ভাস্কর সেনগুপ্ত

ইতিহাস হল অতীতের ঘটনা ও কার্যকলাপের একটি কালানুক্রমিক ও পদ্ধতিগত অধ্যয়ন, যা মানুষের সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা এবং তাদের জীবনযাত্রার ওপর আলোকপাত করে। ইতিহাস হল অতীতের ঘটনা ও কার্যকলাপের একটি বিস্তারিত ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ, যা প্রমাণ ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
ইতিহাসের বিষয়বস্তু হল, মানুষ, তার পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি, সভ্যতা, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনা এবং তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক। ইতিহাস আমাদের বর্তমানকে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎকে আরও ভালোভাবে তৈরি করতে সাহায্য করে। ইতিহাস কেবল অতীত নয়, এটি বর্তমানের সঙ্গেও সম্পর্কিত, কারণ বর্তমান ঘটনাগুলিই একসময় ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক বলা হয়, কারণ তিনি পশ্চিম বিশ্বের প্রথম বর্ণনামূলক ইতিহাস রচনা করেছিলেন। মহাভারতের যে ঘটনাগুলিকে আমরা গল্প বলে মনে করি বা বড়জোর শিক্ষণীয় গল্প বলে চালানোর চেষ্টা করি, সেগুলি সত্যিই ইতিহাস। আজ থেকে লক্ষ বছর আগেকার জীবনযাত্রা আমাদের ধারণার অতীত। তাই গল্প বলে মনে হয়। আজ চৈতন্যদেব, রামকৃষ্ণদেব আমাদের কাছে বাস্তব, কিন্তু লক্ষ বছর পরে কি সে বোধ থাকবে? আমাদের চিন্তাশক্তির গভীরতার অভাবই হল সমস্যা।
মহাভারত থেকে একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, যা এখনও প্রাসঙ্গিক।
কাক ও হংসের উপাখ্যান (কর্ণ পর্ব)
শল্য বললেন, কর্ণ, তোমাকে মদ্যপের ন্যায় প্রমাদগ্রস্ত দেখছি, সৌহার্দ্যের জন্য আমি তোমার চিকিৎসা করব। তোমার হিত বা অহিত, যা আমি জানি, তা অবশ্যই আমার বলা উচিত। একটি উপাখ্যান বলছি শোনো। সমদ্রতীরবর্তী কোনও দেশে এক ধনবান বৈশ্য ছিলেন, তাঁর বহু পুত্র ছিল। সে পুত্ররা তাদের ভুক্তাবশিষ্ট মাংসযুক্ত অন্ন, দধি, ক্ষীর প্রভৃতি এক কাককে খেতে দিত। উচ্ছিষ্টভোজী সে কাক গর্বিত হয়ে অন্য পক্ষীদের অবজ্ঞা করত। একদিন গরুড়ের ন্যায় দ্রুতগামী এবং চক্রবাকের ন্যায় বিচিত্রদেহ কতকগুলি হংস সবেগে উড়ে এসে সমুদ্রের তীরে নামল। বৈশ্যপুত্ররা কাককে বলল, বিহঙ্গম, তুমি ওই হংসদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তখন সে উচ্ছিষ্টভোজী কাক সগর্বে হংসদের কাছে গিয়ে বলল, চলো, আমরা উড়ব। হংসরা বলল, আমরা মানস সরোবরে থাকি, ইচ্ছানুসারে সর্বত্র বিচরণ করি, বহুদূর যেতে পারি, সেজন্য পক্ষীদের মধ্যে আমরা বিখ্যাত। দুর্মতি, তুমি কাক হয়ে কী করে আমাদের সঙ্গে উড়বে?
কাক বলল, আমি একশো এক প্রকার ওড়ার পদ্ধতি জানি এবং প্রত্যেক পদ্ধতিতে বিচিত্র গতিতে শত যোজন যেতে পারি। আজ আমি উড্ডীন, অবডীন, প্রডীন, ডীন, নিডীন, সংডীন, তির্যগ্ডীন, পরিডীন প্রভৃতি বহুপ্রকার গতিতে উড়ব, তোমরা আমার শক্তি দেখতে পাবে। বলো, এখন কোন গতিতে আমি উড়ব? তোমরাও আমার সঙ্গে উড়ে চলো।
একটি হংস হাস্য করে বলল, সকল পক্ষী যে গতিতে ওড়ে, আমি সে গতিতেই উড়ব, অন্য গতি জানি না। রক্তচক্ষু কাক বলল, তোমার যেমন ইচ্ছা, সে গতিতে উড়ে চলো।
অন্য পোস্ট: প্রতিবাদ চেতনা কি ঘুমিয়ে পড়েছে
হংস ও কাক পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উড়তে লাগল। হংস একই গতি এবং কাক বহুপ্রকার গতি দেখাতে দেখাতে চলল। হংস নীরব রইল। দর্শকদের বিস্মিত করার জন্য কাক নিজের গতির বর্ণনা করতে লাগল। অন্যান্য কাক হংসদের নিন্দা করতে করতে একবার বৃক্ষের উপর উড়ে বসল, আবার নীচে নেমে এল। হংস মৃদুগতিতে উড়ে কিছু সময় কাকের পিছনে রইল। তার পর দর্শক কাকদের উপহাস শুনে বেগে সমুদ্রের উপর দিয়ে পশ্চিম দিকে উড়ে চলল। কাক শ্রান্ত ও ভীত হয়ে ভাবতে লাগল, কোথাও দ্বীপ বা বৃক্ষ নেই, আমি কোথায় নামব? হংস পিছনে ফিরে দেখল, কাক জলে পড়ছে। তখন সে বলল, কাক, তুমি বহুপ্রকার গতির বর্ণনা করেছিলে, কিন্তু এ গুহ্য গতির কথা তো বলনি! তুমি পক্ষ ও চক্ষু দিয়ে বারবার জল স্পর্শ করছ। এ গতির নাম কী?
পরিশ্রান্ত কাক জলে পড়তে পড়তে বলল, হংস, আমরা কাক রূপে সৃষ্ট হয়েছি, কা কা রব করে বিচরণ করি। প্রাণরক্ষার জন্য আমি তোমার শরণ নিলাম। আমাকে সমুদ্রের তীরে নিয়ে চলো। প্রভু, আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করো। যদি ভালোয় ভালোয় নিজের দেশে ফিরতে পারি, তবে আর কাউকে অবজ্ঞা করব না।
কাকের এ বিলাপ শুনে হংস কিছু না বলে তাকে পা দিয়ে উঠিয়ে পিঠে তুলে নিল এবং দ্রুতবেগে উড়ে তাকে সমুদ্রতীরে রেখে অভীষ্ট দেশে চলে গেল।
উপাখ্যান শেষ করে শল্য বললেন, কর্ণ, তুমি সে উচ্ছিষ্টভোজী কাকের তুল্য। ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের উচ্ছিষ্টে পালিত হয়ে তোমার সমান এবং তোমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সকল লোককে তুমি অবজ্ঞা করে থাকো। কাক যেমন শেষকালে বুদ্ধি করে হংসের শরণ নিয়েছিল, তুমিও তেমন কৃষ্ণার্জুনের শরণ নাও।

Real crows never do so. Shalya was just disturbing Karna according to his promise to Yudhistira (or Krisna) before the Kuruksetra war.