অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস ঘটনাবহুল। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম আবির্ভাব ১৯৩২ সালে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ভারত প্রথম টেস্ট ক্রিকেট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল ১৯৫১-’৫২ সালে। প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত পেয়েছে বিখ্যাত বহু ক্রিকেটার।
একসময় ভারতীয় দলে ছিলেন বিষেন সিং বেদি, ভাগবত চন্দ্রশেখর, বেঙ্কটরাঘবন, এরাপল্লি প্রসন্নর মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা। আমরা ছোটবেলায় সুনীল গাভাসকারের অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভা দেখেছি। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড (১০,০০০ রানের গণ্ডি), সর্বাধিক শতরানের রেকর্ডের আমরা সাক্ষী থেকেছি। আমরা দেখেছি অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী কপিল দেব নিখাঞ্জের খেলা। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতের বিশ্বকাপ জয় এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
তারপর দলে আবির্ভাব হয় ক্রিকেটের ভগবান বলে স্বীকৃত শচীন রমেশ তেন্ডুলকরের। টেস্ট ম্যাচে ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর করাচিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। ক্রিকেটের ইতিহাসে টেস্ট এবং একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে ১০০টি শতরান করার ঐতিহাসিক রেকর্ড তাঁর দখলে। তারপর ইংল্যান্ডের লর্ডসে একসঙ্গে আবির্ভাব হয় দুই ভারতীয় কিংবদন্তি ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি এবং রাহুল দ্রাবিড়ের। ভারতীয় ক্রিকেট যখন আজাহারউদ্দিনের সময় ব্যাটিং কেলেঙ্কারিতে টালমাটাল, সে সময় দলের হাল ধরেন সৌরভ গাঙ্গুলি। তিনিই ভারতীয় ক্রিকেটকে বিশ্বের দরবারে চোখে চোখ রেখে সব টিমকে জবাব দিতে প্রথম শিখিয়েছেন। তারপর উঠে এসেছেন আর এক কিংবদন্তি খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ধোনির নেতৃত্বে ভারত দু’টি বিশ্বকাপ জয়লাভ করে। সে সময় ছিলেন আর এক কিংবদন্তি ক্রিকেটার বিরাট কোহলি। তাঁর অসাধারণ ক্রিকেট প্রতিভা এখনও বিশ্ব ক্রিকেটকে প্রভাবিত করে।
২০০৮ সালে ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় টুর্নামেন্ট ইন্ডিয়ান প্রিমিয়াম লিগ (IPL) শুরু হয়েছিল। এই ক্রিকেট লিগ ভারতীয় ক্রিকেটকে আমূল বদলে দিয়েছে। জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন ভারতীয় ক্রিকেট প্রতিভা। এর নবতম সংযোজন ১৪ বছর বয়সি বৈভব সূর্যবংশী। এ বছর রাহুল দ্রাবিড়ের কোচিংয়ে রাজস্থান দলে তাকে নেওয়া হয় ১ কোটি টাকার বিনিময়ে। তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু রাহুল দ্রাবিড় যে খেলোয়াড় ভুল বাছেননি, তা প্রমাণিত হয়েছে। এবারের আইপিএলে গুজরাট টাইটানের বিরুদ্ধে তাঁর ৩৫ বলে ১০১ রানের ইনিংস সবাইকে চমকে দিয়েছে। জন্ম দিয়েছে আর এক তরুণ ভারতীয় ক্রিকেট প্রতিভার। তাকে নিয়েই এখন চলছে ভারতীয় ক্রিকেটে চর্চা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজে সদ্য সমাপ্ত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়। একসময় ভারতীয় ক্রিকেটের অনুরাগীরা শচীনের ঝোড়ো ইনিংসের অপেক্ষায় থাকত। শারজায় তাঁর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি স্পিনার শ্যেন ওয়ার্নের ব্যাটে বলে লড়াই ইতিহাস হয়ে রয়েছে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর টেস্ট অভিষেক এবং ইমরান খানের মতো বোলারের বিরুদ্ধে ব্যাটিং জানিয়ে দিয়েছিল বিশ্ব ক্রিকেটে এই নতুন তারকার উদয়ের কথা। শচীন দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেট জীবনে অনেক রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। তাঁর ব্যাটিং রেকর্ড তাঁকে ‘ক্রিকেটের ঈশ্বর’ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
আর ২০২৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেট মঞ্চে আর এক সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের ব্যাটিং দেখে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রাক্তন এবং বর্তমান কিংবদন্তি ক্রিকেটার থেকে ধারাভাষ্যকার একবাক্যে তাঁর জয়ধ্বনি দিয়ে উঠলেন। তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন যুবরাজ বৈভব রাজবংশী। এ নিয়ে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ছ’বার জিতল, যা শুরুর পর থেকে সর্বাধিক জয়ের শিরোপা।
কিন্তু এসব রেকর্ড সরিয়ে বিশ্বময় ক্রিকেটপ্রেমীদের একটাই আলোচনা, বৈভব সূর্যবংশী, ফাইনালে যাঁর ১৫টি চার এবং ১৫টি ছয়ের সাহায্যে মাত্র ৮০ বলে ১৭৫ রান তুলনায় চলে এসেছে বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক কপিল দেব নিখাঞ্জের জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে করা ১৭৫ রানের ইনিংস। সেবার জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ভারতের পাঁচ উইকেট পড়ে যায় মাত্র ১৭ রানে। তার পর এক অবিশ্বাস্য ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন অধিনায়ক কপিল দেব। তখন বিশ্বকাপ ম্যাচ হত ৬০ ওভারের। কপিল দেব ১৩৮ বলে ১৭৫ রান না করলে ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয় হত না। পাঁচ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর কী পাহাড়প্রমাণ চাপ নিয়ে অধিনায়ক কপিল দেব মাঠে নেমেছিলেন, তা সহজেই অনুমেয়। ১৯৮৩ সালে প্রুডেনসিয়াল কাপ (সে বছরের বিশ্বকাপের নাম) জেতা ভারতীয় ক্রিকেটের খোলনলচে পালটে দিয়েছিল।
আর ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আফ্রিকার মাটিতে ১৪ বছরের এক অকুতোভয় কিশোরের দাপট দেখল সারা বিশ্ব। আশা করা যায়, আগামিদিনে ভারতীয় ক্রিকেটের স্তম্ভ হয়ে দাঁড়াবে বিহারের সমস্তিপুরের এই কিশোর ক্রিকেটার।

