Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যের আকাশে সত্যিই যেন একটি আলো নিভে গেল

শংকর।

Share Links:

কাজল মুখোপাধ্যায়

বাংলা কথাসাহিত্যের এক দীর্ঘ, নির্ভরযোগ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক, ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের স্রষ্টা মনিশংকর মুখোপাধ্যায় (পাঠকমহলে যিনি ‘শংকর’ নামেই সমধিক পরিচিত) দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম ও সাহিত্যসাধনার পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় বাইপাসসংলগ্ন এক বেসরকারি হাসপাতালে পরলোকে গমন করলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

বাংলা সাহিত্যের আকাশে সত্যিই যেন একটি আলো নিভে গেল। শহরের ভিড়, মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ হাহাকার, স্বপ্ন আর আপসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলির কথা যিনি কোনও অতিনাটক না করে, শোরগোল না তুলেই লিখে যেতে পারতেন, সেই শংকর আর নেই।

শংকর ছিলেন আধুনিক শহুরে জীবনের এক নির্ভরযোগ্য ভাষ্যকার। কলকাতার ব্যস্ততা, মধ্যবিত্ত জীবনের দ্বিধা, চাকরি-ব্যবসার অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের জটিলতা, এই সমস্ত অনুচ্চারিত বাস্তবতাকে তিনি নাটকীয়তা না বাড়িয়ে, অত্যন্ত সংযত ও স্বচ্ছ ভাষায় তুলে ধরেছেন।

রানাঘাটে জন্ম এই জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিকের, তবে তাঁর সাহিত্যজীবন গড়ে উঠেছিল মূলত কলকাতা ঘিরে। কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্বে কোর্ট-কাছারি ও আইনি পরিসরের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখালেখির ভিত গড়ে দেয়। মানুষের মুখোশ, ক্ষমতার স্তরবিন্যাস, স্বার্থ ও নীরব আত্মসমর্পণ, এই অভিজ্ঞতাগুলিই পরবর্তীকালে তাঁর উপন্যাসে হয়ে ওঠে বাস্তবতার মূল সুর। এই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘কত অজানারে’। তাতে অচেনা মানুষের জীবনের ভিতর দিয়ে উঠে আসে পরিচিত শহরের এক অন্তর্মুখী মানচিত্র।

তবে শংকরের সাহিত্য-কীর্তির কেন্দ্রে চিরকাল থাকবে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘চৌরঙ্গী’। একটি অভিজাত হোটেলের লবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহু চরিত্রের আশা, প্রেম, লোভ, প্রতারণা ও আত্মসম্মানের লড়াই। এই উপন্যাসে তিনি আধুনিক কলকাতার সামাজিক মনস্তত্ত্বকে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় ধরতে পেরেছিলেন। আজও বাংলা সাহিত্যে ‘চৌরঙ্গী’ একটি যুগচিহ্ন। তারপর একে একে তিনি উপহার দিয়েছেন জন অরণ্য, সীমাবদ্ধ, যেখানে যেমন, সম্রাট ও সুন্দরী, চরণ ছুঁয়ে যাই প্রভৃতি, যেগুলি আলাদা আলাদা ভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের নৈতিক সংকট, পেশাগত আপস এবং ব্যক্তিগত অসহায়তার দলিল হয়ে রয়েছে।
শংকরের লেখার গভীরতা আকৃষ্ট করেছিল বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়কেও।

শংকরের কাহিনি অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেছিলেন ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জন অরণ্য’ বাংলা চলচ্চিত্র। এই দু’টি ছবি বাংলা সিনেমায় কর্পোরেট জগতের নৈতিক সংকট এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যুবসমাজের বেকারত্বের যন্ত্রণাকে এক নতুন বাস্তব ভাষা দিয়েছিল।

কেবল কথাসাহিত্যেই নয়, শংকর ছিলেন মননচর্চার মানুষও। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ থেকে জন্ম নিয়েছিল গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’। সেখানে আবেগের চেয়ে অনুসন্ধান ও তথ্যের গুরুত্ব বেশি। অন্যদিকে খাদ্যরসিক মানুষ হিসাবে বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতি নিয়েও তিনি লিখেছেন বহু আকর্ষণীয় বই। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের স্বাদ-গন্ধও তাঁর লেখায় জায়গা করে নিয়েছিল সহজ স্বাভাবিকতায়। সাহিত্যজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার-সহ একাধিক দেশি ও আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি পাঠকের আস্থা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককুল তাঁর বইয়ে ফিরে ফিরে খুঁজে পেয়েছে নিজেদের জীবনের প্রতিধ্বনি।

শংকরের সাহিত্যিক পরিচয় কখনও কেবল জনপ্রিয়তার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নায়ক নয়, মানুষ নির্মাণ করেছেন। বক্তব্য দেননি, রেখে গিয়েছেন নীরব প্রশ্ন। তিনি শহরকে সাজিয়ে তোলেননি, দেখিয়েছেন শহরের ক্লান্ত মুখ, দ্বিধাগ্রস্ত চোখ আর নিঃশব্দ লড়াই। তাঁর প্রয়াণে কেবল একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকের প্রয়াণ হল না, বাংলা সাহিত্য জগৎ হারাল সেই লেখককে, যিনি আধুনিক কলকাতার ভিতরের নিঃশব্দ কান্নাকে ভাষা দিতে পেরেছিলেন। এই কথাকার আধুনিক কলকাতার সামাজিক ইতিহাসকে উপন্যাসের ভাষায় সংরক্ষণ করে রেখে গেলেন।

শংকর চলে গেলেন, কিন্তু হোটেলের লবিতে বসে থাকা একাকী মানুষ, অফিসের করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ কর্মী, আর জীবনের সঙ্গে আপস করতে থাকা মধ্যবিত্ত সংসার, এসব চরিত্রের ভিতর দিয়েই তিনি থেকে যাবেন বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিতে। তিনি সাহিত্যের পাঠকদের মনে চিরকাল থেকে যাবেন, কারণ মুষ্টিমেয় লেখকই সময়ের সাক্ষী নয়, সময়ের দলিল।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए