Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শতবর্ষে সুকান্ত

তাঁর মৃত্যুর পরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল টিবির ওষুধ৷ এখন টিবি দুরারোগ্য কোনও অসুখই নয়৷ তাই আপশোস হয়, কেন আর কিছুদিন আগেই টিবির ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। প্রত্যেক সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরই আজও খুব কষ্ট হয় মারণব্যাধিতে প্রয়াত কবির কথা ভেবে৷ অসময়ে তাঁর প্রয়াণ না হলে আরও এক বড় মাপের কবিকে পেতে পারত বাংলা কাব্যসাহিত্য৷

Share Links:

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রাক্তন সংস্কৃতি অধিকর্তা এবং সাহিত্য অকাদেমি, বঙ্কিম, বিএফজেএ পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক

সরল, দেবদূতপ্রতিম মুখ। অভিব্যক্তিতে হাসির সামান্য উদ্ভাস। কনুইয়ে ভর দিয়ে গালে রাখা হাত। চোখে চোখ রাখলেই মন ভরে যায়। তবু কোথাও বিঁধে থাকে একটুকরো ব্যথা৷

সুকান্ত ভট্টাচার্য আমার প্রথম বয়সের প্রেম৷ এই প্রেম একধরনের ‘ইনফ্যাচুয়েশন’, স্কুল পড়ুয়া কিশোরদের যেমন হয়ে থাকে৷ তাঁর কবিতার সঙ্গে পরিচয় হওয়া এক অলৌকিক ঘটনা৷ তখন আমি গ্রামে বাস করি। ইছামতী নদীতীরে সবুজ গাছগাছালিতে ভরা এক সরল পটভূমিতে মকসো করি দু’–চার লাইনের ছড়া৷ ছন্দের দিকে যত না ঝোঁক, তার চেয়ে বেশি পঙ্‌ক্তির শেষে মিলটি যেন ঠিকঠাক হয়৷ ক্লাস সেভেনে ওঠার সময় একটি ডায়েরি তখন ভর্তি অপটু হাতের ছড়ায়৷ তখনও সাহিত্য বলতে বুঝি স্কুলপাঠ্য বাংলা বইয়ের গল্প–কবিতা৷

আধুনিক কবিতার সঙ্গে ঠিকঠাক পরিচয় হল, যখন ক্লাস এইটে পড়ি৷ বাড়িতে নতুন রেডিয়ো এল। লম্বা এরিয়েলের তার বাঁধা দু’টি উঁচু গাছের মগডালে। শুক্রবার তার ‘সাহিত্যবাসর’ অনুষ্ঠানে আধুনিক কবিতা শুনি মন দিয়ে৷ তখনও চোখে দেখিনি কোনও আধুনিক কবিতা৷

আধুনিক কবিতার সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনায়৷ আমার নকাকা ভালোবাসতেন গল্প–উপন্যাস পড়তে৷ তাঁর একটা চাকরি হল স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসে৷ তাঁর বন্ধুরা অনেক দিন ধরেই বলছিলেন, ‘নতুন চাকরি পাওয়ার পর খাওয়াতে হয়’৷

সামনেই ছিল আমার জন্মদিন৷ নকাকা হঠাৎ ঠিক করলেন, আমার জন্মদিন পালন করবেন৷ সম্ভবত সেই প্রথম আমার জন্মদিন পালন৷ নকাকার নতুন চাকরি পাওয়া, সেই সঙ্গে আমার জন্মদিন, দুই উপলক্ষ মিশিয়ে বাড়িতে ভুরিভোজ৷ খাওয়ার সঙ্গে আমার লাভের লাভ কাকার বন্ধুদের কাছ থেকে দু’টি অমূল্য কাব্যগ্রন্থ উপহার হিসাবে পাওয়া— বিষ্ণু দে–র ‘চোরাবালি’ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’৷

