রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

‘মেটামরফোসিস’ শব্দটির উৎপত্তি অ্যারিস্টটলের হাত ধরে হলেও ১৭ শতকে উইলিয়াম হার্ভে এই ইংরেজি শব্দটিকে প্রাণীদের, বিশেষ করে কীটপতঙ্গের পরিবর্তনের নিরিখেই সকলের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘মেটামরফোসিস’-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘রূপান্তর’ করা হলেও ইংরেজি শব্দটির মধ্যে যে দ্যোতনা রয়েছে, বাংলা শব্দটির মধ্যে সে দ্যোতনার কিছুটা হলেও অভাব থেকে গিয়েছে। কারণ ‘মেটামরফোসিস’ মানে বাহ্যিক পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে থাকে, যা কিনা জীবের জীবনচক্রের গতিবিধির সঙ্গে সম্পর্কিত। সেটা সকলের চোখে পড়ে। যেমন, শুঁয়োপোকার প্রজাপতিতে কিংবা ব্যাঙাচির ব্যাঙে রূপান্তর। বঙ্কিমের লেখনীর পাল্লায় পড়ে এক অতিসাধারণ মেধার অধিকারী ব্যক্তি মুচিরাম গুড়ে শুধু উপরি উপরি তৈলমর্দন ও ভাগ্যের সহায়তায় জমিদার তো হলই, তার সঙ্গে যখন রায়বাহাদুর খেতাব লাভ করল কিংবা রবি ঠাকুরের ইচ্ছাপূরণ গল্পে বাবা সুবলচন্দ্রের ছেলে সুশীলচন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়া কিংবা ছেলে সুশীলচন্দ্রের আবার বাবা সুবলচন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়াকে আর যাই হোক, মেটামরফোসিস বলা যাবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়, যদিও বাংলার রূপান্তর শব্দটি এখানে যথাযথভাবেই প্রযুক্ত হয়েছে।
শব্দের এত মারপ্যাঁচ নিয়ে মাথা ঘামাতেই হত না, যদি না ভাষার উদ্ভব হত। একথা ভুললে চলবে না যে, নেহাত নিখাদ প্রয়োজনের তাগিদে ভাষার উৎপত্তি হলেও ভাষা মানুষকে যেমন অবজেক্টিভ রিয়েলিটির দ্বারা ব্যাপ্ত পরাধীনতার হাত থেকে বাঁচিয়ে সাবজেক্টিভ রিয়েলিটির মাধ্যমে অপার স্বাধীনতা প্রদান করেছে, তেমনই মানুষকে তারই ইন্টারসাবজেক্টিভ রিয়েলিটির দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন মিথ বা গাথা বা প্রপাগান্ডা বা ন্যারেটিভের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য এই যে, ধর্ম থেকে শুরু করে দর্শন, নৈতিকতা, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, এ সবই ওই ইন্টারসাবজেক্টিভ রিয়েলিটির দ্বারা পুষ্ট বিভিন্ন মিথ বা গাথা বা প্রপাগান্ডা বা ন্যারেটিভের অন্তর্গত। য়ুভাল নোহা হারারি তাঁর ‘A Brief History of Information Networks from the Stone Age to AI’-এ যথার্থই লিখেছেন, ‘When we ask whether a particular state exists, we are raising a question about intersubjective reality. If enough people agree that a particular state exists, then it does. It can then do things like sign legally binding agreements with other states as well as NGOs and private corporations.’ এই প্রেক্ষিতে যোগও মানুষের এই ইন্টারসাবজেক্টিভ রিয়েলিটির দ্বারা পুষ্ট বিভিন্ন মিথ বা গাথা বা প্রপাগান্ডা বা ন্যারেটিভেরই অন্তর্গত।
তবে কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, শুরুতে যে মেটামরফোসিসের কথা বলা হল, তার সঙ্গে যোগের সম্বন্ধ কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এ প্রবন্ধ লেখার স্বার্থকতা। আসলে যোগ নামক মিথ বা গাথা বা প্রপাগান্ডা বা ন্যারেটিভটি এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে, এটিকে যোগের মেটামরফোসিস বলাই ভালো। আর যোগের এই মেটামরফোসিস কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটা দেখানোই এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
