সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

ধনধান্য অডিটোরিয়ামে শুরু হয়ে গিয়েছে ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বা কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল (সংক্ষেপে কেআইএফএফ)। গত ৬ নভেম্বর এর উদ্বোধন হয়েছে।
৭ নভেম্বর শোলে ছবির পরিচালক রমেশ সিপ্পি সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমি বাণিজ্যিক ও অফবিট চলচ্চিত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। দেশের নানা অংশ থেকে আমি অনেক কিছু গ্রহণ করে এটা করেছি। তবে প্রধানত তা বাংলা থেকেই শিখেছি। এর জন্য আমার কাছে কলকাতা তথা বাংলার বড় রকমের ধন্যবাদ প্রাপ্য।পরিচালক সুজয় ঘোষ মন্তব্য করেছেন, গত শতকের ছয়ের দশকে আমার জন্ম। তাই চলচ্চিত্রে আমার জন্মসূত্রে অধিকার। আপনাদের ব্লাড গ্রুপ এ বা বি নয়, সেটা সি অর্থাৎ সিনেমা।’
যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে পরিবেশ দূষণ প্রতিহত করার আন্তর্জাতিক দিবস ৬ নভেম্বর, তাই উদ্বোধনের জন্য এই তারিখটি বাছা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মানীয় জুরিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তিলোত্তমা সোম, কিরণ সিপ্পি, চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, পাওলি দাম, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত মোহতা, রাজ চক্রবর্তী, রূপঙ্কর বাগচি ও ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঋত্বিক স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছে। বাংলা ও ককোরবক ভাষায় (ত্রিপুরার আদিবাসী ভাষা) নির্মিত ‘পরবাসী’ ছবিটি এই উৎসবে ভারতীয় ভাষা বিভাগের জন্য প্রতিযোগিতায় নামছে। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান থেকে ত্রিপুরায় অভিবাসিত হিন্দু বাঙালি জনগণের ছিন্নমূল হওয়ার প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। তবে এটা শুধু চলচ্চিত্র নয়, এখানে একটি বিশেষ অভিমুখ থেকে ঘটনা বিবৃত হয়েছে। ছবিটি লোকনাথ দে, কিঞ্জল নন্দ, আঁখি ঘোষ, অজয় ত্রিপুরা ও স্বাতী মুখার্জির অভিনয়ে সমৃদ্ধ। এখানে একজন কাল্পনিক স্কুল শিক্ষকের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে, যিনি ১৯৬০ সালে গন্ডগোলের সময় পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে তাঁর কন্যাকে হারান এবং ত্রিপুরায় তাঁর জীবন নতুন করে গড়তে চান। কিন্তু উদ্বাস্তু ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ায় সেই সামাজিক দ্বন্দ্বে তাঁর নিরাপত্তা, পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের আশা ফের কঠিন বাধার সম্মুখীন হয়।
পরিচালক সাহা বলেন, ‘এ ছবির প্রযোজক অনিলচন্দ্র দেবনাথ আমাকে মাত্র ৪১ পৃষ্ঠার একটি গল্প দিয়েছিলেন। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে এসব হিন্দু উদ্বাস্তুর জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়।’
উৎসবে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় একগুচ্ছ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে তথ্যচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি। এশীয় ভাষার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক ছবি এবং বাংলা ভাষার ক্লাসিক সিনেমাও রয়েছে। এ বছর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে পোলিশ চিত্রনির্মাতা ওজসেক জার্সি হ্যাজ ও ভারতের কিংবদন্তি পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের বিখ্যাত ছবির প্রদর্শনীর ওপর। ঋত্বিকের ছ’টি ছবি দেখানো হবে। এগুলির মধ্যে রয়েছে ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘অযান্ত্রিক’ প্রভৃতি।
বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হবে ক্লডিয়া কার্ডিনেল, ডেভিড লিঞ্চ, শ্যাম বেনেগাল, অরুণ রায়, রাজা মিত্র, শশী আনন্দ প্রমুখকে। সত্যজিৎ রায়ের ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ ও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র প্রদর্শন হবে।
উৎসবকে সফল করতে হলে সব ধরনের দর্শকের অংশগ্রহণ জরুরি। তাই উদ্যোক্তা ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা আশা করছেন, এ উৎসবেও ছবি দেখতে অবশ্যই ভিড় করবেন দর্শকরা।
