অধ্যাপক ড. জয়ন্তকুমার দেবনাথ

মহিলাদের খয়রাতির ওপর নির্ভর করার কারণ কি যুগ যুগ ধরে অর্থনৈতিক বঞ্চনা? আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে মহিলাদের সংসারের কাজ করতে দেখা যায়। বাড়ির পুরুষদের সেবা-যত্ন, সন্তান মানুষ করা ইত্যাদি কাজে তাঁরা নিযুক্ত। তার বিনিময়ে তাঁদের কোনও পারিশ্রমিক নেই। বোঝানো হয়েছে, এটাই তাঁদের কাজ।
একসময় তো মেয়েরা শিক্ষার আলো থেকেও বঞ্চিত ছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মানুষের আবির্ভাব না হলে হয়তো মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা আরও বহু বছর পিছিয়ে যেত। শিক্ষা মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে, ভালো-মন্দ চিনতে শেখায়, সর্বোপরি নিজেদের অধিকার বোধ জাগ্রত করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর কথা বাদই দিলাম। আজকের দিনেও কি মহিলারা ঘরসংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন! এখনও পুরুষরা মনে করেন, বাড়ির মহিলাদের কাজ ঘরসংসার সামলানো। আজকের দিনেও দু’টাকা খরচ করার দরকার হলে বাড়ির পুরুষে মানুষের কাছে হাত পাততে হয়। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, খেটে খাওয়া মানুষ থেকে ঘরের মেয়ে, যে কোনও নারীকে স্বামী, বাবা বা শ্বশুর কোনও পুরুষের কাছে হাত পাততে হয়। তারপর পুরুষের দিক থেকে প্রথম যেসব প্রশ্ন আসে, তা হল, টাকা দিয়ে কী হবে, তোমার আবার টাকার কী দরকার ইত্যাদি।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, আজকের দিনে বহু মহিলা সরকারি এবং বেসরকারি কাজে নিযুক্ত এবং স্বনির্ভর। তারপরেও অনেক সময় দেখা যায়, অনেক মহিলা চাকরির টাকা নিজের ইচ্ছায় খরচ করতে পারেন না। আবার সরকারি ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা মানা হলেও বেসরকারি ক্ষেত্রে তা মানা হয় কোথায়! বিভিন্ন বেসরকারি কাজে মহিলাদের কম পারিশ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
গত শতাব্দীর গোড়া থেকেই মহিলারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে চলেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইএএস অফিসার, আইপিএস অফিসার, বিজ্ঞানী, ক্রীড়াবিদ। তবে তাঁদের সংখ্যা ভারতের মহিলা জনসংখ্যার নিরিখে যৎসামান্য। এখনও একটা বড় সংখ্যার মহিলা পুরুষশাসিত সমাজে পরাধীনভাবে কাজ করছেন।
বেশ কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের জন্য বেশ কিছু প্রকল্প রাজ্য সরকার চালু করেছে। তার মধ্যে যেটা সারা ভারতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, তা হল ‘লক্ষীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প। ২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিশাল জয় আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মস্তিষ্কপ্রসূত লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ফল বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। তার পর থেকে বিভিন্ন রাজ্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুরূপ প্রকল্প চালু করেছে এবং রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। মহারাষ্ট্র এবং ঝাড়খণ্ডের নির্বাচনে যাথাক্রমে, বিজেপি জোট এবং ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অনুরূপ লড়কি বহিন যোজনা এবং মাইয়া সম্মান যোজনা প্রধান ভূমিকা নিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহল মনে করে।
ইতিপূর্বে কর্নাটকের কংগ্রেস সরকার মহিলাদের ২ হাজার টাকা করে দেবে বলে ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারপর ভোটে জিতে কংগ্রেস সরকার গৃহলক্ষ্মী প্রকল্পে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ২ হাজার টাকা করে দিচ্ছে। তেলেঙ্গানায় একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে মহালক্ষ্মী ভাণ্ডার চালু করেছে। মধ্যপ্রদেশে বিজেপি সরকার লড়কি বহিন প্রকল্প চালু করে সাফল্য পেয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সাফল্য দেখে মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকার লড়কি বহিন প্রকল্প চালু করে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ভোটের আগেই পাঁচ মাসের অগ্রিম ৭,৫০০ টাকা দিয়ে দেয়। ফলও মিলেছে হাতেনাতে। মহারাষ্ট্রের নির্বাচনে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি জোট ক্ষমতায় ফিরে আসে।
নারীর ক্ষমতায়ন, সমানাধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে যদি এই প্রকল্পগুলি হত, তবে একে একটি ভালো উদ্যোগ হিসাবে বলা যেতেই পারত। আমাদের দেশের একশ্রেণির মহিলা আর্থিকভাবে পরাধীন জীবনযাপন করেন। তাঁরা স্বামীর কাছ থেকে হাতখরচের সামান্য টাকাও পান না। স্বামীর দয়ার বা মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাঁদের কথা ভেবে যদি এই প্রকল্পগুলি রূপায়িত হত, তবে সত্যিই নারীরা সমাজে মাথা তোলার সুযোগ পেতেন। এই প্রকল্পগুলি কারা পাবেন, এ নিয়ে কিছু নিয়ম রাখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা দেখা হয় কি? এই আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার জন্য বার্ষিক আয়ের ঊর্ধ্বসীমা রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা হয় না। আবার সরকারি চাকরি করা পরিবারের এই প্রকল্পের আওতায় আসার কথা নয়। কিন্তু বহু সরকারি চাকরিজীবীর স্ত্রীও এই সুযোগ নিয়ে থাকেন। তাতে এই প্রকল্পের সৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় না কি?
পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে নির্বাচনে সাফল্য অন্যান্য রাজ্যকে উৎসাহিত করছে এবং যেখানে এই প্রকল্পগুলি চালু হয়েছে, সেখানকার মহিলা ভোটারদের সমর্থন পেয়ে সরকারও গঠন করেছে। এটা তো হল রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের মোক্ষম উপায়। কিন্তু প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সবাইকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা কি সমর্থনযোগ্য? এতে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকার কি অপচয় হচ্ছে না?
ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট পাবলিক ফিনান্স পলিসির রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পগুলি আর্থিক ঋণ দিয়ে চালানো হচ্ছে। এটা কি রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা নয়? যাঁরা যথার্থই অভাবী, তাঁদের চিহ্নিত করে সহযোগিতা করা হোক।
বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের রাজ্যে সবুজ সাথি প্রকল্পে নবম-দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে সাইকেল বিতরণ করা হয়। প্রশ্ন হল, জেলার বড় বড় স্কুলে যারা পড়াশোনা করে, তাদের প্রকৃতপক্ষে সাইকেলের প্রয়োজন নেই। আবার মফস্সল শহরের অনেক ছাত্রছাত্রী সাইকেল পাওয়ার জন্য স্কুলের খাতায় নাম লিখিয়ে রাখে। সাইকেল নিয়ে বেচে দিতেও দেখা যায়। তবে একথা অনস্বীকার্য, প্রত্যন্ত গ্রামের অনেক গরিব ছাত্রছাত্রী রয়েছে, যাদের অনেক দূরের স্কুলে পড়তে যেতে হয়। তাদের সাইকেল অবশ্যই দরকার। তাই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, সাইকেল কিংবা ট্যাব, যাই হোক না কেন, আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের হাতে তুলে দিলে সত্যি তারা উপকৃত হবে।

