Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ধর্ম মানুষের বিকাশ ঘটায়, বিভেদ নয়

ইদের দিন একটি নিমন্ত্রণ না এলে, একটু সিমুই না খেতে পারলে আমার মন যেমন কাঁদে, একইভাবে আমি জানি, আমার পরিচিত অনেক মুসলমান বন্ধু আছে, যারা দুর্গাপুজোয় আমার চেয়ে বেশি ঠাকুর দেখে, নতুন পোশাক পরে, আনন্দ করে। কোথায় বিভেদ! যে কোনও বিভেদই দুঃখজনক। আমরা সকলে মানুষ, এই একটা পরিচয় কি যথেষ্ট নয়?

Share Links:

ড. শর্মিষ্ঠা ঘোষ
অধ্যাপিকা, ফকিরচাঁদ কলেজ

ধর্ম কী? কাকে ধর্ম বলে? একটি কলমকে দেখিয়ে বলতে পারি,  ‍‘এটা একটা কলম।’ সেরূপ কোনও বিষয়কে দেখিয়ে কি বলতে পারি যে, ‘এটা ধর্ম’? না, বলতে পারি না। ধর্মের লক্ষণ বিষয়গতভাবে দেখানো যাবে না, ব্যক্তিগত রূপে দেখাতে হবে। কারণ ধর্ম ব্যক্তির উপলব্ধি, মানস প্রত্যক্ষের বিষয়।

আজ ধর্ম নিয়ে এত সংঘর্ষ চলেছে। এক্ষেত্রে একটাই প্রশ্ন মনের মধ্যে উঠছে বারবার, ধর্ম তো বিকাশ ঘটায়, বিভেদ নয়। আমরা কি সত্যি ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ অনুধাবন করতে পেরেছি? আসলে যখন কোনও বাহ্যবিজ্ঞানের কথা আসে, যেমন, ভৌত বা রসায়ন বিজ্ঞান, তখন আমরা স্বীকার করে নিই যে, পড়াশোনা, চর্চা ছাড়া এ বিষয়ের কোনও প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের ধারণা, ধর্ম কী, তা সবার জানা বিষয়। একটি শিশুও জানে। তাই এ বিষয় জানার জন্য আলাদা করে পড়াশোনা, চর্চা, সাধনা করার দরকার হয় না। কিন্তু যে কোনও বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করতে হলে চর্চা, সাধনার প্রয়োজন আছে।

ধর্ম সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করতে পারলে সমাজের চিত্র সত্যিই অন্যরকম হবে। সকলকে বুঝতে হবে যে, সমাজে ধর্ম প্রগতির অন্তরায় নয়, বরং যথার্থ তার অনুশীলন দ্বারা সমাজের উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর ‍‘সামাজিক’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‍‘মনুষ্যশিশুর পক্ষে পিতা-মাতাও যাহা, মনুষ্যসমাজের পক্ষে ধর্ম এবং ভাষাও তাহা।’ অর্থাৎ ধর্ম ব্যক্তি ও সমাজকে ধারণ করে। ধর্ম কোনও অলৌকিক, কাল্পনিক বিষয় নয়। যথার্থ ধর্ম সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, ‍‘কি ব্রহ্মচারী, কি গৃহী, কি বাণপ্রস্থী, কি সন্ন্যাসী সকলকেই শুধু পারলৌকিক স্বার্থচিন্তা না করিয়া লোকশিক্ষা ও সমাজের হিতসাধনে তৎপর হইতে হইবে।… জ্ঞান এবং ভক্তি, ইহারা পিতা ও মাতার স্থানীয়। উহাদিগের পরস্পর বিবাদ-বিসম্বাদ নাই। ভক্তি না হইলে কার্য্যে প্রবৃত্তি হয় না, কার্য্য না হইলে প্রকৃত শিক্ষা হয় না; শিক্ষা না হইলে জ্ঞান জন্মে না এবং জ্ঞান ব্যতিরেকে মুক্তি হয় না।’

সুতরাং পারলৌকিক চিন্তা ধর্মের মূল কথা নয়। ধর্মের মূল কথা, নৈতিক বিকাশ, পরার্থে, সমাজের হিতসাধনে কিছু করা। ‘ভক্তি না হইলে কার্য্যে প্রবৃত্তি হয় না’, অর্থাৎ ভক্তি মানে আন্তরিক ইচ্ছা, ভালোবাসা, যেগুলি না থাকলে কোনও কাজ হয় না। জোর করে কিছু কাজ করানো গেলেও তা যথার্থ শিক্ষা হয় না। একইভাবে কাজ করলেই শিক্ষালাভ হয়। পুঁথিগত শিক্ষা নয়, প্রকৃত শিক্ষালাভ হয়। এ শিক্ষা থেকেই আসে জ্ঞান। আর প্রকৃত জ্ঞান হলেই সব পাওয়া হল, যাকে বলা হয় মুক্তি।

ভূদেব মুখোপাধ্যায়কে অনেকেই রক্ষণশীল বলে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, যে ব্যক্তির নিজের ওপর বিশ্বাস থাকে, তাঁর অন্যের ওপরও বিশ্বাস থাকে। যে নিজেকে ভালোবাসে, সে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকেও ভালোবাসতে পারে। একইভাবে নিজ নিজ ধর্মকে যে ব্যক্তি শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে, সে ব্যক্তি অন্যের ধর্মকেও শ্রদ্ধা, সম্মান করে থাকে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও তাই বলা যায়। তিনি নিজ ধর্মকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছেন, তবে অন্য ধর্মকে অশ্রদ্ধা করে নয়। মুসলমান ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‍‘মুসলমানদের ধর্ম্মে সাম্যবাদের একটি অতি মনোহর শক্তি আছে। মুসলমান ধর্ম্ম সেই সাম্যবাদের বলে বলীয়ান এবং পৃথিবীর মধ্যে মুসলমানই প্রকৃত প্রস্তাবে সাম্যবাদী। ফলত মুসলমান সমাজের মূল প্রকৃতি সমতা।’

ধর্ম কোনও বাহ্যিক আড়ম্বর, ভেদাভেদ করার মতো সংকীর্ণ বিষয় নয়। ধর্ম ধারক, যা পশু থেকে মনুষ্যে উত্তীর্ণ করে, আবার মানুষকে দেবত্বে উত্তীর্ণ করে। ধর্ম একটি আধার, একটি শক্তি, একটি আশ্রয়, যা মানুষকে সৎ পথে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, ‍‘খ্রিস্টান, ব্রহ্মজ্ঞানী, হিন্দু, মুসলমান, সকলেই বলে, আমার ধর্ম ঠিক। কিন্তু মা, কারও ঘড়ি তো ঠিক চলছে না। তোমাকে ঠিক কে বুঝতে পারবে? তবে ব্যাকুল হয়ে ডাকলে, তোমার কৃপা হলে সব পথ দিয়ে তোমার কাছে পৌঁছনো যায়।’

যে কোনও ধর্ম যথার্থভাবে পালিত হলে মন শুদ্ধ হয়, মনের শক্তি বা আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটে এবং তাহলেই সব পাওয়া সম্ভব হয়। আত্মা পরমেশ্বরের অংশ। তাই মনের শক্তি বা আত্মশক্তি, সবই পরমেশ্বরের শক্তি, যা অসীম। এ কারণেই স্বামীজি বলেছেন, ‍‘মানুষের ভিতরে যে দেবত্ব আগে থেকেই আছে, তার প্রকাশসাধনের নাম ধর্ম।’ মূল বিষয় হল, ধর্ম কী, তা অনুভব করতে পারলে দেখা যাবে, ধর্ম ব্যক্তির বিকাশ ঘটায়, বিভেদ নয়।

ইদের দিন একটি নিমন্ত্রণ না এলে, একটু সিমুই না খেতে পারলে আমার মন যেমন কাঁদে, একইভাবে আমি জানি, আমার পরিচিত অনেক মুসলমান বন্ধু আছে, যারা দুর্গাপুজোয় আমার চেয়ে বেশি ঠাকুর দেখে, নতুন পোশাক পরে, আনন্দ করে। কোথায় বিভেদ! যে কোনও বিভেদই দুঃখজনক। আমরা সকলে মানুষ, এই একটা পরিচয় কি যথেষ্ট নয়? শুধু বুঝতে হবে, এক একজন মানুষের এক একরকমের পথে চলা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে সত্যিই কোনও বিভেদ নেই। বিভেদ তৈরি করে কিছু দুষ্ট লোক নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। ধর্মকে অবলম্বন করে বিকশিত হলেই তা নিজের নিজের কাছে স্পষ্ট ধরা পড়বে। তবে সমাজের দুষ্ট লোকগুলির প্রতিও হিংসা নয়, তাদের শুধু উপেক্ষা (ignore) করতে হবে। একবার, দু’বার, তিনবার উপেক্ষা করলেই তাদের মনোবল চূর্ণ হয়ে যাবে। পরের বার আর ধর্ম ধর্ম করে বিভেদ তৈরি করার চেষ্টা করবে না। কারণ কোনও সুফল তারা পাবে না। অন্যদিকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ নিজ নিজ ধর্মে বলীয়ান হয়ে, দৃঢ় মনোবল সহকারে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির মনোভাব সম্পন্ন হয়ে ভারতকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেব এবং সকলের হৃদয়ে থাকবে একটি কথা, ‍‘ধর্ম মানুষের বিকাশ ঘটায়, বিভেদ নয়।’

1 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए