প্রতিভা ধর
বসন্তের স্নিগ্ধ হাওয়ার সঙ্গে যখন প্রকৃতি পলাশ–শিমুলের রঙে সেজে ওঠে, তখনই আসে বাঙালির সবচেয়ে রঙিন উৎসব— দোল পূর্ণিমা। এই উৎসব শুধু রঙের খেলা নয়, ভক্তি, প্রেম, সংগীত, নাচ, আবিরভরা আকাশ আর মানুষের মিলনের এক চিরন্তন বন্ধন। বাঙালির চিরচেনা সাংস্কৃতিক জীবনে দোল যেন বসন্তের হাসির প্রতিচ্ছবি।
দোল উৎসবের শুরু ব্রজভূমিতে। হিন্দু পুরাণে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই কৃষ্ণ রাধা ও গোপীদের সঙ্গে রঙের খেলায় মত্ত হন। বাংলায় সেই স্মৃতি নতুন রূপ পায়— শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব দিবস হিসাবেও দোল পূর্ণিমা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভক্তরা এই দিন সংকীর্তন, পুষ্পাঞ্জলি ও শোভাযাত্রায় শ্রীচৈতন্যের প্রেমতত্ত্বকে স্মরণ করেন।
শান্তিনিকেতনের বাসন্তী দোল: রং ও রবীন্দ্র-ঐতিহ্যের মহামিলন
বাংলায় দোল পূর্ণিমার অন্যতম বড় আকর্ষণ শান্তিনিকেতন। বসন্তোৎসবের নামেই পরিচিত এই উদ্যাপন রবীন্দ্রনাথের হাতে গড়ে ওঠা বর্ণিল সাংস্কৃতিক সম্পদ। সাদা–হলুদ পোশাকে নৃত্য, রবীন্দ্রসংগীত, শোভাযাত্রা, ফুল ও আবির— এসব মিলেমিশে তৈরি করে এক বহুবর্ণের সাংস্কৃতিক মেলা। দেশ–বিদেশের পর্যটকরা এই দিন শান্তিনিকেতনের পথ ধরে আসেন শুধু রঙের উৎসবে অংশ নিতে নয়, বাংলার সৃজনশীল ঐতিহ্যকে খুব কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখতে।
দোল পূর্ণিমা খাদ্য সংস্কৃতিতেও বিশেষ। বাড়িতে তৈরি গুড়–নারকেলের পিঠে, মোয়া, কথলি, মুড়কি— সবই উৎসবের অঙ্গ। আর দোলের বিশেষ পানীয় ঠান্ডাই (বাদাম, খয়েরের জল, দুধ, এলাচ, গোলাপ জল, মশলা আর শুকনো ফলের স্বাদে মেশানো) অনুষ্ঠানকে আরও আনন্দমুখর করে।
গ্রামবাংলায় দোলের দিন ভোগের মেনুতে থাকে খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস, যা উৎসবের শুচিতা আরও বাড়ায়। দোল পূর্ণিমা শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক সম্প্রীতির উৎসব। সকল বয়স, ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে রঙে রঙে মেতে ওঠে। এই উৎসব শেখায়— রং শুধু সাজায় না, মানুষকে কাছে আনে।
আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে দোল পূর্ণিমা নতুন সম্পর্ক, নতুন আশা আর নতুন রঙের প্রতিশ্রুতি বয়ে আনে। বর্তমানে দোল উৎসব শহুরে অনুষ্ঠানে নতুন আঙ্গিকে হাজির— সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবির ফেস্টিভ্যাল, মিউজিক কনসার্ট, ফটোগ্রাফি ইভেন্ট— সব ক্ষেত্রেই দোলের রঙের প্রভাব। তবে পরিবর্তন যতই আসুক, দোল পূর্ণিমার ভিত ভালোবাসা, ভক্তি ও আনন্দ আজও অপরিবর্তিত।
বসন্তের শেষে যখন পূর্ণিমার আলো লালমাটির পথে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দোল পূর্ণিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনকে রঙে ভরাই, মনকে মুক্ত করি, সম্পর্ককে আবিরে রাঙাই। দোল তাই শুধু উৎসব নয়, বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