আমি তখন নিয়মিত পদ্য লিখি জেনে কাকার বন্ধুরা এই উপহার দিয়ে আমাকে ধনী করে দিলেন সেই গ্রামে৷ সেখানে লাইব্রেরি নেই, কবিতার বই পাওয়া এক দুর্লভ ঘটনা। অতএব আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল এই দু’টি বই৷ কতবার যে আদ্যোপান্ত পাঠ করেছি কবিতাগুলি! তবে বিষ্ণু দে–কে উপলব্ধি করা একটু কঠিন ছিল সেই বয়সে। ক্রেসিডা বা হেলেনের ঠিকুজিকোষ্ঠি জানা অসম্ভব ছিল তখন। বরং সুকান্ত হয়ে উঠেছিলেন আমার খুব কাছের মানুষ৷ মাত্র একুশ বছর বেঁচেছিলেন যে কবি, তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল বিস্ফোরণের মতো এক একটি কবিতা। তা ভাবতেই কেমন রোমাঞ্চ জাগত শরীরে৷

যখন জেনেছিলাম, সে সময় সুকান্ত দুরারোগ্য টিবি রোগে ভুগে অকালপ্রয়াত হয়েছিলেন, তখন কী যে কষ্ট হয়েছিল! পরবর্তীকালে জেনেছি, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর বন্ধু। তখন ভাবতাম, বেঁচে থাকলে আরও এক স্মরণীয় কবি পেত বাংলা সাহিত্য৷

তবে সুকান্ত একুশ বছর বয়সের মধ্যে যেটুকু লিখেছেন, তাতেই একশো বছরে পৌঁছে তিনি আজও স্মরণীয়৷ ‘ছাড়পত্র’ হাতে পাওয়ার পর মনে হয়েছিল, এমন এক কবির সন্ধান পেলাম, যিনি আমাকে লিখতে শেখালেন আধুনিক কবিতা৷ তখন বিছানায় বসে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে পড়ছি—

শোন রে মালিক, শোন রে মজুতদার,

তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়,

হিসাব কি দিবি তার?

প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,

ভেঙেছিস ঘরবাড়ি,

সে কথা কি আমি জীবনে মরণে

কখনো ভুলিতে পারি?

আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই,

স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি জ্বালবই৷ (বোধন)

পড়তে পড়তে গরম হয়ে উঠত শিরার ভিতর সদাপ্রবহমান রক্ত৷ ঠাকুরদার মুখে শুনেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কালোবাজারি আর মজুতদারদের কালো হাতের কারসাজিতে কীভাবে বেড়ে গিয়েছিল জিনিসপত্রের দাম৷ কীভাবে মন্বন্তরে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ৷ শুনে রাগে ফেটে পড়ত আমার ভিতর–মানুষ৷ মনে হত, সুকান্ত ভট্টাচার্যই সেই কবি, যাঁর অনুভবে যথার্থ ধরা পড়েছিল সমকালীন অত্যাচার–নাচারের কথা৷ আর সেই বয়সে যা হয়, এক একটি কবিতা পড়ি, মনে হয়, এরকম কি আমিও কি লিখতে পারব? অল্প বয়সের অনুকরণপ্রিয়তা জাঁকিয়ে বসে মাথার মধ্যে৷ ‘একটি মোরগের কাহিনী’ পড়ি, ‘সিগারেট’ পড়ি, ‘দেশলাইকাঠি’ পড়ি। মনে হয়, কী করে এমন একটি অভিনব আইডিয়া পেলেন সুকান্ত? আমিও খুঁজতে থাকি এরকম কোনও ভাবনা, যা পড়ে মুগ্ধ হবেন পাঠক।

অচিরেই উপলব্ধি করলাম, অনুকরণ করে বড় কিছু হওয়া যায় না, চাই নিজস্বতা৷ কিন্তু অল্প বয়সের সেই ভালোবাসা থেকে গেল বাকি জীবনে৷ পরে সংগ্রহ করলাম প্রথমে ‘মিঠেকড়া’, আরও পরে ‘সুকান্ত সমগ্র’। সেই বইয়ের সব লেখা পড়ে ফেললাম একটু একটু করে৷

