ড. রাজকুমার মোদক
প্রফেসর, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া
গত মাসে প্রথম সারির একটি বাংলা সংবাদপত্রে রোমহর্ষক একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছিল, মধ্যপ্রদেশের তিনটি গ্রামে ডাকাতিতে ‘স্নাতক’ হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচেও পিছপা হন না সেখানকার বাসিন্দারা। বিভিন্ন অপরাধের কোর্স করানো হয় সেখানে। রায়গড় জেলায় কাডিয়া, হুলখেড়ি এবং গুলখেড়ি— এই তিনটি গ্রামই অপরাধীদের ‘জন্মস্থান’ বলে মনে করা হয়। পুলিশ এবং রাজ্য প্রশাসন সব জানে। কিন্তু গ্রামে ঢোকাই পুলিশের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই খবরটি পড়ার পর সকলের মনে যে বিষয়টি প্রথমেই ধাক্কা দিতে পারে, সেটা হল, একসময় তো ডাকাতি করা, ঠ্যাঙাড়েগিরি করা পেশাই ছিল। ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস পালনের পর কি তাহলে ওইসব পেশায় এক্সপার্ট তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হবে? ডাকাতি নামক পেশাটি যে এক্কেবারে খারাপ, তা বলা যায় না। ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বদেশি আন্দোলনের সময় অত্যাচারী জমিদার বা নীলকর সাহেবদের বাড়িতে স্বদেশি ডাকাতরা যে ডাকতি করতেন, তার কিছুটা পরিচয় ধীরেন্দ্রলাল ধরের বাংলার ডাকাত বইটি পড়লেই পাওয়া যায়। কিন্তু এই আধুনিক যুগে যখন সারা বিশ্ব হাতের মুঠোয়, যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চলছে, তখন ডাকাতিতে ‘স্নাতক’ হওয়ার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করাটা যেন নৈতিক ও আইনিভাবে সিদ্ধ।
তবে এরকম সংবাদ অন্যান্য ব্যক্তির কাছে হাস্যকর বলে মনে হলেও আমাদের মতো ব্যক্তি, যারা শিক্ষকতাকে পেশা আর পাশাপাশি কিছুটা হলেও মিশন হিসাবে নিয়েছি, তাদের ভাবায় বইকি। ভাবায় এ কারণে যে, যিনি ডাকাতিতে ‘স্নাতক’ ডিগ্রি দেওয়ার জন্য পড়াচ্ছেন, তিনিও শিক্ষক। আর আমরা যারা বিভিন্ন সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছি, তারাও শিক্ষক। তাদের ছাত্ররা আবার ডিগ্রি পাওয়ার পর কেউই বসে থাকে না। সাকসেস রেট অনেকটাই হাই। ১০০ শতাংশ প্লেসমেন্ট। ডাকাতি না হয় প্রাচীনকাল থেকেই পেশা বলে স্বীকৃত। কিন্তু ডাকাতিতে স্নাতক তৈরি করায় যেসব ব্যক্তি নিযুক্ত, তাঁদের পেশাকে সত্যিই শিক্ষকতা আর এ বিষয়ে যারা শিক্ষার্থী, তাদের আদৌ ছাত্র বলা যাবে কি না, তা নিয়ে নানা সংশয় থাকলেও উভয়ের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক যে হয়ই, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর এই সম্পর্ক যে অতি পবিত্র, একথা বলাই বাহুল্য। আর এই পবিত্র সম্পর্কের প্রকাশস্বরূপ একজন সফল ডাকাত আদৌ শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠান পালন করে কি না বা ভবিষ্যতে পালন করবে কি না, সে বিষয়ে আদৌ জানা না থাকলেও স্বাধীনতা উত্তরকালে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের সূচনা ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণাণের জন্মদিনকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল।
অন্য পোস্ট: কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরাট প্রভাব পড়তে চলেছে
এটা ভুললে চলবে না যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে এই পরম্পরা চালু রয়েছে সুদীর্ঘকাল থেকেই গুরুপূর্ণিমা পালনের মাধ্যমে। শিক্ষক শব্দটির দ্যোতনা আর গুরু শব্দের দ্যোতনা এক না হলেও এক্কেবারে আলাদাও নয়। তবে ব্যাসদেবের জন্মদিনকেই ভারতীয়রা যে গুরুপূর্ণিমা রূপে বেছে নিয়েছিল, তার মূলে রয়েছে তাঁর পাণ্ডিত্যের অগাধ গভীরতা। বেদের সংকলন তো বটেই, তার বিভাগ, ১৮টি পুরাণ, মহাভারত, ব্রহ্মসুত্র ইত্যাদি তিনিই রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। স্বভাবতই তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতির এর চেয়ে ভালো পথ আর ছিল না। আধ্যাত্মিকতার পূজারি ভারতে গুরুপূর্ণিমা পালনের মাধ্যমে গুরুকে শ্রদ্ধা জানানোর মূল উদ্দেশ্য হল, গুরু শিষ্যকে আত্মজ্ঞান লাভে সহায়তা করেছেন বা করছেন বা করবেন, তাঁর প্রতি অকপট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণাণের সময়কালে অবশ্য ভারতে নবজাগরণ হয়ে গিয়েছিল। ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন উপরাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত, তখন ভারত স্বাধীন। তিনি ভারতের সংস্কৃতি, দর্শন তথা ঐতিহ্যকে এমনভাবে ইউরোপীয় দেশগুলিতে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তাঁকে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সভ্যতার সেতুবন্ধনকারীও বলা হয়। এ কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাধাকৃষ্ণাণের ‘The Philosophy of Upaniṣads’ বইয়ের ভূমিকা শুরুই করেন এভাবে, ‘NOT being a scholar or a student of philosophy, I do not feel justified in writing a critical appreciation of a book dealing with the philosophy of the Upaniṣads. What I venture to do is to express my satisfaction at the fact that my friend Professor Radhakrishnan has undertaken to explain the spirit of the Upaniṣads to English readers.’ অবশ্য তিনি যে এ কাজে প্রথম ব্রতী ছিলেন, তা নয়। এর সূচনা হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়, বিবেকানন্দ, ম্যক্সমুলারদের হাত ধরে। তবে ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণাণের বিশেষত্ব ছিল যে, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষক এবং পাশাপাশি স্টেটসম্যান।


বিষয়টা পড়ে খুব ভালো লাগল স্যার । অনেক নতুন বিষয় জানতে পারলাম 🙏
Darun ❤️