Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব

শাসক যখন প্রায়শই প্রজাদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতিসাধন, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন ব্রাহ্মণের স্বভাববিশিষ্ট সুশীল সমাজ রামই থেকে যাচ্ছে, পরশুরাম কোথায় হতে পারছে?

Share Links:

রাজকুমার মোদক
অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

সংস্কৃত সাহিত্যে কালিদাসের পরে যে সকল কবিকে আমরা আমাদের হৃদমাঝারে  স্থান দিয়েছি, তাঁদের মধ্যে দ্বাদশ শতকের অন্যতম কবি জয়দেবের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর সেরা সৃষ্টি ‘গীতগোবিন্দম’ নামক ভক্তিমূলক গীতিকাব্য সংস্কৃত সাহিত্যে অন্যতম মাত্রা এনে দেয়। এ কাব্যের মাধ্যমে তিনি কৃষ্ণ ও রাধার প্রেমের মাধুর্যকে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা শুধু সংস্কৃত সাহিত্যে নয়, বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এ ভক্তিমূলক গীতিকাব্যের মধ্য দিয়ে পৌরাণিক গাথার প্রেক্ষাপটে আধুনিক বিজ্ঞানের ধ্যানধারণার প্রতিফলন যেমন দেখা গিয়েছে, তেমনই এক নজিরবিহীন আধ্যাত্মিক দর্শনের প্রেক্ষিতে তিনি খুব সুচারুভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানের পথও দেখিয়েছেন।

এ প্রবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্যই হল ‘গীতগোবিন্দম’-এর শুরুতে ‘দশাবতারম’ স্তোত্রের মাধ্যমে জয়দেব বিষ্ণুর যে দশটি অবতারের পরিচয় দিয়েছেন, সেটির প্রয়োজনমাফিক দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, আর বিষ্ণুর এ অবতার তত্ত্বকে বাস্তবের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার পটভূমিতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তারই সুলুক সন্ধান করা। যেহেতু আগেই লিখেছি যে, কবি জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’ বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, সেহেতু শুরুটা আমরা শরৎচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নগেন্দ্রনাথ ঘোষ কৃত ‘গীতগোবিন্দম’-এর বঙ্গানুবাদে বিষ্ণুর ‘দশাবতারম’ স্তোত্রের পরিচয় দিয়ে করতেই পারি— 
বেদ উদ্ধারিলে তুমি মীন রূপ ধরি,
কূর্ম রূপে বহিলে মহীরে পৃষ্ঠে করি,
বরাহ রূপেতে দন্ত ধরায় রাখিলে,
নরহরি রূপ ধরি দৈত্যে বিদারিলে,
বলিরে ছলিরে ধরি বামন মূরতি,
ক্ষাত্রক্ষয় করিলে হে হয়ে ভৃগুপতি,
রাম রূপে দশাননে বিনাশ করিলে,
হলধর রূপে করে হল ধরেছিলে,
জীবে দয়া দেখাইলে বুদ্ধের আকারে,
বিনাশিলে ম্লেচ্ছগণে কল্কি অবতারে,
সাধিলে এ দশ কাজ দশ রূপ ধরি,
হরি হে, চরণে তব প্রণিপাত করি।

এবার যে বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার, সেটি হল, বিষ্ণুর এই দশাবতার তত্ত্বের  মধ্যে অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিই ডারউইনের অভিব্যক্তি তত্ত্বের ছোঁয়া লক্ষ করে থাকেন, যদিও জয়দেবের মূল উদ্দেশ্য সেটাই ছিল কি না, সে কথা বলা বেশ কঠিন। কেন কঠিন, তা পরে আলোচনা করা হবে। তবে ভুললে চলবে না যে, বিষ্ণুর অবতার তত্ত্ব এ কথাই বলতে চায় যে, সময়ের নিরিখে সবকিছুই পরিবর্তনশীল। অদ্বৈত বেদান্তীদের মতো এখানে ব্রহ্মের নিত্যতার ওপর কিংবা চার্বাকদের মতো উচ্ছেদবাদের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে এ তত্ত্ব যেন বৌদ্ধ মধ্যমপন্থাকেই সমর্থন করেছে। পাশ্চাত্যের ভাষায় being কিংবা non-being, কোনওটাই সঠিক নয়, যেটি সঠিক, সেটি হল becoming । পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করা দরকার যে, বিষ্ণুর এই দশাবতার হল একটি চক্র। এ যেন কপিল মুনির সাংখ্য দর্শনের সৃষ্টিতত্ত্বের ভিন্ন রূপ। পুরুষ — প্রকৃতি — অনুলোম পরিণাম — জগৎ সৃষ্টি — প্রতিলোম পরিণাম — প্রলয়। এরপর আবার সৃষ্টি। এ যেন অনন্ত চক্র।

পুরাণের সৃষ্টিতত্ত্ব ব্রহ্মাণ্ডবাদ অনুযায়ী, সারা পৃথিবী ছিল জলমগ্ন। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে বলা হয়েছে, ‘তম অসিত তমসা গূঢ়ম অগ্রে অপ্রকেতম্ সলিলং সর্বং আ ইদম্।’ অর্থাৎ শুরুতে অন্ধকার অন্ধকার দ্বারা ঢাকা ছিল, এই (জগৎ) ছিল অভেদ্য জল, সে শূন্য ঐক্যবদ্ধ (জগৎ), যা কেবল শূন্য দ্বারা ঢাকা ছিল, তা তপস্যার শক্তি দ্বারা উৎপন্ন হয়েছিল।

বিষ্ণুর অবতার তত্ত্বের ক্রমিক দিক থেকে এক্কেবারে প্রথম হল বিষ্ণুর মৎস্যাবতার, যিনি কিনা বেদ তথা জ্ঞানকে সলিলসমাধি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। জ্ঞান ছাড়া মানুষের জয়যাত্রা অচল। অ্যারিস্টটল তাই wisdom বা প্রজ্ঞাকে সদ্গুণগুলির মধ্যে প্রথম স্থান দিয়েছেন।

অন্য পোস্ট: প্রতিবাদ চেতনা কি ঘুমিয়ে পড়েছে

সারা পৃথিবী যে জলমগ্ন, এ চিন্তাভাবনা কতটা বৈজ্ঞানিক, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি, যখন বৈজ্ঞানিকরা বলেন, পৃথিবীর তিন ভাগ জল ও এক ভাগ স্থল তো বটেই, উত্তর ও দক্ষিণ, এই দুই মেরুপ্রদেশের বরফ গলে গেলে সমগ্র পৃথিবী আট ফুট জলের নীচে চলে যাবে। তাছাড়া এই অবতারের মাধ্যমে আমরা এটাই ইঙ্গিত পাই যে, প্রাণের সৃষ্টি জল থেকেই। পাশাপাশি ক্রমানুযায়ী বিষ্ণুর কূর্মাবতার, বরাহাবতার, নৃসিংহাবতার প্রভৃতি জীবের ক্রম-অভিব্যাক্তির পরিচায়ক বলে অনেকে গণ্য করে থাকেন। এ কারণে ডারউইনের জৈব-অভিব্যাক্তিবাদের ছোঁয়া যে  বিষ্ণুর অবতার তত্ত্বগুলির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে, সে বিষয়ে জোরাল সমর্থন পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণের অন্যতম অগ্রদূত প্রখ্যাত বাগ্মী কেশবচন্দ্র সেনের বক্তব্যে, রাশিয়ান বংশোদ্ভূত খ্যাতনামা রহস্যবাদী লেখিকা ম্যাডাম ব্লাভাস্টিকের রচনায়, ভারতীয় চরমপন্থী বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক ঋষি অরবিন্দের সৃষ্টিতে, স্বনামধন্য বেদ বিশেষজ্ঞ নারায়ণভবন রাওয়ের যুক্তিতে, ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি ম্যাকেঞ্জি ব্রাউনের চিন্তাভাবনায় এবং অন্যান্য চিন্তাবিদের মধ্যে।

তবে এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার, সেটি হল, বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব আসলে একটি সম্পূর্ণ চক্রের বার্তাবহ। আর এটা প্রদর্শনই জয়দেবের মূল উদ্দেশ্য। আর এটিকে কখনওই শুধু কয়েকটির প্রেক্ষিতে বোঝা ঠিক হবে না। একে অন্যের সঙ্গে প্রতিটি অবতারই সম্পর্কযুক্ত। এখানে ফুটে উঠেছে ভারতীয় জীবন দর্শনের সুগভীর জিজ্ঞাসা, যার জন্য নচিকেতা যমরাজার সমস্ত প্রলোভন বিসর্জন দিয়েছিলেন। সেটি পাওয়ার জন্য ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের অন্যতর স্ত্রী মৈত্রেয়ী উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। বৈদান্তিকরা সেটিকে বলেছেন, ‘…it is the self which is the only reality, and all else is māyā.’ শেতেশ্বতর উপনিষদে মানুষকে বলা হয়েছে, অমৃতস্য পুত্র বা অমরত্বের সন্তান। প্রতিটি মানুষই অনন্ত শক্তির অধিকারী। সে নিজেই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম। অবিদ্যার উন্মোচনের মাধ্যমেই স্বীয় ব্রহ্মোপলব্ধি সম্ভব। এর জন্য চাই নিরন্তর সাধনা। এই দশাবতার আসলে অজ্ঞানতার নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসে দেবত্বে উত্তরণেরই সোপান, যাকে অ্যারিস্টটল সদ্গুণগুলির ক্রমবিকাশ সাধনের মাধ্যমে being থেকে wellbeing-এ উত্তরণ বলেছেন। রামকৃষ্ণ এটাকেই বলতেন, মন আর মুখ এক হওয়া, তাঁরই প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, মানুষ হওয়া, আর অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের ভাষায়, এটিই হল Authentic Existence.

বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব্ পৌরাণিক হলেও আধ্যাত্মিকভাবে যে পুষ্ট, এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। পৌরাণিক আর বৈজ্ঞানিক, এদের মধ্যে যেটি বৈজ্ঞানিক, সেটিকে আমাদের বুদ্ধি অগ্রাধিকার দিলেও বরাবরই মানুষ বিশ্বাসের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছে। আসলে মানুষ নিজেকে কখনওই অবজেক্টিভ রিয়েলিটির কারাগারে আবদ্ধ রাখতে চায় না। তার আছে ভাষা। ভাষার সাহায্যে সে যেমন অপরাপর ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে, তেমনই সে নিজের সঙ্গে নিজেও কথা  বলে। তার রয়েছে সাবজেক্টিভ রিয়েলিটি। সে দিক থেকে সে স্বাধীন। যাদের আমরা গাথা বলে থাকি, সেখানে অবজেক্টিভ রিয়েলিটির ছোঁয়া নিতান্তই কম। তাহলেও মানুষ কিন্তু গাথাকে অবলম্বন করেই বাঁচতে চায়। কেননা গাথার মধ্যে সে সাবজেক্টিভ রিয়েলিটি দ্বারা পুষ্ট অপার স্বাধীনতাকে ভোগ করতে চায়। অতীতে যেটি গাথা ছিল, বর্তমানে সেটিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রপাগান্ডা বা ক্রুড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভাষায়, ন্যারেটিভ, যেখানে রয়েছে অবজেক্টিভ রিয়েলিটির ছিটেফোঁটা। তাই তো দেখা যায় যে, E=mc2 সূত্রটি থেকে fusion বা fission, যে পদ্ধতিতেই পারমাণবিক বোমা তৈরি হোক না কেন, সেটা যতই অনৈতিক হোক না কেন,  সাবজেক্টিভ রিয়েলিটি দ্বারা পুষ্ট অপার স্বাধীনতানির্ভর প্রপাগান্ডা বা ন্যারেটিভ সেটিকে নৈতিক তো করে তোলেই, পাশাপাশি পারমাণবিক বোমাও বানাতে, পরীক্ষা করতে এবং সর্বোপরি নিক্ষেপ করতে সাহায্য করে।

অন্য পোস্ট: চেন্নাইয়ের মৎস্য নারায়ণ মন্দির শিল্প ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অপূর্ব সংমিশ্রণ

যাই হোক, প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হল, বিষ্ণুর দশাবতার তত্ত্ব্টির বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, বলরাম, বুদ্ধ এবং কল্কি, এই দশটি অবতারের মধ্যে  নৃসিংহ এবং পরশুরাম, এই দু’টি অবতার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে যেটিকে Metamorphosis বলা হয়, সেটির প্রকাশ  নৃসিংহ অবতারে পাওয়া যায়। এটি প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তনের বার্তাবহ। কোনও কিছুই স্থির নয়। অষ্টম শতকের রোমান কবি ওভিডের Metamorphosis নামক কবিতার বইয়ের ছত্রে ছত্রে এ বার্তাই দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টি থেকে স্বর্ণযুগ, রজত যুগ, তাম্রযুগ, লৌহ যুগ পরিবর্তনেরই সাক্ষী। সেটির সারাৎসার হল, Things are constantly changing. We do not have a choice whether things will change around us, we only have the choice whether we change to adapt or whether we stand the way we are.

হিরণ্যকশিপু নামক দৈত্য, যিনি কিনা মানুষ, পশু, মাটি, আকাশ ইত্যাদিতে অবধ্য থাকায় শ্রীবিষ্ণুর নৃসিংহ অবতার ধারণ। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে, এখানে বৈজ্ঞানিক দিক থেকে যেমন পরিবর্তনের (Metamorphosis) সূচনা হয়েছে, তেমনই মানুষ ইচ্ছা করলে দুষ্টের দমনে বৃহত্তর স্বার্থে বিশ্বশান্তি রক্ষার্থে তার সদ্গুণগুলির বিকাশসাধন  কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রেখে পাশবিক প্রবৃত্তিও গ্রহণ করতে হবে, একথারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই স্বয়ং মহাবীরকেও অহিংসা বজায় রাখার জন্য আজীবক সম্প্রদায়ের অন্যতম হোতা মকখালি গোশালাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করতে হয়েছিল। শত শত প্রাণ নিধন হবে জেনেও ধর্ম রক্ষার জন্য দেবেদিদেব বাসুদেবকেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে মেনে নিতে হয়েছিল।

গত ২২ এপ্রিল পহেলগামে যখন আততায়ীরা গুনে গুনে ২৬ জন নিরীহ পর্যটকের প্রাণ নেয়, তখন ভারত শুধু সন্ত্রাসবাদকে উপড়ে ফেলার জন্য অপারেশন সিঁদুরের আশ্রয়  নিতে বাধ্য হয়। ভারত একান্তভাবে শান্তির প্রচারক হলেও দেশের প্রধানমন্ত্রী এ কারণে বলতে বাধ্য হন, ‘অপারেশন সিঁদুর কেবল একটি নাম নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের অনুভূতির প্রতিফলন। অপারেশন সিঁদুর ন্যায়বিচারের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গীকার।’

তবে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেন, ‘চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ। তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্।।’ অর্থাৎ প্রকৃতির তিনটি গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি মানবসমাজে চারটি বর্ণ বিভাগ সৃষ্টি (প্রচলন) করেছি। আমি এ প্রথার স্রষ্টা হলেও আমাকে অকর্তা এবং অব্যয় বলে জানবে। তিনি আবার গীতারই অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৪১ নম্বর শ্লোকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ পরন্তপ। কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈ।।’ অর্থাৎ ‘হে পরন্তপ! স্বভাবজাত গুণ অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের কর্মসমূহ বিভক্ত হয়েছে।’  আর এই অনুযায়ী ব্রাহ্মণের প্রধান কাজ হল, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও পূজাপার্বণ; ক্ষত্রিয়দের কর্তব্য হল, যুদ্ধ করা, শাসন করা ও সমাজের নিরাপত্তা প্রদান করা; ব্যবসায়ী, কৃষক এবং উৎপাদনকারী হল বৈশ্য; তবে শূদ্রদের প্রধান কাজ অন্য বর্ণের জন্য কাজ করা, যেমন, শ্রমিক, কারিগর ইত্যাদি। এর পরেও বিষ্ণুর দশাবতারের মধ্যে পরশুরাম ব্রাহ্মণ হয়েও হাতে কুঠার তুলে পৃথিবীকে ক্ষত্রিয় রাজাদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চারবার পৃথিবী থেকে ক্ষত্রিয় নিধন করেন। তখন তিনি এক বিশেষ বার্তা দিতে চান।

অন্য পোস্ট: মাতৃত্বের ভাবনাকে বিকশিত করা প্রয়োজন

যখন পরশুরাম অবতারে স্বয়ং বিষ্ণু একজন ব্রাহ্মণ, প্রচলিত প্রথা ভেঙে অর্থাৎ জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও পূজাপার্বণের কাজ ছেড়ে দিয়ে ক্ষত্রিয়দের মতো হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছেন, তখন তিনি এ বার্তাই দিতে চান যে, দরকার হলে খোলনলচে বদলে সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখাটাও কর্তব্য। আর তাই দরকার হলে ব্রাহ্মণও অস্ত্র ধারণ করবে। রাজার শাসনও হবে নিয়ম মেনে। তাই তো অত্যাচারী রাজা ধননন্দকে সরিয়ে চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে সিংহাসনে বসিয়ে প্রমাণ করেন, ‘বিদ্বত্ত্বঞ্চ, নৃপতৃঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন। স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।।’ প্লেটোও তাঁর ‘দি রিপাবলিক’-এ ফিলজফার কিংয়ের কথা বলেন। এর অর্থ যে কেউই শাসক হতে পারে না। রাজা যখন অত্যাচারী, তখন তাঁর শাসন করার কোনও অধিকার নেই। সরাসরি অস্ত্র হাতে তুলে না নিলেও ফরাসি বিপ্লবেও তাই বিদ্বজ্জনদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা লক্ষ করা যায়। তাই তো সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো তাঁরা বলে গিয়েছিলেন, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান।’

বর্তমানে অবশ্য রাজারাজড়াদের শাসন আর নেই। ভোটনির্ভর প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র নামক শাসনব্যবস্থার চাপে মানুষ আজ দিশাহারা। কোথায় সে পরশুরাম, কোথায় সে চাণক্য, কোথায় সেই ইংরেজদের চোখে চোখ রাখা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নির্ভীক সুশীল সমাজ। শাসক যখন প্রায়শই প্রজাদের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নতিসাধন, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন ব্রাহ্মণের স্বভাববিশিষ্ট সুশীল সমাজ রামই থেকে যাচ্ছে, পরশুরাম কোথায় হতে পারছে?  কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতায় সেই কিম্ভূতকিমাকার সুশীল সমাজ— ‘কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়; কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে; কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক’, এদের ছাপিয়ে ওই শিশুটির মতো কেই-ই বা বলতে পারছে, ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’

5 4 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Subrata Das
Subrata Das
1 year ago

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে খুবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন রেখেছেন স্যার। সমাজ তথা ব্যক্তি সবেরিই সময়োচিত পদক্ষেপ সচল রাখতে পারে সমাজের বিকাশকে।

Pratap Laha
Pratap Laha
1 year ago

ঋগ্বেদ থেকে গীতগোবিন্দ, pre-socratic থেকে modern existentialism, E=mc2 থেকে ভারতীয় তথা বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও প্রতিবাদী ভাবনা, সবমিলিয়ে এ এক অনবদ্ধ সৃষ্টি।

Subhas Modak
Subhas Modak
1 year ago

মনোযোগ দিয়ে পড়তে পড়তে পড়াটা যে কখন শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। যেভাবে দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সমাহার করা হয়েছে তা প্রশংসনীয় এবং পরিশেষে, বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের জন্য যে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ব্যক্তিকে ভাবতে সাহায্য করবে এই প্রবন্ধটি।

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए