ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

শিল্পের দায়ভার যখন কড়ায় গণ্ডায় শিল্পী পুষিয়ে দেন, তখন মণিকাঞ্চন যোগের সৌরভে সুরভিত হয় সমগ্ৰ শিল্পটি। চলচ্চিত্র শিল্পের আঙিনায় এরকমই এক নক্ষত্র ছিলেন তুলসী চক্রবর্তী (৩ মার্চ, ১৮৯৯-১১ ডিসেম্বর, ১৯৬১)। তিনি সেই বিরল শ্রেণির অভিনয় প্রতিভা, যাঁকে বলা যায় বাংলা চলচ্চিত্রের ‘তুলসী-তলা’, যেখানে প্রতিদিনের জীবনের ধুলো, ক্লান্তি, বিদ্রূপ আর মানবিক উষ্ণতা একসঙ্গে মিলেমিশে থাকে এবং ঐশ্বরিক অনুভূতির পবিত্র মেলবন্ধন রচিত হয়।
তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় বোঝার জন্য প্রথমেই বুঝতে হয় তাঁর সময়কে। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ, এই সময়পর্বে বাংলা সমাজ এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের আর্থ-সামাজিক অভিঘাত, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার, বেকারত্ব ও নৈতিক সংকট— সব মিলিয়ে দৈনন্দিন জীবনের ভাঙন চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করে। তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় এই রূপান্তরের সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর চরিত্ররা ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা মানুষ, যাদের হাসি, সংকোচ, ব্যর্থতা ও ক্ষুদ্রতা সামাজিক কাঠামোর অন্তর্গত সত্যকে উন্মোচিত করে। তাঁর অভিনয়ের প্রধান শক্তি ছিল প্রাত্যহিকতা। তিনি অভিনয় করতেন না, অভিনয়ের প্রতীক ছিলেন। পরদায় তাঁকে দেখে মনে হত, এই মানুষটিকে আমি কোথায় যেন দেখেছি! আমার পাড়ার বা পাশের পাড়ার অধিবাসী। এই মানুষটি আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই কোথাও আছে। তিনি কাহিনির সূত্রধরের মতো রূপালী পরদাজুড়ে রাজত্ব করতেন। বাংলা সিনেমায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চরিত্রাভিনয়ের নায়কত্ব। ‘পথের পাঁচালী’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘দেবদাস’, ‘হারানো সুর’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘পরিণীতা’— এসব ছবিতে তাঁর চরিত্রগুলি আলাদা আলাদা হলেও একটি মৌলিক সুরে বাঁধা ছিল। তিনি ছিলেন কখনও ব্যর্থ আত্মীয়, নিরুপায় পিতা, বাধ্য স্বামী, কখনও সুবিধাবাদী কাকা, কখনও অসহায় চাকর, আবার কখনও হাস্যরসের মোড়কে মোড়া তীক্ষ্ণ সামাজিক ব্যঙ্গ।
তুলসী চক্রবর্তী নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের কাছে গোয়ারি নামক এক ছোট গ্রামে ১৮৯৯ সালের ৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আশুতোষ চক্রবর্তী ভারতীয় রেলের কর্মী ছিলেন। বাল্যকালে তাই তাঁকে অবিভক্ত বাংলায় নানা স্থানে ঘুরতে হয়েছে। পরে তরুণ তুলসী চক্রবর্তীকে কলকাতায় তাঁর কাকা প্রসাদ চক্রবর্তীর কাছে কিছুকাল থাকতে হয়েছিল। প্রসাদবাবু প্রখ্যাত স্টার থিয়েটারের একজন বিশিষ্ট তবলা ও হারমোনিয়াম বাদক ছিলেন। এবং তাঁর যোগাযোগে তুলসী চক্রবর্তী নিজের প্রজন্মের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের দেখার সুযোগ লাভ করেন। সেখান থেকেই তিনি অভিনয় ও সংগীতে যোগদান করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। পরবর্তী কালে বাস্তবসম্মত অভিনেতা হিসাবে তিনি পরিচিতি পান। কোনও মেক-আপ বা অতিরিক্ত আয়োজন না ব্যবহার করে সাধারণত কাঁধে একটি উপবীত ও একটি সাদা ধুতি পরিধান করতেন।
তুলসী চক্রবর্তীর অতুলনীয় চলচ্চিত্রসমূহের একটি তালিকা উল্লেখ্য: পুনর্জন্ম (১৯৩২), শ্রীগৌরাঙ্গ (১৯৩৩), দুই পুরুষ (১৯৪৫), মন্দির (১৯৪৬), প্রতিমা (১৯৪৬), বিরাজ বউ (১৯৪৬), বামুনের মেয়ে (১৯৪৯), কবি (১৯৪৯), মানদণ্ড (১৯৫০), মেজদিদি (১৯৫০), রূপকথা (১৯৫০), শেষবেশ (১৯৫০), পণ্ডিতমশাই (১৯৫১), দর্পচূর্ণ (১৯৫২), মেঘমুক্তি (১৯৫২), নবীন যাত্রা (১৯৫৩), সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), চাঁপডাঙার বৌ (১৯৫৪), যদুভট্ট (১৯৫৪), জয়দেব (১৯৫৪), পথের পাঁচালী (চলচ্চিত্র) (১৯৫৫), অপরাধী (১৯৫৫), ভালোবাসা (১৯৫৫), দুজনে (১৯৫৫), কালিন্দী (১৯৫৫), নিষিদ্ধ ফল (১৯৫৫), উপহার (১৯৫৫), একটি রাত (১৯৫৬), শ্যামলী (১৯৫৬), চন্দ্রনাথ (১৯৫৭), হরিশচন্দ্র (১৯৫৭), পৃথিবী আমারে চায় (১৯৫৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), যৌতুক (১৯৫৮), পরশ পাথর (১৯৫৮), রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮), সোনার কাঠি (১৯৫৮), গলি থেকে রাজপথ (১৯৫৯), পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট (১৯৫৯), অবাক পৃথিবী (১৯৫৯), দ্বীপ জ্বেলে যাই (১৯৫৯), মায়ামৃগ (১৯৬০), শুনো বরনারী (১৯৬০)।
তুলসী চক্রবর্তীর কমেডি কখনওই নিছক ভাঁড়ামি ছিল না। জীবনের দৈনন্দিনতায় ক্লিশে হয়ে যাওয়া মানুষকে হাস্যরসের স্নিগ্ধধারায় অবগাহন করানোয় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। তাঁর হাস্যরস ছিল ব্যথার সঙ্গে মেশানো বিদ্রূপ। তিনি হাসাতেন, কিন্তু সে হাসি দর্শককে অস্বস্তিতেও ফেলত। কারণ তার আড়ালে লুকিয়ে থাকত মধ্যবিত্তের ভণ্ডামি, সামাজিক ক্ষমতার অসমতা, অর্থনৈতিক নিঃস্বতা এবং আত্মসম্মানের অবক্ষয়। তাঁর মুখের সংলাপ, চোখের চাউনি, শরীরের ভঙ্গিমা— সব মিলিয়ে একধরনের নীরব প্রতিবাদ তৈরি করত। এ কারণেই তাঁর অভিনয় আজও অমলিন।
তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় বিশ্লেষণ করতে গেলে তাঁর শরীরী ভাষা (body language) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কণ্ঠস্বর কখনও চাপা, কখনও হঠাৎ তীক্ষ্ণ হত। চোখে থাকত চিরস্থায়ী সংশয় ও কৌতুকের মিশ্রণ। এসবই ছিল অপরিকল্পিত, জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা অন্তরের অন্তঃস্তলের গভীর উচ্চারণ। তাঁর অভিনয়ে ছিল না কোনও অতিনাটকীয়তা, উচ্চকণ্ঠ সংলাপবাজি। পাঁজরে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর অশৈল্পিক আবেদন থেকে তিনি শত যোজন দূরে অবস্থান করতেন। এর পরিবর্তে তিনি মুখাবয়বের সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে অনুচ্চারিত ভাবাবেগকে দর্শকের সামনে উন্মুক্ত করতেন। ফলে বাংলা সিনেমায় এক নতুন মাত্রার সংযোগ হয়।
বাংলা সিনেমায় বাস্তববাদী ধারার বিকাশে তুলসী চক্রবর্তীর অবদান অনস্বীকার্য। সত্যজিৎ রায় নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’-র শিক্ষক তথা মুদিখানার মালিক প্রসন্ন, ‘পরশপাথর’-এর কেরানি, নির্মল দে-র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর ছাপোষা মেসবাড়ির মালিক, বিমল রায়ের ‘নদের নিমাই’-এর অদ্বৈতাচার্য অথবা ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ ছবির এক পার্শ্বচরিত্রে তাঁর অসাধারণ অভিনয় আজও মাইলফলক হয়ে আছে। আরও বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় মনে রাখার মতো। তিনি এমন এক অভিনয়-ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রজন্মের অভিনেতাদের জন্য শিক্ষনীয় এক সিলেবাসস্বরূপ প্রতিভাত হয়ে আছে। সে সিলেবাসের বিচারধারায় অভিনয়ের অর্থ অতিরঞ্জন নয়, বরং সংযম।
‘তুলসী-তলা’ শব্দবন্ধটি এখানে কেবল নামগত নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক রূপক। তুলসী-তলা গ্রামবাংলায় দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যেমন পবিত্রতার এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে, তেমনই তুলসী চক্রবর্তী বাংলা সিনেমায় দৈনন্দিন জীবনের শিল্পিত রূপ নির্মাণ করেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, ছোট চরিত্রও বড় হয়ে উঠতে পারে এবং হাসির মাধ্যমেও ইতিহাস লেখা যায়। তিনি বাংলা সিনেমার সেই শিল্পী, যাঁকে শ্রদ্ধা করতে হয় নীরবে। তিনি কোনও মূর্তি নয়, কোনও পোস্টার-নায়ক নয়— আমাদেরই একজন। আজকের বাংলা সিনেমা যখন অতিরিক্ত চমক, উচ্চস্বরে আবেগ আর দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিনেমা আসলে জীবনেরই আর এক নাম। এ কারণেই তিনি শুধু একজন অভিনেতা নয়, বাংলা সিনেমার স্থায়ী স্মৃতি, একটি অনুপম তুলসী-তলা।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের চরিত্রাভিনয়ের ইতিহাসে চার্লি চ্যাপলিন, ভিটোরিও দে সিকা অথবা টাকেশি কিতানোর সঙ্গেই তুলসী চক্রবর্তী তুলনীয়। স্যার চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন জুনিয়র (১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯–২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৭) ছিলেন একজন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও সুরকার। হলিউড চলচ্চিত্র শিল্পের শুরুর সময় থেকে মধ্যকাল পর্যন্ত তিনি তাঁর অভিনয় ও পরিচালনা দিয়ে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করেন। চ্যাপলিনকে বড় পরদার শ্রেষ্ঠতম মূকাভিনেতা ও কৌতুক অভিনেতাদের একজন বলেও বিবেচনা করা হয়। চলচ্চিত্র শিল্প জগতে চ্যাপলিনের প্রভাব অনস্বীকার্য। তাঁর শৈশব থেকে ১৯৭৭ সালে মৃত্যুর একবছর আগে পর্যন্ত কর্মজীবনের ব্যাপ্তি প্রায় ৭৫ বছর। এই সময়ে তাঁর বর্ণাঢ্য ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে খ্যাতি ও বিতর্ক উভয়ই সঙ্গে করে চলেছিলেন। ভিটোরিও দে সিকার (১৯০১-১৯৭৪) ছিলেন একজন কিংবদন্তি ইতালীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা, যিনি ইতালীয় নব্য বাস্তববাদী (Neorealist) আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পরিচালক হিসাবেও অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর পরিচালনায় বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮) এবং শোশাইন (১৯৪৬)-সহ চারটি চলচ্চিত্র অ্যাকাডেমি পুরস্কার (অস্কার) জিতেছিল। টাকেশি কিতানো (জন্ম: ১৮ জানুয়ারি, ১৯৪৭) ছিলেন একজন প্রখ্যাত জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, কৌতুক অভিনেতা এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, যিনি ‘বিট তাকেশি’ নামেও পরিচিত। কিতানো তাঁর নিজস্ব পরিচালিত ছবি ‘ফায়ারওয়ার্কস’ (Hana-bi) এবং ‘জাটোইচি’ (Zatoichi)-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন, যা তাঁকে আকিরা কুরোসাওয়ার উত্তরসূরি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয়ও একইভাবে সাধারণ মানুষকে শিল্পের কেন্দ্রে স্থাপন করে। এই তুলনা তাঁর অভিনয়কে আন্তর্জাতিক বাস্তববাদের ধারায় স্থিত করে। তিনি কেবল একজন অভিনেতা নয়, একটি অভিনয়-দর্শন। তাঁর অভিনয় আমাদের শেখায়— সংযমই শক্তি, নীরবতাই ভাষা, আর সাধারণ মানুষই শিল্পের চিরন্তন নায়ক। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে তিনি তাই এক স্থায়ী তুলসী-তলা, যেখানে আজও দর্শক মাথা নত করে দাঁড়ায়।
