ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মনু সংহিতা বা মনুস্মৃতি একটি প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, যেখানে সমাজব্যবস্থা, ধর্মাচরণ, আইন, নারী ও শূদ্রদের অবস্থান, উত্তরাধিকার, দণ্ডনীতি প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত বিধান প্রদত্ত হয়েছে। এটি অনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর মধ্যে রচিত হয়েছিল। রক্ষণশীল হিন্দু সম্প্রদায় এখনও এই ধর্মশাস্ত্রকে মূল্যবান মনে করে এবং এর কিছু বিধান সামাজিক আচরণের মাপকাঠি হিসাবে মান্য করে। তবে আধুনিক সমাজে যেখানে জাতপাতবিরোধী নীতির কথা বলা হয়, সেখানে মনুস্মৃতির অনেক বিধান বৈষম্যমূলক বলে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।
বর্তমানে মনুসংহিতা প্রধানত একটি ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক দলিল হিসাবে যথেষ্ট গুরুত্ববহ। এটি প্রাচীন ভারতে রাষ্ট্র ও সমাজের সংগঠন বুঝতে সাহায্য করে। এই গ্রন্থ অধ্যয়ন করে আমরা বুঝতে পারি বর্ণব্যবস্থা কীভাবে গঠিত হয়েছিল অথবা কীভাবেই বা এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছিল। এটি ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব এবং প্রাচীন ভারতীয় দর্শন বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে বর্তমানেও প্রাসঙ্গিক। এটি হিন্দু স্মৃতিসাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। রচয়িতা হিসাবে পৌরাণিক রাজা মনুকে কল্পনা করা হয়, যিনি মানবজাতির প্রথম পুরুষ ও আইনপ্রণেতা হিসাবে বিবেচিত। মনু তাঁর এই উপদেশাবলি ও ধর্মনির্দেশনা তাঁর শিষ্য ভৃগু মুনির কাছে ব্যাখ্যা করেন এবং সেই আখ্যানের ভিত্তিতেই সংস্কৃত ভাষায় গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল।
প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়নাস্বরূপ মনুস্মৃতি বর্ণাশ্রম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র— এই চার বর্ণের কর্তব্য ও অধিকার আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়। ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু পারিবারিক আইনের ভিত্তি হিসাবে অনেক সময় মনুস্মৃতিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি ছিল প্রাচীন ভারতের ধর্মশাস্ত্রীয় আইনবোধের অনন্য এক দলিল। এ গ্রন্থে আহার, বিবাহ, শুচিতা, সৎকার, দণ্ডনীতি, উত্তরাধিকার বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি প্রাচীন ভারতে নৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ধর্মের মাধ্যমে আরোপিত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক দলিল থেকে ভারতীয় সমাজের গঠন, আইন, ধর্মচর্চা ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। আজকের দৃষ্টিতে এটি অনেকখানি প্রাচীন মূল্যবোধ ও বৈষম্যসূচক মনোভাবের প্রতীক, কিন্তু ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে একে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
মনুস্মৃতি নিম্নবর্গের মানুষের (বিশেষত শূদ্র ও দলিত সম্প্রদায়ের) বিরাগভাজন হয়েছে, কারণ এ গ্রন্থে তাদের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, তা অবমাননাকর, বৈষম্যমূলক এবং দমনমুখী বলে বর্তমানে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হল, সমাজকে চারটি বর্ণে ভাগ করে দেওয়া হয়— ব্রাহ্মণ (পূজা ও জ্ঞান), ক্ষত্রিয় (শাসন ও যুদ্ধ), বৈশ্য (ব্যবসা ও কৃষি), শূদ্র (সেবা ও শ্রম)। শূদ্রদের স্থান দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে নীচে এবং তারা অন্য বর্ণের সেবকমাত্র। এটি এক জন্মভিত্তিক বৈষম্য। নিম্নবর্গের মানুষ এই শ্রেণিবিন্যাসে মানবিক মর্যাদাহানির চিহ্ন দেখতে পায়। কিন্তু একটি তথ্যকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয় যে, মনু তাঁর শাস্ত্রে জন্মকৌলিন্য নয়, কর্মকৌলিন্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
অন্য পোস্ট: রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব
ডা. বি আর আম্বেদকরের রচনায় মনুস্মৃতি একটি কেন্দ্রীয় ও গভীরভাবে সমালোচিত বিষয়। তিনি মনুস্মৃতিকে শুধুই একটি ধর্মগ্রন্থ হিসাবে দেখেননি, বরং একে ভারতীয় সমাজে জাতিভেদের (caste system) ধর্মীয় ভিত্তি বলে চিহ্নিত করেন। তিনি মনে করতেন, মনুস্মৃতি হচ্ছে হিন্দুসমাজে বর্ণাশ্রম ও জাতিভেদের সাংবিধানিক ভিত্তি। তিনি এ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘A code of cruelty, inequality and degradation.’ অর্থাৎ নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য ও অবমাননার বিধানগ্রন্থ। এ কারণে ২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৭ মহারাষ্ট্রের মহাদ নামক স্থানে আম্বেদকর হাজার হাজার দলিত অনুসারীকে নিয়ে ‘মনুস্মৃতি দাহ’ (burning of Manusmriti) করেন। এটি ছিল জাতিভেদের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। এ প্রসঙ্গে আম্বেদকরের উক্তি ছিল, ‘We are not burning a book, we are burning the authority of that book which has degraded us.’ আম্বেদকর বুঝেছিলেন যে, জাতিভেদের সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তি শুধু অভ্যাস বা ব্রাহ্মণ্য সমাজের ইচ্ছায় গড়ে ওঠেনি, এর পিছনে ছিল ধর্মীয় বৈধতা, যা মনুস্মৃতির মতো শাস্ত্রগুলি যুগের পর যুগ দিয়ে এসেছে। এই প্রেক্ষিতে আম্বেদকরকে অনেকেই বলেন, ‘The anti-Manu lawgiver of modern India.’
মনুস্মৃতি কিছু ইতিবাচক ও প্রগতিশীল দিকও তুলে ধরেছে, বিশেষ করে তার সময়কালের প্রেক্ষিতে (খ্রিস্টপূর্ব ২০০–খ্রিস্টীয় ২০০ অব্দ)। মনু একটি সামগ্রিক ধর্মজীবন, সামাজিক বিধি ও নৈতিক আচরণবিধি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা একটি বিশৃঙ্খল সমাজে নিয়ম ও কর্তব্যের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নৈতিক দায়িত্ব এবং আচরণ সংহিতা (code of conduct) দিতে চেয়েছিলেন।
মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, শুধু জন্ম নয়, কর্ম ও চরিত্র একজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করে। ‘বর্ণো নৈব স্বয়ং শ্রেয়ঃ, কর্মণা শ্ৰেয়তা নৃণাম্।’ অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব জন্ম দিয়ে নয়, কর্ম দিয়েই হয়। এই শ্লোক বর্ণাশ্রমের কঠোরতার বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেয়।
যদিও মনুস্মৃতির উল্লেখ করে মনুকে বলা হয় নারীবিরোধী, তবু এ গ্রন্থেই বিধৃত রয়েছে, ‘যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে, রমন্তে তত্র দেবতা।’ অর্থাৎ যেখানে নারীদের পুজো করা হয়, সেখানে দেবতারা বাস করেন। মনুস্মৃতির নীতিশিক্ষা ছিল প্রাচীন ভারতীয় সমাজের একটি সর্বাঙ্গীণ শৃঙ্খলা ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টা। এটি শুধু ধর্মীয় আচরণ নয়, বরং নৈতিক জীবনচর্চা, সামাজিক কর্তব্য, রাজনীতি, ব্যক্তিগত শুদ্ধতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নির্দেশ করে। ধর্ম ও জীবনের চতুর্বিধ লক্ষ্য (পুরুষার্থ)— ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষের কথা বলে সমাজের অভিমুখ নির্ণয়ে মনু সফল হয়েছিলেন।
মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, একজন মানুষকে তার আচরণ, নিয়ন্ত্রণ ও নিজস্ব কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে শুদ্ধ হতে হবে। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের কোনও বিশেষ ছাড় ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল সমাজে শৃঙ্খলা আনা। তিনি লিখেছেন, ‘সর্বে ধর্মান্ পরিচর্য, স্বধর্মে স্থিতিমানভঃ।’ অর্থাৎ নিজ নিজ ধর্ম-কর্তব্য পালনে অবিচল থাকা ব্যক্তিই প্রকৃত ধার্মিক। প্রত্যেকে নিজের সামাজিক ভূমিকা সৎভাবে পালন করুক, এটাই মনুর অভিপ্রায় ছিল। তাঁর নীতিশিক্ষার মূল স্তম্ভ ছিল, সত্য, সংযম, অহিংসা, শুচিতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা, শ্রদ্ধাবোধ, সৎ জীবন।
অন্য পোস্ট: ধর্ম মানুষের বিকাশ ঘটায়, বিভেদ নয়
মনুস্মৃতির নীতিশিক্ষা একটি আদর্শ সামাজিক কাঠামো গড়ার প্রয়াস, যেখানে নৈতিকতা, কর্তব্য, শৃঙ্খলা ও আত্মশুদ্ধি ছিল কেন্দ্রে। যদিও এর শ্রেণিবিভক্ত কাঠামো আজ বিতর্কিত, তবে কিছু নীতিবচন ও নৈতিক দর্শন আজও সময়োপযোগী এবং বিশ্লেষণের যোগ্য। তাছাড়া একবিংশ শতকের জাগতিক শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা কখনও আড়াই হাজার বছর আগের সময়কার বিচার করতে পারি না। আমাদের দেশে তবু মনুর মতো প্রখ্যাত আইন প্রণেতা জন্মেছিলেন, পাশ্চাত্য দেশগুলির সে সৌভাগ্য হয়নি। তাঁরা তখন মনুষ্যেতর জীবনযাপন করত।
একথা সম্পূর্ণ সত্য যে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে বিধির পরিবর্তনও কাম্য। মনু প্রণীত আইনকে কেউই আধুনিক আইন বলে ব্যাখ্যাও করেন না। তবু বর্তমানে একটি বিশেষ ধারা চালু হয়েছে, আপন মতের সঙ্গে ও সুবিধাবাদের সঙ্গে না মিললেই মনুবাদী বলে চালিয়ে দিয়ে কিছু মানুষকে নিজ পক্ষে টেনে আনার জঘন্য কৌশল! নির্বিবাদীকে এভাবে মল্লক্ষেত্রে টেনে এনে যুদ্ধের ভান করে আখের গোছানোর তাগিদকে ইতিহাসের ঘৃণ্য চক্রান্ত হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। তাই মনুবাদ নয়, উচ্চবর্ণই আক্রমণের লক্ষ্য। মনে রাখা দরকার যে, প্রতিআক্রমণও সহ্য করতে হবে, যা সুস্থ সমাজে আদৌ কাম্য নয়। তাই বিজ্ঞানী নিউটনের তৃতীয় সূত্র পদার্থবিদ্যার বিষয় হলেও মানবিক বিদ্যাতেও এর বাস্তবায়ন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।
