Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

মনের রসদ জোগাতে গ্রন্থাগারগুলির পুনরুজ্জীবন জরুরি (শেষ পর্ব)

Share Links:

মতিউর রহমান

লাইব্রেরি ব্যবস্থার বিবর্তনে একসময় স্থানীয় জনগণ তথা  মানুষের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। লাইব্রেরির বিকাশ ও বিস্তারে তাঁরা রেখেছিলেন অনবদ্য অবদান। লাইব্রেরির সঙ্গে তাঁদের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। ছিল নাড়ির টান বা মানসিক নৈকট্য। বিভিন্ন লাইব্রেরি গড়ে উঠেছে আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষদের সংস্কৃতিমনস্ক ভাবনার ফলে। তাঁদের উদারহস্ত তথা সহযোগিতার ফলে  লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও তার সম্প্রসারণ সহজ হয়েছিল। বহু সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ এগিয়ে এসে গ্রন্থপাঠে সাধারণ মানুষকে উৎসাহী করে তুলতেন। সময়ের বিবর্তনে লাইব্রেরিতে গ্ৰন্থপ্রেমী মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে।

বর্তমানে মানুষ বেশি করে মোবাইল ফোনমুখী হয়েছে। তাদের জীবনে বেড়েছে ব্যস্ততা। তবুও এ কথা বলা যায়, লাইব্রেরি ব্যবস্থা যদি আগের মতো সম্প্রসারিত থাকত, তাহলে তুলনায় কিছুটা কম হলেও বই পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা যেত।

তবে মানুষ যে একেবারেই লাইব্রেরিবিমুখ বা বইয়ের প্রতি সম্পূর্ণভাবে আগ্রহ হারিয়েছে, এমন কথা চূড়ান্তভাবে সত্য নয়। বই পাঠের ফলে যে মানসিক আনন্দ পাওয়া যায়, তা মোবাইল ফোনে পাওয়া যায় না। তবে লাইব্রেরি বা বই পাঠের প্রতি মানুষের আত্মিক সংযোগের সুতো আগের চেয়ে আলগা হয়েছে। বই পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেছে, এটা সত্য।

তবে প্রযুক্তির কারণে লাইব্রেরি  ব্যবস্থা একেবারেই ধ্বংস হয়েছে, এটা অর্ধসত্য। কর্মীর অপ্রতুলতার কারণে লাইব্রেরির দরজা যদি বন্ধ থাকে, তাহলে পাঠক কীভাবে সেখানে পৌঁছবে? বর্তমানে মানুষের হাতে অর্থ এসেছে। বিলাস, প্রাচুর্য ও বিনোদন সহজলভ্য হওয়ায় নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বইয়ের প্রতি একটু একটু করে হলেও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।

বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মনে করছে, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবস্থা অদ্বিতীয় অর্থাৎ তাদের মতে, এটাই শেষ কথা বলে। কিন্তু এর বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষ রয়েছে, যারা পাঠপ্রিয়। সংখ্যায় কম হলেও পাঠক সমাজ, যারা বইকে এতদিন তাদের মানসিক রসতৃপ্তি তথা বিনোদনের আধার ভেবে এসেছে, তাদের কী হবে? আমরা কেউ কি বিষয়টি ভেবে দেখেছি?

যে পাঠকদের পকেটে টাকা নেই, তারা কীভাবে বই কিনবে বা তাদের মানসিক তৃষ্ণা মেটাবে? এটাও সত্য, স্কুল-কলেজে দরিদ্র ছেলেমেয়েদের সিলেবাসের বইয়ের চাহিদা মেটাচ্ছে লাইব্রেরি। এমনও কিছু বয়স্ক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা ইন্টারনেট থেকে বই পড়তে আগ্রহী নয়, অনেকে আবার ইন্টারনেটে বই পাঠ করতে অস্বচ্ছন্দ বোধ করেন। বইয়ের সঙ্গে পাঠকের যে আত্মিক এবং নিবিড় সম্পর্ক, তাকে অস্বীকার করা যায় না। বিভিন্ন জায়গায় বইমেলা বা কলেজ স্ট্রিটে যেসব পুরোনো বইয়ের দোকান রয়েছে, সেখানে প্রচুর মানুষের ভিড় লক্ষ করা যায়। সেখানে অনেক দুষ্প্রাপ্য, অমূল্য বই পাওয়া যায়, যা ইন্টারনেট দিতে পারে না।

ছাপানো এবং ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বইয়ের মধ্যে সরাসরি কোনও সংঘাত নেই। এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বন্ধনই পারে পাঠককে বাঁচিয়ে রাখতে। সরাসরি বই পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমলেও এ কথা বলা যেতেই পারে, লাইব্রেরির প্রতি মানুষের আগ্রহ একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি।

একথা বাস্তব, ইদানীং একটা বড় অংশের মানুষ বাংলা সিরিয়ালের প্রতি ঝুঁকেছেন। সেখানে যতই পারিবারিক ঝগড়া-ঝামেলা, অশান্তি, ষড়যন্ত্র, কুটকচালির চিত্রনাট্য প্রদর্শিত হোক না কেন, সেখানেই তারা বিনোদনের রসদ খুঁজে পাচ্ছে। এই ব্যবস্থার পাশাপাশি বলা যায়, একদল পাঠক রয়েছে, যাদের কাছে এই সিরিয়াল বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। তাদের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারই গ্রন্থাগারের বিকল্প।

যে কোনও মূল্যে লাইব্রেরি তথা বই পাঠের প্রতি মানুষের আগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। সরাসরি বই পাঠের মধ্যে আমাদের যে মানসিক তৃপ্তি আসে, তা অন্য কোনও মাধ্যম  দিতে পারে না। অমূল্য জ্ঞানের পরিসরকে সম্প্রসারিত করতে লাইব্রেরির ভূমিকা রয়েছে। সময়ের দাবি এটাই, লাইব্রেরি ব্যবস্থা ফের সম্প্রসারিত হোক। লাইব্রেরির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পাক।

লাইব্রেরি ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে সরকারকে যথেষ্ট সংখ্যক লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ করতে হবে। আগের মতোই জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক অমূল্য গ্রন্থগুলির জোগান সুনিশ্চিত করতে হবে। পাঠককে কীভাবে ফের লাইব্রেরিমুখী করা যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। সরকারের তরফে অবশ্যই সদর্থক ভাবনা জরুরি।

তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে প্রবীণ তথা সমাজে যাঁরা অভিভাবক রয়েছেন, তাঁদের ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বোঝাতে হবে,  লাইব্রেরি কীভাবে তাদের জ্ঞানের জগৎ বৃদ্ধি করতে পারে,  মানসিক পরিসর সম্প্রসারিত করতে পারে। অন্য কোনও মাধ্যম যে বই পাঠের বিকল্প হতে পারে না, তা তাদের বোঝাতে হবে।

আমরা আশাবাদী, সকলেই যদি সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে পারি, তাহলে লাইব্রেরি ব্যবস্থা ফের বেঁচে উঠবে। সুস্থ সাংস্কৃতিক ভাবনা, সাহিত্যের চর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনা, মহাপুরুষ তথা জ্ঞানী মানুষের জীবনের নানা আলোকময় দিক গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের ঘুণধরা, ক্ষয়িষ্ণু মনের অন্দরে। বিচিত্র বিষয় নিয়ে পাঠকদের মধ্যে আলোচনা, বিতর্ক হোক পাঠাগারগুলিতে। তাতে সুস্থ নির্মল চেতনার আলোয় ফের আলোকিত হবে পাঠকের মন,  পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, এ আশা আমরা করতেই পারি।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए