মহাশোরগোল প্রতিবেদন: পণ্ডিত সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি বিশিষ্ট নাম। তিনি মূলত তবলাবাদ্যের প্রশিক্ষক এবং পণ্ডিত। শাস্ত্রীয় বাজনায় তাঁর রয়েছে অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য। কণ্ঠের রাগ-তান অনায়াসে আঙুলে ফুটিয়ে তোলেন তাল-বাদ্যে। জেলা, রাজ্য, দেশে বহু গুণী শিল্পী তাঁর কাছে তালিম নিয়ে সংগীতজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত।
পণ্ডিত সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের একটি সংস্থা রয়েছে, যেখানে উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা তবলা শেখেন। সংস্থাটির নাম ‘প্রেরণা ইনস্টিটিউট অব কালচার’ । সংস্থার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১ ডিসেম্বর, রবিবার বাঁকুড়ার রবীন্দ্রভবনে আয়োজিত হয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক বিশেষ সম্মেলন। বাঁকুড়া জেলা, ভিনজেলা, কলকাতা, মায় সমগ্র রাজ্য থেকে গুণী ছাত্রছাত্রী ও আমন্ত্রিত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীরা এখানে তাঁদের কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, তবলা লহরা পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।
প্রথা ও ঐতিহ্য মেনে প্রদীপ প্রজ্বলন করে শুরু হয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের অনুষ্ঠানটি। প্রদীপ প্রজ্বলন করেন সংস্থার কর্ণধার ও প্রশিক্ষক পণ্ডিত গুরু সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়। প্রদীপ প্রজ্বলনের মুহূর্তে বেদ ও উপনিষদ মন্ত্র উচ্চারণ করেন প্রাবন্ধিক শক্তি চট্টোপাধ্যায়। দুপুর ২টোর পর অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিভিন্ন রাগ-রাগিনী-তালবাদ্যে মুখরিত হয়ে ওঠে রবীন্দ্রভবনের অন্দরমহল। প্রায় ৮ ঘণ্টা অনুষ্ঠান চলে।
সংস্থার উদ্দেশ্য ও সাফল্য নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন পণ্ডিত সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়। শাস্ত্রীয় সংগীতের আধারে বিভিন্ন গান ও শাস্ত্রীয় সংগীতে অংশগ্রহণ করেন চন্দন বসু, রামময় মুখোপাধ্যায়, তাপস মুখোপাধ্যায়, সংগীতা দে সরকার, কৌশাম্বি মুখোপাধ্যায়, শান্তনু চক্রবর্তী, রবি বাগদি, জয়ন্ত ভট্টাচার্য, জ্যোৎস্না চ্যাটার্জি, দেবাশিস ব্যানার্জি, শ্বেতা চ্যাটার্জি, রশ্মি মজুমদার, চঞ্চল রুইদাস ও অন্যরা। যন্ত্রসংগীতে অংশগ্রহণ করেন দিলীপ নাগ(গিটার), শান্তিময় চ্যাটার্জি (বাঁশি), দেবাশিস দাস (সেতার), শুদ্ধশীল চ্যাটার্জি (সন্তুর), মানস মিশ্র (তবলা লহরা)। হারমোনিয়ামে সঙ্গত করেন সুব্রত ভট্টাচার্য, দেবাশিস ব্যানার্জি, রবি বাগদি, দেবশঙ্কর চট্টরাজ।
অনুষ্ঠানটির শ্রেষ্ঠতম উৎকৃষ্ট পরমজ্যোতির অঙ্গ হয়েছিল পণ্ডিত সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সম্মিলিত তবলার বৃন্দবাদন বা তবলা লহরা। তবলা বৃন্দবাদনে অংশগ্রহণ করেন সুব্রত ব্যানার্জি, সত্যজিৎ লক্ষ্মণ, সৌমেন মুখার্জি, দেবাশিস ব্যানার্জি, বিশ্বজিৎ কর, সুব্রত পাত্র, সোমনাথ পাত্র, শ্যাম ভাণ্ডারি, পিন্টু বাউরি, দেবেন রুইদাস, নীলাঞ্জন পতি, মানস মিশ্র, উত্তম পরামানিক, বিদ্যুৎ কর্মকার, কাশীনাথ মহন্ত এবং পণ্ডিত সৌমিত্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং। সৌমেন মুখার্জি, সুব্রত ব্যানার্জি, সত্যজিৎ লক্ষ্মণরা শাস্ত্রীয় গানে শিল্পীদের সঙ্গে তবলাতেও সঙ্গত করেন।
রবীন্দ্রভবনে শত শত বোদ্ধা শ্রোতা-দর্শক অনুষ্ঠানের স্বাদ নিয়ে বুঝলেন অষ্টাদশ শতকের আনদ্ধ জাতীয় ঘাত বাদ্যযন্ত্রটি সুপ্রশিক্ষণ ও তালিমের কৌশল আয়ত্তে আজও হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অতীব প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য প্রথম শ্রেণির সঙ্গত বাদ্য। কথায় আছে, অনুষ্ঠান স্বর্গীয় সৌন্দর্যের রূপ নেয় দক্ষ সংযোজনার গুণে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি বিশিষ্ট বাচিক ও সংগীতশিল্পী দেবাশিস মৌলিকের উপস্থাপনায় হয়ে উঠেছিল সত্য সুপ্ত স্বপ্নময় মায়াশক্তিতে। অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল, আকাশবাণীর অনুষ্ঠান শুনছি। সঞ্চালক দেবাশিস মৌলিকের কম কথা, যথাযথ সংযোজন, বলিষ্ঠ ও দৃপ্ত কণ্ঠে অনুষ্ঠানটির ঘোষণা দৃঢ় ভালো লাগার ঐশ্বর্যমণ্ডিত স্বর্গপুরী করে তুলেছিল।
