ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
সিনিয়র প্রফেসর, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

‘জীবন বড় হওয়া চাই, লম্বা নয়’— ‘আনন্দ’ সিনেমার এই সংলাপটি শুধু একটি সিনেমাটিক ডায়লগ নয়, বরং এক গভীর দার্শনিকবোধপ্রসূত উচ্চারণ, যা জীবনের প্রকৃত অর্থকে পুনর্নির্মাণ করে। ‘বড়’ হওয়া মানে এখানে দৈহিক বা কালগত নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক পরিসরের প্রসার। জীবনের দৈর্ঘ্য যদি শুধু শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা এক নিস্তেজ অস্তিত্বমাত্র। কিন্তু জীবন যখন অনুভূতির, সৃষ্টির, আত্মপ্রকাশের এবং আনন্দবোধের বিস্তার ঘটায়, তখনই তা প্রকৃত অর্থে বড় হয়ে ওঠে।
ভারতীয় দর্শনে, বিশেষত উপনিষদ ও গীতার ভাবনায় জীবনকে কখনও কেবল বেঁচে থাকার প্রক্রিয়া বলা হয়নি। এখানে জীবন মানে আত্মসন্ধান, কর্ম, আনন্দ ও মুক্তি, যার পরিণতি আত্মবিকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ‘আনন্দ’ সিনেমার নায়ক আনন্দের উক্তি যেন আধুনিক ভাষায় সেই চিরন্তন বাণীকেই পুনরুচ্চারণ করে, ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ’।
হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘আনন্দ’ (১৯৭১) চলচ্চিত্রটি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অমর দলিল। রাজেশ খান্না অভিনীত আনন্দ চরিত্র ক্যানসার রোগে আক্রান্ত এক মরণাপন্ন ব্যক্তি, যার শরীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু মন ক্রমাগত জীবনের দিকেই প্রসারিত হয়। এই বিপরীতমুখী গতিই চলচ্চিত্রটির দর্শন। আনন্দ জানে, সে মরছে, তবু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। মানুষকে হাসায়, আশাবাদ শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়। ‘জীবন বড় হওয়া চাই, লম্বা নয়’, চলচ্চিত্রটির এই কেন্দ্রীয় সংলাপ আসলে অস্তিত্ববাদী বোধের প্রতীক। জীবনের অর্থ সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, বরং মুহূর্তের গুণে নিহিত। ‘আনন্দ’ যেন আলবার্ট ক্যামুর ‘The Myth of Sisyphus’–এর নায়ক সিসিফাসের মতো, যিনি জানেন, তাঁর পরিশ্রম বৃথা, তবু তিনি আনন্দে সেই পাথরটিকে ঠেলে নিয়ে চলেন। আনন্দও জানে, তার মৃত্যু অনিবার্য, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই জীবনের অপরিসীম আনন্দ আবিষ্কার করে।
এই চলচ্চিত্রে একধরনের ‘অন্তিম উচ্ছ্বাস’ (final exuberance) আছে, যা রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যুঞ্জয়’ ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে লিখেছিলেন, ‘মৃত্যু তোমার হরষে আমারে মিশাও আলোয় আলোকময় করে।’ আনন্দও মৃত্যুকে এড়ায় না, বরং তাকে জীবনের উৎসবে রূপান্তরিত করে।
এই চলচ্চিত্রের সংলাপে প্রকাশিত দার্শনিক ভাবটি মূলত তিন স্তরে কাজ করে—
১) জীবনের অস্থায়িত্ব স্বীকার: মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, তাই তাকে ভয় নয়, আপন করে নেওয়া প্রয়োজন।
২) মুহূর্তের গৌরব: প্রতিটি দিন, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি সম্পর্ক জীবনের গভীরতা বৃদ্ধি করে।
৩) আনন্দের স্বরূপ: আনন্দ মানে দুঃখের অনুপস্থিতি নয়, বরং দুঃখের মধ্যেও জীবনের সুর খুঁজে পাওয়া।
ভারতীয় দর্শনে জীবনকে কখনও ‘শুধু থাকা’র প্রক্রিয়া হিসাবে দেখা হয়নি। উপনিষদ, বেদান্ত, চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন, সব দর্শনেই জীবনের মানে নিয়ে গভীর অন্বেষা হয়েছে। চার্বাক দর্শন পৃথিবী থেকে সবটুকু আনন্দ সংগ্ৰহের জন্য নিদান দেয়, ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত’। অর্থাৎ যতদিন বাঁচো, সুখে বাঁচো। ঋণ করেও ঘি খাও। মূল দর্শনটি হল, জীবন উপভোগের জন্য। যদিও এই বক্তব্য প্রায়ই ভোগবাদী বলে অভিযুক্ত হয়েছে, তবু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য জীবনকে অর্থবহভাবে উপভোগ করা, কেবল অস্তিত্ব টেনে নেওয়া নয়। অন্যদিকে উপনিষদীয় ভাবনায় বলা হয়েছে, ‘আত্মানং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো।
জীবনের মানে হল আত্মসন্ধান, নিজের গভীরে প্রবেশ করা। এই আত্মবিকাশই ‘বড়’ হওয়ার প্রতীক। ভগবদ্গীতা জীবনকে কর্মমুখী করেছে। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৭তম শ্লোকে বলা হয়েছে, ‘কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।’ অর্থাৎ কর্মেই তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কর্মফলের ওপর তোমার কোনও অধিকার নেই। মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল, জীবনের দৈর্ঘ্য ঈশ্বরের হাতে, কিন্তু তার গভীরতা মানুষের হাতে। জীবন বড় হয় কর্ম, প্রেম, জ্ঞান ও আনন্দে। মৃত্যু মানে সমাপ্তি নয়, বরং এক রূপান্তর, যেখানে জীবনের উজ্জ্বলতা চিরস্থায়ী হয়।
জীবনের পরিমাণ ও মান, এই দুইয়ের মধ্যে মানুষের দোলাচল বহু প্রাচীন। মানুষ দীর্ঘজীবন চেয়েছে। অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা মানবসভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু সময়ের পরিসরে টিকে থাকা মানেই কি বেঁচে থাকা? এ প্রশ্নই আসলে ‘জীবন বড় হওয়া চাই, লম্বা নয়’-এর অন্তর্নিহিত বোধ।
ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে জীবনকে কখনও ‘কাল’ দ্বারা পরিমাপ করা হয়নি, বরং ‘তত্ত্ব’ দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। যে জীবন তার ক্ষুদ্র সীমানার মধ্যেও বৃহৎ সত্য উপলব্ধি করে, সেটিই ‘বড়’। দীর্ঘজীবন কখনও কখনও নিস্তেজতার প্রতীক হতে পারে, যদি তা সৃষ্টিহীন, লক্ষ্যহীন ও আনন্দহীন হয়। অন্যদিকে স্বল্পজীবনও উজ্জ্বল হতে পারে, যদি তাতে মানবিকতা, সৃষ্টি ও ত্যাগের দীপ্তি থাকে।
শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ প্রশ্ন তোলে, ‘To be, or not to be?’ অর্থাৎ অস্তিত্বের মানেই কি বেঁচে থাকা? গ্যোটের ‘ফাউস্ট’ আত্মার মুক্তির জন্য জ্ঞানের অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়। সে চায় ‘বড়’ জীবন, শুধু দীর্ঘ নয়। অ্যালবার্ট ক্যামু, ফ্রান্জ কাফকা বা ভার্জিনিয়া উলফের রচনাতেও জীবনের গভীরতা ও অর্থহীনতার দ্বন্দ্ব বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। এসব সাহিত্যকর্মে একটি সাধারণ সত্য উদ্ভাসিত— জীবনের মান নির্ধারিত হয় তার আবেগ, সৃষ্টিশক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা দ্বারা, সময়ের পরিমাণে নয়। মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এই বোধ নতুন নয়। ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কল, যিনি নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, তিনি তাঁর Man’s Search for Meaning গ্রন্থে লিখেছেন, জীবনের একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকলে মানুষ যে কোনও কষ্ট সহ্য করতে পারে।’ এই উদ্দেশ্য বা অর্থই জীবনের গভীরতা। অন্যদিকে আব্রাহাম মাসলো তাঁর ‘Hierarchy of Needs’-এ সর্বোচ্চ স্তরে রেখেছেন ‘Self-actualization’ বা আত্ম-উপলব্ধিকে। অর্থাৎ জীবন বড় তখনই, যখন মানুষ নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে। ফ্রয়েড জীবনের চালিকাশক্তি হিসাবে দেখেছিলেন libido বা প্রাণশক্তি, যা দমে গেলে জীবন নিস্তেজ হয়। এই প্রাণশক্তিই আনন্দ চরিত্রের ভিতরে অটুট ছিল। মৃত্যুর মুখেও তার ‘libido for life’ নিঃশেষ হয়নি।