ভারতের যথাযথ যুক্তিপূর্ণ আকুল আর্তি ও প্রচেষ্টাকে মেনে নিয়ে জাতিপুঞ্জ ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ২১ জুন তারিখটি বিশ্ব যোগ দিবস হিসাবে প্রতিবছর পালিত হবে বলে ঘোষণা করে। তখন ভারত যে কাজটি করতে পেরেছিল, সেটি হল, তার যে প্রাচীন মৌলিক সংস্কৃতি, সেটিকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে ভারতের এ প্রচেষ্টাকে কেউ কেউ পলিটিক্সের দিক থেকে বিশ্লেষণ করে বলেন, এ দেশ এখানে ঠান্ডা লড়াইয়ের সময়ে উদ্ভূত পাওয়ারহক পলিটিক্সের ব্যবহার করে সংস্কৃতিক দিক থেকে ভারত যে শ্রেষ্ঠ, সেটাই দেখাতে চেয়েছে। তবে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র অনুসারে যে যোগ কিংবা গীতায় বর্ণিত যে যোগ বা ঋষি অরবিন্দের যে পূর্ণযোগের ধারণা, সেখান থেকে বর্তমানে জাতিপুঞ্জ কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব যোগ দিবস পালন করার যে যোগ, তা যোগের মূল ধ্যানধারণা থেকে অনেকটাই দূরে। সোজা কথায়, এখানে যোগ হয়ে উঠেছে যোগা। যোগের হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণ। যোগের এখন মূল উদ্দেশ্য, টাকা দিয়ে যোগ শিখে অর্থজনিত স্ট্রেসের হাত থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়া। এ যেন আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে তারই সাহায্য নিয়ে যেটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটিকেই ফের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স দ্বারা সৃষ্ট বলে দেখানো। তবে এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, সওদা বা বাণিজ্যই মানুষকে আন্তর্জাতিক করে তুলেছে, দেশ গড়েছে, দেশ বিস্তার করেছে, রাজাকে তৈরিও করেছে, আবার ধ্বংসও করেছে।
বর্তমানে যোগ নিয়ে এ মনোভাব কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটা বিচার করার আগে ভারতীয় শাস্ত্রে যোগের কীরূপ বিবর্তন ঘটেছে, সেটা দেখা যাক। যোগের কথা আমরা বেদ, উপনিষদ, ভাগবদগীতা, বশিষ্টের যোগ-বশিষ্টে, প্রদীপিকার হঠযোগে পেলেও যোগের একেবারে সুসংবদ্ধ রূপ আমরা পাই পতঞ্জলির যোগসূত্রে । পতঞ্জলি যোগের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মুক্তি। নানারকমের দুঃখের হাত থেকে চিরতরে নিবৃত্তি। যদিও পতঞ্জলি পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞানের অভাবকেই অর্থাৎ অবিদ্যাকেই দুঃখের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, তা হলেও তিনি মনে করতেন, চিত্তের বিভিন্ন বৃত্তি বা পরিণাম বা অবস্থাগুলির মাধ্যমেই দুঃখের উপলব্ধি হয়। আর চিত্তের এ পরিণাম বা বৃত্তিগুলি হল, প্রমাণ, বিপর্যয়, বিকল্প, নিদ্রা ও স্মৃতি। এই চিত্তবৃত্তির হাত থেকে নিস্তার পাওয়া মানেই হল দুঃখের উপলব্ধির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া। তাই পতঞ্জলি যোগ বলতে বুঝতেন চিত্তবৃত্তির নিরোধকে। অর্থাৎ ‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’। তবে এর জন্য যেটা দরকার, সেটা হল, অষ্টাঙ্গ মার্গ— যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধির পালন। পতঞ্জলির মতে, চিত্তবৃত্তি যেমন পাঁচ প্রকার, তেমনই চিত্তভুমিও পাঁচ প্রকার। এগুলি হল, ক্ষিপ্ত , বিক্ষিপ্ত, মূঢ়, একাগ্র ও নিরুব্ধ। অষ্টাঙ্গযোগ মার্গের মাধ্যমে সমাধিস্ত অবস্থায় চিত্ত নিরুব্ধ হয়। আর এটাই যোগের লক্ষ্য। এখানে একটি বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার বিষয় রয়েছে। এটি হল, চিত্তবৃত্তির নিরোধ মানে মনের বৃত্তিশূন্যতা নয়। বরং মনকে আনন্দঘন অবস্থায় একইভাবে ধরে রাখা। যখন খুশি যে কোনও মুহূর্তে মনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে আনন্দঘন অবস্থায় রাখাটাই যোগ। এটাই ছিল সিদ্ধার্থের বোধিলাভ। এটাই বুদ্ধত্ব। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত স্বামী হরিহরানন্দ আরণ্যের পাতঞ্জল যোগদর্শন বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তাই পি এন মুখার্জি বলেন, ‘The ability to stop at will the fluctuations or modifications of the mind which is acquired through constant practice in a spirit of renunciation is called Yoga.’
