কুবুদ্ধি আঁটেন। তাঁরা ভাবেন, পাণ্ডবদের বনবাসে পাঠিয়ে এখন পুরো পৃথিবী ভোগ করার অধিকার তাঁদের। তাই দ্বৈতবনে গিয়ে পাণ্ডবদের নিজেদের ঐশ্বর্য দেখিয়ে মনে কষ্ট দেওয়া এবং দ্রৌপদীর করুণ অবস্থা দেখে আনন্দ উপভোগ করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। ধৃতরাষ্ট্রের কাছ থেকে চতুরতার সঙ্গে অনুমতি নিয়ে কৌরবরা বিশাল সেনাবাহিনী-সহ দ্বৈতবনে প্রবেশ করেন। ​সেখানে একটি সরোবরের (জলাশয়) সামনে যুধিষ্ঠির যজ্ঞ করছিলেন। দুর্যোধন সেই সরোবরের তীরে একটি ক্রীড়া ভবন তৈরির আদেশ দেন। কিন্তু সেই সময় সরোবরের জলে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেন তাঁর সেবকদের সঙ্গে জলক্রীড়া করছিলেন। অহংকারী দুর্যোধন সেটা সহ্য করতে না পেরে গন্ধর্বরাজকে অপমান করেন এবং কর্ণকে সামনে রেখে যুদ্ধ শুরু করে দেন।

​যুদ্ধে গান্ধর্বরা সবার আগে কর্ণের রথ চূর্ণবিচূর্ণ করে তাঁকে পরাস্ত করে দেন। গন্ধর্বরাজের পরাক্রমের সামনে টিকতে না পেরে কর্ণ নিজের রথ ত্যাগ করে বিকর্ণর রথে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন। কর্ণ পরে অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে আসার কথা বলে চলে গেলেও ততক্ষণে গান্ধর্বরা দুর্যোধনকে সেনা-সহ বন্দি করে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবরাই এগিয়ে আসেন এবং কৌরবদের গান্ধর্বদের হাত থেকে মুক্ত করেন।

এই মহৎ কাজ পাণ্ডবরাই করতে পারেন। কর্ণ-দুর্যোধনরা কখনও পারবেন না। তাঁরা মাথা নত করতে শেখেননি। পাণ্ডবরা জানেন, তাই শৌর্যবীর্য তাঁদের সঙ্গী।

বিরাট পর্বে দুর্যোধন ছলপূর্বক বিরাট নগরের গোধন (গরু) কবজা করে নেন। সেই সময় পাণ্ডবরা বিরাট নগরে রূপ বদলে অজ্ঞাতবাস করছিলেন। বিরাট নগরের রাজকুমার ‘উত্তর’ উৎসাহিত হয়ে কৌরবদের পরাস্ত করার জন্য আক্রমণ করার কথা ভাবেন। সেই সময় সৈরিন্ধ্রী (যিনি ছদ্মবেশে দ্রৌপদী ছিলেন এবং সেখানে সেবিকার কাজ করছিলেন), তিনি বৃহন্নলারূপী অর্জুনকে উত্তরের সারথি হওয়ার পরামর্শ দেন।

​অর্জুন উত্তরকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যান। সেখানে কৌরবদের বিশাল সেনা দেখে উত্তরের মুখ শুকিয়ে যায় এবং তিনি রথ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেই সময় অর্জুন উত্তরকে নিজের সারথি বানান এবং নিজের দিব্য অস্ত্রশস্ত্র ধারণ করে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। অর্জুনের ওপর সব সময় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সুযোগ খোঁজা কর্ণ তাঁর ওপর আক্রমণ করেন। কিন্তু অর্জুন কর্ণকে খুব খারাপভাবে বাণবিদ্ধ করে তাঁর রথ, সারথি ও অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করে দেন। কর্ণকে সেখানেও পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছিল। পরে অর্জুন সকল কৌরবকে পরাস্ত করে গোধন মুক্ত করেন। বিরাট পর্বে অর্জুন কর্ণকে দু’বার পরাস্ত করেছিলেন এবং দু’বারই কর্ণকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।

​দ্রোণ পর্বের একদিনের যুদ্ধে কর্ণকে অর্জুন, ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং সাত্যকির দ্বারা আলাদা আলাদা সময়ে পরাস্ত হতে হয়েছিল। পরের দিন অভিমন্যু কর্ণকে এতটাই গুরুতর আহত করেন যে, কর্ণকে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে নিজের শিবিরে ফিরে যেতে হয়েছিল। পরে তিনি পুনরায় ফিরে এসে চক্রব্যূহতে যোগ দেন। সেদিনই অভিমন্যু পুনরায় আচার্য দ্রোণ এবং কর্ণকে পরাস্ত করেছিলেন।

কর্ণের সঙ্গে অর্জুনের তুলনা কখনও হতে পারে না। অর্জুন আনুগত্যের শক্তিতে শক্তিমান, কৃষ্ণসাযুজ্যে শক্তিশালী আর কর্ণ অহংকারে মত্ত।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए