স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

তখন সুনীল সাম্রাজ্য। তাঁর জনপ্রিয় আধিপত্য বাংলা সাহিত্যে অভিভাবকত্ব লাভের পথে। ‘দেশ’ময় তাঁর আভিজাত্য প্রকাশ, ‘আনন্দ’ময় তাঁর আকাশ। আমরা সুদূর উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর উষ্ণতায় তাঁকে উপভোগ করি। তখন বাংলায় এমএ, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৯৮ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকী। তাঁকে নিয়ে বিভাগে সেমিনার। অন্য অনেক রথি-মহারথির সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আগমন। তখনও সাহিত্য ভুবন ছিল তাঁর কাছে অধরা মাধুরী, কিন্তু মনে সুনির্মল সুনীল। সৃষ্টির প্রাচুর্যে পুরস্কার-সম্মানের আলোয় ও আনন্দবাজার গোষ্ঠীর আনুকূল্যে তাঁর আকষর্ণীয় বিস্তার। অথচ তখন আমার জীবন-সংগ্রামের মধ্যে তাঁর সাহিত্যসম্ভারের হাতছানি তীব্র হয়ে ওঠেনি। দুরন্ত জীবনে উড়ন্ত যৌবন। সেখানে দারিদ্রের লাগামে আমি নিয়ন্ত্রিত। ইচ্ছাগুলো সব ভবিষ্যতের জন্য তোলা ছিল। সময় আর সুযোগের অপেক্ষায় আমি তখন তৃষ্ণার্ত চাতক।
ইতিমধ্যে সুনীলকে জেনেছি আপন করে। তাঁর সৃজনবিশ্বের আলোতেই তাঁর সাধারণ জীবনের পরিচয় জেনে আত্মবিশ্বাসের রসদ খুঁজেছিলাম। আসলে সকলে নিজের মতো করে খোঁজে, নিজেকে মেলাতে চায়, মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসের পাথেয় খোঁজে। সেখানের সুনীলের উদার আকাশ সহজেই হাতছানি দেয়। ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল হয়ে এদেশে এসে অতি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা সুনীলের গড়ে তোলা জীবনের ইতিবৃত্তে তখন নিজেকে খুঁজে নেওয়ার রোমাঞ্চ আবর্তিত হতে থাকে। বাবার কাছে অনুবাদ করতে গিয়ে কবিতাচর্চায় শামিল হওয়া থেকে তাঁর টিউশন পড়িয়ে বড় হওয়ার কথার মধ্যে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়ার ঝোঁক স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।
আসলে বাংলা সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আগমন থেকে আবির্ভাবে সহজ সরল, অথচ অনন্যসাধারণ আভিজাত্যে অভিভাবকসুলভ দেখনদারি ছিল না, ছিল না স্বতন্ত্র সাজার অভিজাত আড়ম্বর। প্রমাণের মাধ্যমে তাঁর স্বমান ও স্বনামের শ্রীবৃদ্ধিই তাঁকে পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে দেয়নি।
সুনীল তাঁর স্বকীয় বিশেষত্বেই সকলের সমীহ আদায় করেছিলেন। আপন হয়েছিলেন স্বমহিমায়। সেখানে শুধু তাঁর সাহিত্যের পাঠকের মধ্যেই নয়, ব্যক্তিত্বের আলোয় সেলিব্রিটির জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে। অথচ এজন্য তাঁর গুরুদেব সাজার বাতিক ছিল না। শক্তি প্রদর্শনের প্রয়াসও সক্রিয় হয়নি। উলটে গুরুর গুরুত্বকে লঘু করাই তাঁর ব্রত ছিল। অসাধারণ করে নয়, সাধারণে অসাধারণ হয়েই তাঁর বিস্তারে তাঁকে আপন মনে হয়েছিল। তাঁর সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বই আমাকে প্রথম আকৃষ্ট করেছিল। অথচ তখনও তাঁর ‘আত্মপ্রকাশ’, ‘সেই সময়’, ‘পূর্ব পশ্চিম’, ‘প্রথম আলো’ চোখ-কানে এলেও কোনওটাই চেখে দেখার অবকাশ মেলেনি। নীললোহিত, নীল উপাধ্যায় বা সনাতন পাঠকের পরিচয়ও নিবিড় হয়ে ওঠেনি। অবশ্য তখনই বইপত্র, পত্র-পত্রিকায় তাঁর বিস্তার ও প্রচারে অসাধারণ লেখকের পরিচয় কৌতূহলী করে তুলেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৯৯-এ ‘দেশ’-এ সুনীলের আত্মজীবনী ‘অর্ধেক জীবন’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ শুরু। তাঁর সাধারণে অসাধারণ হয়ে ওঠার কথা তাতে আন্তরিক হয়ে উঠেছে।
অন্য পোস্ট: কর্মসংস্থানের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরাট প্রভাব পড়তে চলেছে
বিভাগের সেমিনারে তাঁর উপস্থিতি ছিল বাড়তি পাওয়ার আনন্দ, সেলিব্রিটির আগমনী উত্তেজনা। বক্তব্য শোনার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। সেদিন তাঁর বক্তব্যের দু’টি বিষয় আমাকে এখনও ভাবায়। তাঁর কথায়, বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ই শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। গ্রামবাংলাকে তাঁর মতো আর কেউ তুলে ধরতে পারেননি। অবশ্য অন্য দুই বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থাৎ বিভূতিভূষণ ও মানিকের প্রতিও তাঁর অসীম শ্রদ্ধার কথা পরে জেনেছি। কমলকুমার মজুমদারকে নিয়ে তাঁর অসামান্য মূল্যায়নও পড়ছি। কিন্তু সেদিন তারাশঙ্করের ঔপন্যাসিক পরিচয়ে তাঁর শ্রদ্ধাবোধ নতুন করে ভাবিয়েছিল আমায়। সত্যিই তো, ৭০-এর বেশি উপন্যাসের ক্যানভাসে গ্রামবাংলার আকাঁড়া জীবনচিত্রের পরিচয়ে তারাশঙ্কর অতুলনীয়। তাঁর মতো বিবর্তমান দ্বন্দ্বমুখর উপন্যাসের পরিচয় সত্যিই দুর্লভ। অন্যদিকে বাড়তি উপহারস্বরূপ আর একটি মজার বিষয় বলেছিলেন সেদিন। ফরাসিদের আধুনিকতা বিষয়ে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। শিল্পসাহিত্যের পীঠস্থান প্যারিসের অভিজাত নান্দনিকতাবোধ কোথায় গতিময় অনন্য, তা সুনীলের কথাতেই সবাক মূর্তি লাভ করে। একটি মেয়ে রাস্তায় ছুটে যাচ্ছে। তাকে একজন জিজ্ঞেস করায় সে বলে, এখন দাঁড়ানোর সময় নেই। তার জামাটা পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। তাই সে নতুন জামার খোঁজে ছুটে চলেছে। অন্যদিকে ফরাসি মেয়েরা আয়নার সামনে বসে প্রথমে বিভিন্ন প্রসাধনী মুখে মেখে খুব সুন্দর করে সাজে। সাজা শেষ হলে সেগুলো মুছে ফেলে। তখন অন্যরকম সৌন্দর্য বেরিয়ে আসে। এভাবে সাজার পর মুছে আরও নান্দনিকতার অজানা খনির পরশমণিতে আমরা তখন বিস্ময়ের ঘোরে। তার পরও একাধিক প্রশ্ন করেছিলাম। উত্তরও দিয়েছিলেন তার। সেসব আর মনে নেই। কিন্তু পরের দিন ক্লাসে ম্যাডাম আমাদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা করার সময় সবাইকে চমকে দিয়ে যে কথা বললেন, তাতে তাঁর দৃষ্টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ভেবেছিলাম বলবেন, ছেলেটি বেশ প্রশ্ন করের মতো কিছু কথা শোনা যাবে। তা নয়, বলেছেন, ছেলেটি ঠিক কৃষ্ণের মতো দেখতে। তাঁর এই দেখার স্বতন্ত্রতাই তাঁকে যেমন বিতর্কিত করেছে, তেমনই দিয়েছে অনন্যসাধারণ বাগবিভূতিময় সৃষ্টিশীলতা। সেদিন তাঁর সেই বাঙ্ময় প্রকাশ আমার অজানা দ্বীপ আবিষ্কার, কৃষ্ণ রূপ খুঁজে পাওয়া আমার শ্যামসুন্দর রূপ লাভ।
