
কাজল মুখোপাধ্যায়
বেলজিয়ামের ব্রুজ শহরটায় যেন আধুনিক পৃথিবী এসে একটু থেমে গিয়েছে, নিজের গতিকে সংযত করেছে, অতীতের সঙ্গে তাল মেলাতে। পাথরের সরু রাস্তা, নিচু ছাদের পুরোনো বাড়ি, আর জলের উপর ভেসে থাকা রাজহাঁস, সব মিলিয়ে এই শহর কোনও পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এক জীবন্ত স্মৃতি।
পর্যটকরা যেন এখানে শুধু হেঁটে যান না, সময়ের ইতিহাসে আর স্রোতে ধীরে ধীরে ভেসে থাকেন। জল, আলো আর ইতিহাসের এক অনন্ত সংলাপ এই ঐতিহ্যময় শহরে।
এই শহরের প্রাণ তার ক্যানেলগুলি, যার জন্য একে বলা হয় ‘উত্তরের ভেনিস’। কিন্তু ভেনিসের মতো উচ্ছ্বাস নয়, এখানে জল যেন কথা বলে ফিসফিস করে।
ছোট ছোট নৌকোগুলি যখন সেতুর নীচ দিয়ে যায়, তখন সে দৃশ্য বড়ই মনোরম। জলের উপর বাড়িগুলির প্রতিচ্ছবি এমন নিখুঁত যে, একনজরে বোঝা যায় না, বাস্তব কোথায়, আর স্মৃতি কোথায়!
ঘণ্টাধ্বনি, চকোলেট আর মানুষের নীরব ‘বেলফ্রাই অফ ব্রুজেস টাওয়ার’ থেকে যখন ঘণ্টা বাজে, সে শব্দ শহরের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু কোনও কোলাহল তৈরি করে না। বরং মনে হয়, প্রতিটি ধ্বনি যেন অতীতের কোনও দিনলিপি খুলে দিচ্ছে।
রাস্তার পাশে ছোট-বড় নানা ধরনের দোকান— চকোলেট, বিয়ার লেস, আর হাতে বানানো জিনিস। বেলজিয়ামের চকোলেট আর ওয়াফেল শুধু স্বাদ নয়, একধরনের সংস্কৃতি, যেন প্রতিটি টুকরোয় সময়ের একটা কোমল ছাপ লেগে থাকে। বেলজিয়ামের ব্রুজ সফর করে মনে হয় না, কোথাও সফর করতে গিয়েছি, মনে হয়, নিজেই এই শহরের ঐতিহ্যের কাছে ফিরে এসেছি।
একটি শহর, যেখানে কোনও তাড়া নেই, কোনও প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু থাকা যায়, শহরের ভিতরের নীরবতার সঙ্গে, ঐতিহ্যের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে, আনন্দের সঙ্গে। বেলজিয়ামের ব্রুজ শহরে কোনও উচ্চকিত কণ্ঠস্বর নেই, কোনও বিজ্ঞাপন নেই,
তবুও ফেরার পথে সহজেই বোঝা যায়, নিজের মনের ভিতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছে, হয়তো খুব সূক্ষ্মভাবে, হয়তো এমনভাবে, যা ভাষায় ধরা যায় না।
সূর্য ডুবছে, ক্যানেলের জলে আলো গলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, একটি রাজহাঁস নিঃশব্দে সরে যাচ্ছে ফ্রেমের বাইরে। আর আমরা। ভিডিয়ো রেকর্ডিং বন্ধ করার পরেও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম, কারণ সব গল্প শেষ হয় না শব্দে, লেখায়, বর্ণনায়, ছবিতে। কিছু গল্প থেকে যায় আলো, জল, জীবন আর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী থাকার মধ্যে।