অন্য পোস্ট: মহাভারত সতিই ইতিহাস
এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয়, সেটা হল এই যে, অষ্টাঙ্গযোগ মার্গের যে স্তরগুলি রয়েছে অর্থাৎ যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি, এগুলির মধ্যে যেমন কোনও বিরোধ নেই, তেমনই চিত্তের পরিণাম বা বৃত্তিগুলির অর্থাৎ প্রমাণ, বিপর্যয়, বিকল্প, নিদ্রা ও স্মৃতির মধ্যেও কোনও বিরোধ নেই। শুধু তাই নয়, চিত্তভূমিগুলি অর্থাৎ ক্ষিপ্ত , বিক্ষিপ্ত, মূঢ়, একাগ্র ও নিরুব্ধর মধ্যেও কোনও বিরোধ নেই। এগুলি প্রকৃতপক্ষে একটির তুলনায় অন্যটি সুউচ্চ। দু’টি স্তর পাশাপাশি অবস্থান করলেও তৃতীয় স্তরে যেতে কোনও বাধা নেই।
একইভাবে যেখানে যোগ বলতে যুক্ত হওয়াকে বোঝানো হয়েছে, সেদিকে আমরা যদি তাকাই, তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ধরা পড়ে। এখানে যুক্ত হওয়া বলতে ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও রাজযোগের মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষ ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিলাভ করতে পারে। ভাগবদগীতায় যোগ বলতে বিশেষ কর্মদক্ষতাকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যক্তিমানুষ স্থিতপ্রাজ্ঞ রূপে বিবেচিত হয়। তাই গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫০ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘বুদ্ধিযুক্তো জহৎতীহ উভে সুকৃতদুষ্কৃতে।/ তন্মাদ্যোগায় যুজ্যস্ব যোগঃ কর্মসুকৌশলম।।’ অর্থাৎ যে ভগবত ভক্তির অনুশীলন করেন, তিনি এ জীবনেই পাপ-পুণ্য উভয় থেকে মুক্ত হন। সুতরাং হে অর্জুন, তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুশীলন করো। সেটাই হল সর্বাঙ্গীণ কর্মকৌশল।
ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও রাজযোগের মধ্যে একদিক থেকে যেমন কোনও বিরোধ নেই, অন্যদিক থেকে ভক্তিযোগকেই অনেকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। পঞ্চদশ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হুসেন শাহের রাজত্বকালে যখন একদিক থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবল অত্যাচার, অন্যদিক থেকে ইসলাম ধর্মের প্রচণ্ড পরাক্রমে সাধারণ হিন্দুসমাজ জর্জরিত, তখন ভক্তিযোগের মাধ্যমে সারাদেশে এমন প্রেমের জোয়ার আনেন যে, দ্রাবির খাস, সাকার মল্লিক, যবন হরিদাস, তাঁরা গোস্বামীর ভূমিকা পালন করেন। শুধু তাই নয়, ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তিযোগকে এমনভাবে প্রচার করেন যে, সমাজের মধ্যে যে সকল অবৈজ্ঞানিক সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিল, তা তিনি দূর করতে সমর্থ হন। আর তাঁর নব্য চিন্তাধারায় গোস্বামীরাই সমাজের সবচেয়ে উচ্চস্তরে আসীন হন। যে কেউই তাঁর কর্মগুণের মাধ্যমে গোস্বামী হতে পারেন। জন্মগত বলেই গোস্বামী হবেন, এরকম নয়।
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ঋষি অরবিন্দ যখন পূর্ণযোগের কথা বলেন, তখন তাঁর লক্ষ্য কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ‘দি লাইফ ডিভাইন’ নামক গ্রন্থে তিনি লেখেন, মানুষের লক্ষ্যই হল পূর্ণযোগের মাধ্যমে দিব্য মানব হয়ে হয়ে ওঠা। কারণ এই বিশ্বপ্রকৃতি দিব্যপ্রকাশের আবাসস্থল। আর এ বিষয়ে মানুষের এক প্রবল আস্পৃহা। দিব্যত্ব বা পূর্ণত্ব লাভের জন্য অবিমিশ্র আনন্দ ও অমল সত্যান্বেষণের জন্য আস্পৃহা মানুষকে পূর্ব থেকেই অব্যর্থভাবে ও চরমভাবে অধিকার করে রাখে। অজ্ঞানের প্রবল প্রভাবে উক্ত আস্পৃহা বা প্রেরণা জড়বাদ ও সন্দেহবাদের কবলে পড়লেও এবং প্রতিবার দীর্ঘকালের জন্য নির্বাসিত হলেও সেটি পুনরায় তার পুরোনো ঐতিহ্য নিয়ে ফিরে আসে এবং মানুষকে উদ্বোধিত করে সে আদর্শের প্রতি, যা তাকে দিব্যত্ব প্রদান করবে, যার আলোকে অজ্ঞানের অন্ধকার দূরীভূত হবে, যা তাকে আত্মজ্ঞান লাভের সহায়তা করবে এবং অমরত্ব লাভের জন্য উজ্জীবিত করবে। এ সবই গভীর অনুভবের বিষয়, যা কিনা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধ এবং যা কিছু আমাদের অভিজ্ঞতাবিরুদ্ধ, সে সবের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন করি। যেখানে আমরা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে কোনও কিছুকে গ্রহণ করি না, সেখানে প্রকৃতি তার বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়ার মধ্যে বিরোধমাত্রকেই অন্তর্ভুক্ত করে এবং বিরোধীগুলির মধ্যে সমন্বয় স্থাপনে যত্নশীল হয়। এ বিষয়ে প্রকৃতি অশেষ ধৈর্যসহকারে অনলসভাবে নিরন্তন সমন্বয়সাধন করে চলেছে। ইতিমধ্যে প্রকৃতি একাধিক সমন্বয় সাধনের পরিচয়ও দিয়েছে। যেমন, প্রাণ ও জড়ের মধ্যে বিরোধের অবসান সে করেছে ‘প্রাণিক-দেহ’রূপ বিবর্তনের মাধ্যমে। আবার মন ও প্রাণিক দেহ, এ দুইয়ের মধ্যে বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটিয়েছে ‘প্রাণিক দেহগত মন’রূপ সৃষ্টির দ্বারা। বর্তমানে প্রকৃতির সামনে আর এক বিরাট পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। এটি হল, ‘প্রাণিক দেহগত মন’ ও ‘মানস চেতনার ঊর্ধ্বে কোন চেতনসত্তা’, এ দুইয়ের সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে। আর এটিই হল যোগ— পূর্ণযোগ।
অন্য পোস্ট: মনু সংহিতার অপব্যাখ্যা বন্ধ হোক
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মতো ভক্তিযোগকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করলেও তাঁর প্রচারিত বাণী ‘যতমত তত পথ’ সমন্বয়ের শিক্ষাই দেয়। এও একপ্রকারের যোগ। উদ্দেশ্য একটাই। আর সেটা হল মুক্তি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদবের সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ আবার পতঞ্জলির ‘যোগসূত্রে’র চারটি ভাগ অর্থাৎ সমাধিপাদ, সাধনপাদ, বিভূতিপাদ এবং কৈবল্যপাদের ওপর নির্ভর করে ভক্তিযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও রাজযোগের অভিনব পরিচয় দিলেও কর্মযোগ যে শ্রেষ্ঠ, সেটা প্রদর্শন করেন। এ বিষয়ে তাঁর অমোঘ ঘোষণা হল, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন,/ সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র মাধ্যমেই ব্যক্তিমানুষ ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিলাভ করতে পারে।
উপরের আলোচনা থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, পতঞ্জলি যোগ বা ভক্তিযোগ বা কর্মযোগ বা জ্ঞানযোগ বা রাজযোগের প্রতিটিরই একটি সুগভীর লক্ষ্য ছিল, এগুলি আর যাই হোক, বর্তমানের যোগা নয়। যোগকে যখনই যোগা হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা নিঃসন্দেহে মেটামরফোসিস। কিন্তু যেটি মূল প্রশ্ন, সেটি হল, এর যৌক্তিকতা কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে যে, বর্তমানের এই বাজারকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের যুগে যোগের এ ধরনের বিবর্তন ছাড়া সেটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই এবারেও ১১তম আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের জন্য ইউজিসি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করার নির্দেশ দিলেও মূল থিম হল, ‘Yoga for One Earth One Health’। তবে এ থিম পতঞ্জলির ‘যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধঃ’ থেকে বহু দূরে। মেটামরফোসিস সব সময়ই বিবর্তনের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতর দিকে যাওয়াকে নির্দেশ করলেও এখানে যোগ থেকে যোগায় ফিরে যাওয়াকে প্রি-মেটামরফোসিস বলাই ভালো। এ ধরনের কাজ যে আগে হয়নি, তা নয়, নেহাত তরুণ হলেও কৃষ্ণচরিত্রে বঙ্কিম কৃষ্ণকে যেভাবে ঐতিহাসিক চরিত্ররূপে তুলে ধরেন, সেটা ওই তরুণ বয়সেও রবীন্দ্রনাথ মেনে না নিয়ে সাহিত্যসম্রাটের সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে, ‘বঙ্কিম সামান্য উপলক্ষমাত্রেই য়ুরোপীয়দের সহিত, পাঠকদের সহিত এবং ভাগ্যহীন ভিন্নমতাবলম্বীদের সহিত কলহ করিয়াছেন। সেই কলহের ভাবটাই এ গ্রন্থে অসঙ্গত হইয়াছে; তাহা ছাড়া প্রসঙ্গক্রমে তিনি বিস্তর অবান্তর তর্কের উত্থাপন করিয়া পাঠকের মনকে অনর্থক বিক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছেন।… যখন তিনি কৃষ্ণকে মনুষ্যশ্রেষ্ঠ বলিয়া দাঁড় করাইয়াছেন, তখন ঈশ্বরের অবতারত্ব সম্ভব কি না, এ প্রশ্নের উত্থাপন করিয়া কেবল পাঠকের মনে একটা তর্ক উঠাইয়াছেন, অথচ তাহার ভালোরূপ মীমাংসা করেন নাই।’ এ সমালোচনার উত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে অর্বাচীন বলে উপেক্ষা করলেও বিশ্বকবির অনবদ্য সৃষ্টি ‘গীতাঞ্জলী’র নোবেল জয় প্রমাণ করে যে, ভারতীয় সংস্কৃতি কেবল বাজারজাত পণ্য নয়। যোগ থেকে যোগা— এই যে প্রি-মেটামরফোসিস, এর বাজারজাত মূল্য থাকলেও ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারে যোগের প্রকৃত লক্ষ্যকে ভুললে চলবে না।


Excellent!
Very informative discussion
‘যোগ’ যে শুধু ‘যোগা’ হয়েছে তা নয় সেই সাথে ‘কর্ম’ হয়েছে ‘কর্মা’। এমনকি ধর্মকে পাশ্চাত্যের আবরণ ও আভরণে সজ্জিত করে করা হয়েছে ‘ধারমা’, যা কিনা এই শব্দগুলির পিছনে প্রাচ্যের যে মূল ভাবনা তা থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। আজকের যোগ দিবস এরকম আলোচনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
খুবই সুন্দর এবং সম্পর্কিত বিষয় গুলোর উপস্থাপন আলোচনাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
Deeply thought provoking article…
লেখাটি অসাধারণ। সমাজের পরিবর্তনে যোগ থেকে যোগা metamorphosis বা রূপান্তর ঘটলেও প্রাচীন শাস্ত্রানুযায়ী যোগের প্রকৃত লক্ষ্যকে ধরে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।