বেশ কয়েকটি প্রতিবাদের কবিতা পড়ে প্রথমে মনে হয়েছিল, সুকান্ত মূলত ‘প্রতিবাদী কবি’৷ ‘ছাড়পত্র’-র অনেক কবিতাতেই প্রতিবাদ, বিদ্রোহ মূল সুর হলেও তাঁর প্রেমের কবিতাও কম নেই৷ ছড়াও লিখেছেন বহু৷ এরকম একটি প্রেমের কবিতার কয়েকটি লাইন—

আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়,

তবুও পড়িবে মনে।

চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে কভু হৃদয়ের আঙিনায়,

রজনীগন্ধা বনে,

তবুও পড়িবে মনে৷ (স্মারক)

তবে সেই তরুণ বয়সে সুকান্ত বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেসব কবিতা লিখেছিলেন, তাতে তাঁর মনের গভীরে জমে ওঠা ক্ষোভ, ক্রোধ, প্রতিবাদ প্রকাশ করেছিলেন নির্দ্বিধায়৷ এরকমই একটি কবিতা কয়েকটি লাইন—

ভারতবর্ষ, কার প্রতীক্ষা করো?

কান পেতে কার শুনছ পদধ্বনি?

বিদ্রোহে হবে পাথরেরা থরোথরো,

কবে দেখা দেবে লক্ষ প্রাণের খনি? (সূচনা)

‘ছাড়পত্র’-র কবিতাগুলি যেহেতু বহুলপঠিত, তাই অন্য বই থেকে নিলাম এই লাইনগুলি৷ সুকান্তর অভিনব ভাবনার সঙ্গে ছন্দের মিলনে কবিতা হয়ে ওঠে হীরকখণ্ডের মতো উজ্জ্বল ও মূল্যবান৷ প্রেমে হোক, প্রতিবাদে হোক, তাঁর অনুভূতি ও তার প্রকাশ একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত৷ আসলে তিনি মার্কসবাদ পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কমিউনিজমের প্রতি৷ পার্টির কাজে ব্যস্ত থাকতেন দিনরাত৷ ঘুরতেন নানা জায়গায়৷ পাগলের মতো পার্টির কাজ করতে গিয়ে অবহেলা করেছিলেন নিজের শরীরের প্রতি৷ বেনারসে গিয়ে আক্রান্ত হন ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায়। অনেক দিন ভোগেন জ্বরে৷ ফিরে এসে আক্রান্ত হন কালাজ্বরে৷ ভালো হয়ে উঠে ফের জ্বরে আক্রান্ত হন৷ তাঁর সেই বারবার অসুস্থ হওয়ার কারণ কেউ বুঝতে পারছিলেন না৷

অনেক দিন পরে জানা যায়, সুকান্ত ইন্টেস্টাইনাল টিবিতে আক্রান্ত৷ সে সময় টিবি মানে কালান্তক ব্যাধি৷ তখনও পর্যন্ত টিবির কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি পৃথিবীতে৷ টিবি মানে নিশ্চিত মৃত্যু৷ বাংলা সাহিত্যের সব কবি–লেখক এগিয়ে এসেছিলেন তাঁকে সাহায্য করতে, কিন্তু কোনও কাজে লাগেনি৷ যাদবপুর টিবি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি৷ ঠিক করা হয়েছিল, আজমেরে স্যানাটোরিয়ামে ভর্তি করা হবে। টাকাও তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পাঠানোর আগেই একদিন রাতে পাড়ি দেন না–ফেরার দেশে৷

সুকান্তর মৃত্যুর পরেই আবিষ্কৃত হয়েছিল টিবির ওষুধ৷ এখন টিবি দুরারোগ্য কোনও অসুখই নয়৷ তাই আপশোস হয়, কেন আর কিছুদিন আগেই টিবির ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। প্রত্যেক সাহিত্যপ্রেমী মানুষেরই আজও খুব কষ্ট হয় মারণব্যাধিতে প্রয়াত কবির কথা ভেবে৷ অসময়ে তাঁর প্রয়াণ না হলে আরও এক বড় মাপের কবিকে পেতে পারত বাংলা কাব্যসাহিত্য৷

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए