বটুকৃষ্ণ হালদার
ভারতের রাজনৈতিক আকাশে জ্যোতি বসু একটি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি রাজনৈতিক দলের পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন। যে সমস্ত নেতা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে চান, তাঁদের অনেকের বক্তব্যের শুরুতেই বারবার ফিরে আসে জ্যোতি বসুর নাম। তাই ভারতের মতো উপমহাদেশে যতদিন রাজনীতি শব্দটি থাকবে, ততদিন অবহেলিত, বঞ্চিত, অত্যাচারিত শ্রেণির মুখে বারবার উচ্চারিত হবে জ্যোতি বসুর নাম।
উপমহাদেশের পরিচিত কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একটানা ২৩ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক সংস্কার করে গিয়েছেন, যার ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে তৃতীয় ধারার ধারণা নিয়ে নতুন মেরুকরণে ভূমিকা রাখেন জ্যোতি বসু। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, তাঁকে অনেকে ‘কিং মেকার’ বলে অভিহিত করতেন।
জ্যোতি বসু যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন মার্কসবাদ ও রাজনীতিতে দীক্ষিত। হ্যারি পোলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্র্যাডলি এবং গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যান্য নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ছিলেন ইন্ডিয়া লিগ, লন্ডনের সদস্য, গ্রেট ব্রিটেনের ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস-এর সদস্য, লন্ডন মজলিশের সেক্রেটারি। ভারতে ফিরে তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। একজন ট্রেড ইউনিয়নবাদী হিসাবে বিএ রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন এবং অল ইন্ডিয়া রেলওয়ে মেনস ফেডারেশনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়াও তিনি আরও কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর ১৯৫, ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৭৭, ১৯৮২, ১৯৮৭, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধীদলের নেতা ছিলেন। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের দু’টি যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২১ জুন, ১৯৭৭-এ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। টানা পাঁচ মেয়াদে রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্ব দেন। ৬ নভেম্বর, ২০০০-এ মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন।
অন্য পোস্ট: লিঙ্গভেদে শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূর হোক
সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় যখন জ্যোতিবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, তখন মাঝেমধ্যেই উঁকি মেরে আসতেন তাঁর রান্নাঘরের দিকে। সেদিন কী রান্না হয়েছে, সেটা একনজরে দেখে নিতেন। একেবারেই সাধারণ রান্নাবান্না হত। ডাল, ভাত আর বেগুন ভাজা। পরে যখন জ্যোতি বসু বিরোধী দলনেতা হলেন, তখন অবস্থার সামান্যই উন্নতি হয়েছিল। তাঁর বেতন বেড়ে হয়েছিল মাসে ৭৫০ টাকা। সে সময় জ্যোতি বসুর স্ত্রী কমলা বসু মাঝেমধ্যেই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কাছে অনুযোগ করতেন যে, তিনি যেন তাঁর বন্ধুকে একটু বোঝান যে, সংসারটা কীভাবে চলছে। মাসিক বেতনের প্রায় পুরো অংশটাই পার্টিকে দিয়ে দিতেন জ্যোতি বসু। মিসেস বসু বলতেন, ‘দু’বেলা রান্নাবান্না করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
একবার চন্দননগর থেকে কলকাতায় আসার সময় জ্যোতি বসু আর সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে কয়েকজন অল্প বয়সি মেয়ে ঘিরে ধরেছিল। জ্যোতিবাবু সে সময় রীতিমতো স্টার নেতা। তাই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওই মেয়েরা জ্যোতিবাবুর হাতের লেখায় ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তারা চাইছিল সইয়ের সঙ্গে তিনি যেন কয়েকটি লাইনও লিখে দেন। কিন্তু জ্যোতি বসু আর কিছু লিখতে চাননি, শুধু সই করে দিয়েছিলেন। গাড়িতে ফিরে আসার পর সিদ্ধার্থশঙ্কর মজা করে বলেছিলেন, ‘এত সুন্দরী মেয়েকে তুমি এককথায় না করে দিলে! রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখা থেকে এক-দু’টি লাইন লিখে দিতে পারতে।’ জ্যোতি বসু জবাব দিয়েছিলেন, ‘জানলে তো লিখব।’
আমরা অনেকেই অবগত যে, জ্যোতি বসু ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত টানা ২৩ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, যা একটা বিশ্ব রেকর্ড। তিনি লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে দীক্ষিত হন। দেশে ফিরে ব্যারিস্টারি না করে কমিউনিস্ট পার্টির হোল টাইমার হয়ে যান। তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করেছিলেন। তাতে লোভনীয় পেশায় যুক্ত হয়ে জীবনে ভোগবিলাসের মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে পারতেন। কিন্তু তা না করে কমিউনিস্ট পার্টির কষ্ট, সংগ্রাম, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষের প্রতি উৎসর্গীকৃত ছিলেন। জ্যোতি বসুর মতো বহু নেতা-কর্মী ত্যাগ, আদর্শ, মূল্যবোধ, তিতিক্ষায় গোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বিনিময়ে তাঁরা কোনও সুখবিলাসের পরোয়া করেননি। সাধারণত নিপীড়িত, অত্যাচারিত, বঞ্চিত জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা করাই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল।