আজকের সভ্যতা জীবনের মানকে পরিমাপ করছে আয়ু, সম্পদ ও খ্যাতির পরিসরে। মানুষ ‘কতদিন বাঁচবে’— এ প্রশ্নে মগ্ন। কিন্তু ‘কীভাবে বাঁচবে’— সে প্রশ্নে উদাসীন। চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে দীর্ঘজীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কিন্তু জীবনের মৌল আত্মা হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজমাধ্যমের যুগে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রদর্শন করছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ শূন্যতা বাড়ছে। জীবন যেন হয়ে উঠেছে দৃশ্যের পর দৃশ্য, যেখানে স্থায়ী কোনও আনন্দ নেই।
রবীন্দ্রনাথ এই অবস্থাকেই আগাম অনুভব করেছিলেন— ‘যন্ত্রের দাস হয়ে মানুষ হারায় আপন প্রাণ।’ এই যান্ত্রিক জীবনে ‘লম্বা জীবন’ আসলে পুনরাবৃত্ত একঘেয়েমি, যেখানে আনন্দের স্ফুলিঙ্গ নিভে যায়। অন্যদিকে ‘বড় জীবন’ মানে সচেতনভাবে বাঁচা— প্রতিদিনের মধ্যে সৌন্দর্য ও অর্থ খুঁজে নেওয়া।
বাংলা সাহিত্যজগতে ‘বড় জীবন’-এর ভাবনা নানা রূপে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’ নাটকে যেমন স্থবিরতার বিরুদ্ধে জীবনের উন্মুক্ত আহ্বান, তেমনই মৃণালিনী দেবীর চিঠিতে (স্ত্রীর প্রতি) কবির আত্মপ্রকাশে দেখা যায় জীবনের তীব্র প্রেম ও কর্তব্যবোধ। শরৎচন্দ্রের চরিত্ররা, বিশেষত ‘শ্রীকান্ত’ বা ‘দেবদাস’ যত ভঙ্গুর, তাঁদের আবেগ ও মানবিকতার গভীরতা তত জীবনের আসল শক্তিকে প্রতিফলিত করে। এই চরিত্রগুলি আমাদের শেখায়, জীবন কখনও নিখুঁত নয়, কিন্তু অসম্পূর্ণতাই তার সৌন্দর্য। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে জীবন বৃহৎ হয় দেশপ্রেমের মাধ্যমে— ব্যক্তিগত সত্তার ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হওয়াই ‘বড়’ জীবন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, জীবনে ‘বড়’ হওয়া মানে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এক নৈতিক ও আত্মিক উত্থান।
আনন্দ সিনেমার সেই সংলাপ আজও আমাদের মনে প্রশ্ন তোলে, আমরা কি সত্যিই বেঁচে আছি, নাকি কেবল টিকে আছি? মানুষের জীবন যখন মৃত্যুভয়ের ছায়ায় আচ্ছন্ন, তখন এই সংলাপ আমাদের শেখায়, জীবনের মান নির্ধারিত হয় প্রাণবন্ততার দ্বারা, কালগণনা দ্বারা নয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘যতক্ষণ আমি আছি, ততক্ষণই আমি অসীমের মধ্যে আনন্দ খুঁজে পাব।’ এ বাণীই যেন আনন্দের মুখে উচ্চারিত সেই সংলাপের মূল দর্শন। অতএব জীবন বড় হওয়া মানে ভালোবাসা, সৃজন, আত্মপ্রকাশ, ত্যাগ ও সৌন্দর্যের অনন্ত অন্বেষা। আর লম্বা জীবন মানে সময়গত প্রলম্বন, যা আনন্দহীন হলে অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই মানুষের কর্তব্য দৈর্ঘ্যের লোভ নয়, বরং গভীরতার সাধনা। প্রতিটি দিন যদি পূর্ণ হয় জীবনের অর্থবোধে, প্রেমে, চেতনায়, তাহলেই জীবন বড় হবে, মানুষের স্মৃতির ক্যানভাসে দীর্ঘকালীন অস্তিত্বের ছাপ রেখে ভাস্বর হয়ে থাকবে।
