সুদীপনারায়ণ ঘোষ
প্রাক্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর

কবিতা সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা রয়েছে যে, কয়েকটি শব্দ পরপর পদ্যের আকারে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিবেশন করলেই সেটা কবিতা। না, পদ্য আর কবিতা এক নয়। আর একটা ভুল ধারণা আছে, সেটা হল, সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনও বাস্তব বা অর্ধবাস্তব অন্যায়, অপরাধ, বৈষম্য, নৃশংসতার বিরুদ্ধে কমবেশি রাগারাগি, চেঁচামেচি, উপহাস, তির্যক ব্যঙ্গ করলে সেটা হয়ে যায় খুব ভালো কবিতা। একেবারেই নয়। পদ্যকে কবিতায় উত্তীর্ণ হতে গেলে কতকগুলি শর্ত রয়েছে।
কবিতা কোনও স্টেটমেন্ট হলে হবে না। কবিতা কখনও সম্পূর্ণ বোধগম্য হবে না। যে কবিতার পুরো অর্থ বোঝা যায়, সেটা ভালো কবিতা নয়। এর ইঙ্গিত এই নয় যে, আবোলতাবোল লিখলেই কবিতা হবে। না। ভালো কবিতা যতটা বলে বোঝানো যায়, তার চেয়ে অনুভব করা যায় বেশি। ভালো ছোট গল্পও তাই। বলা হয়, একটি ভালো কবিতা বোঝার আগেই ভিতরে সঞ্চালিত হয়। একটি ভালো কবিতা হিরের মতো, যেদিকে ঘোরাবেন, সেদিকে আলো ফেলবে। একই শব্দ বা বাক্যের অসংখ্য দ্যোতনা থাকে, অসীম সম্ভাবনার দরজায় পৌঁছে দেয়, জীবন যে একমুখী নয়, বহুস্তরীভূত, বহুমাত্রিক, বহুকৌণিক, এটা ভালো কবিতা দেখিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের এমন লেখা রয়েছে, যেমন, ‘এস ব্রাহ্মণ’-সহ কয়েকটি কবিতা নয়। ভালো কবিতা তো দূরের কথা। এগুলি ব্যবহার করা হয়, কারণ মানুষের মধ্যে অদ্ভুত সাইকোলজি কাজ করে। একটা দরকারি কথা, ভালো কথা সাধারণ মানুষ বললে লোক বিশ্বাস করে না। তখন ওইসব বিখ্যাত মানুষের উপদেশ উদ্ধৃত করতে হয় বা মানুষ করে, কারণ যাকে বলে, সে আর কিছু বলতে পারে না। এও অদ্ভুত! আমাদের বিশ্বাস করা উচিত যুক্তির ভিত্তিতে, কে বলছে, তার ভিত্তিতে নয়। অথচ সাধারণ মানুষের কথায় যতই যুক্তি থাক, লোক পাত্তা দেবে না। শঙ্খ ঘোষ বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় বললে মানবে, আর যদি নাও মানে, অন্তত সরাসরি ফেলে দিতে পারবে না। আর কবিতার আকারে বললে বলাটা সহজ হয় লোকের পক্ষে।
আবু সৈয়দ আইয়ুব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরাগী এবং শ্রদ্ধাশীল তাঁর প্রতি। তিনি লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাটি কোনও ভালো কবিতা তো নয়ই, বরং অকবিতা।
সামাজিক পরিবর্তন, বৈষম্য, অন্যায়, শোষণ, পীড়নের জন্য যুক্তিসমৃদ্ধ গদ্য দরকার। স্টেটমেন্ট, মতামত, স্লোগান, চিৎকার, হুল্লোড়, ন্যাকা প্রেম কবিতা নয়। ‘দেব খোঁপায় তারার ফুল’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’, ‘আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ’, ‘আমার দুর্গা তোমার দুর্গা’ কবিতা নয়। জীবনানন্দ দাশ এজন্য বলেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘এত কবি কেন?’
বনলতা সেন কাব্য মানুষের অজানা অতীত থেকে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে অভিযাত্রা। তার ব্যাপক সম্ভাবনা, তবু মানুষের তা অনায়ত্ত। আকাঙ্ক্ষার চির অচরিতার্থতা হয়তো-বা তৃপ্তির মূল। এই অতৃপ্তির মধ্যে হয়তো কেউ কখনও মুহূর্তের জন্য শান্তি দেয়। তার প্রেম নাম দিয়ে সংক্ষেপে ভাবার্থ প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে তা মানব-মানবীর প্রচলিত প্রেম নয়। লৌকিক প্রেম সে সম্ভাবনার এক দূরস্থিত ছায়ামাত্র। সাধারণ মানুষকে এসব বোঝানো দুষ্কর। কবিতা শুদ্ধ অনুভূতি, আবেশ, আবেগের।

