ড. গৌতম মুখোপাধ্যায়
অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ
সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মেদহীন, কঠিন চোয়ালের লম্বা ছিপছিপে গড়ন। চাউনিতে ছিল গভীর অন্তর্দৃষ্টি, যেন একলহমায় ভিতরের সবটুকু পড়ে নিতে পারেন। আর কণ্ঠস্বরে ছিল এমনই মায়াবী আকর্ষণ, যা গড়পড়তা বাঙালির থেকে তাঁকে পৃথক করেছে। তিনি বিকাশ রায়। তাঁর অভিনয়দীপ্তির প্রখর তেজে বহু নায়ক কুপোকাত হয়েছিলেন।
বিকাশ রায় আত্মজীবনী ‘আমি’-তে লিখেছেন, ‘গ্রামে আমাদের বাড়ির দুর্গাপূজার সময় বাবা থিয়েটার দল গড়লেন।… বাড়িতে ছেলেদের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত ছেলেদের নিয়ে জোরদার দল হন।’
আমরা জানি, সেকালের বনেদি বাড়িতে দুর্গাপুজোর চল ছিল এবং বহু জায়গাতেই মানুষ পুজোর দিনগুলিতে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা কাটাতেন নানা ধরনের অভিনয় দর্শনের মাধ্যমে। অভিনয়ের এই বিশেষ ধারাটি বিকাশ উত্তরাধিকার সূত্রে আয়ত্ত করেছিলেন। সেই অর্থে পিতা যুগলকিশোর ছিলেন তাঁর পথপ্রদর্শক। তাঁর বাচনভঙ্গি, কন্ঠস্বর এবং অনবদ্য স্টাইলের জন্য বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি বিশেষ স্থান অধিকার করে নেন। মহানায়ক উত্তম কুমারের স্বর্ণযুগেও তাঁর অভিনয় এক স্বতন্ত্র ঘরানা তৈরি করেছিল।
দীর্ঘ ৩৮ বছরের অভিনয় জীবনে বিকাশ মঞ্চেও অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির মধ্যে ৪২, ভুলি নাই, রত্নদীপ, জিঘাংসা, টাকা আনা পাই, কীর্তিগড়, না, মরুতীর্থ হিংলাজ, সব্যসাচী, কেরি সাহেবের মুন্সি, বনহংসী, ছদ্মবেশী, রাত্রির তপস্যা, আরোগ্য নিকেতন, উত্তর ফাল্গুনী বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও তিনি অগ্ৰসর হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে তিনি বিকাশ রায় প্রোডাকশনস তৈরি করেন। এছাড়া তিনি চিত্রনাট্যকার হিসাবেও কাজ করেছেন।
বিকাশের জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল নদিয়ার মদনপুরের নিকট প্রিয়নগরে। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন ১৯৩৬ সালে।
সিনেমা-থিয়েটারের চেয়ে বিকাশের বেশি ঝোঁক ছিল সাহিত্যে। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় কলেজ ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। ‘বেদুইন’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। বিএল (আইন) পাশ করেন ১৯৪১ সালে, কিন্তু স্থায়ীভাবে ওকালতি পেশা গ্রহণ করেননি। কর্মজীবন শুরু হয় এক ব্যারিস্টারি ফার্মের জুনিয়র হিসাবে। আইন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে চাকরি নেন সরকারি সিভিল ডিফেন্স বিভাগে, হেড ক্লার্কের। সেখানেও বেশি দিন থাকেননি। অনেক কম, ৮০ টাকা মাইনেতে চাকরি নেন রেডিয়োর ঘোষকের। পরে রেডিয়োর অনিশ্চিত চাকরি ছেড়ে এক বাল্যবন্ধুর সহায়তায় বিখ্যাত বিজ্ঞাপন সংস্থায় যোগ দেন। কিন্তু তাঁর ভাগ্যদেবতা তাঁকে অভিনয় জগতে নিয়ে এসে থিতু করেন।
বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যাঁরা জনপ্রিয়তার তুঙ্গে না থেকেও শিল্পের গভীরতর স্তরে এক অনিবার্য উপস্থিতি নির্মাণ করেছেন। বিকাশ রায় সেই বিরল শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর অভিনয় ছিল উচ্চকিত আবেগের নয়, বরং সংযম, বুদ্ধিবৃত্তি এবং মানবচরিত্রের সূক্ষ্ম অন্বেষণের শিল্প। তবু বিস্ময়ের বিষয়— সমকালীন আলোচনায় কিংবা সাম্প্রতিক স্মৃতিচর্চায় তাঁর শিল্পীসত্তা প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি।
বিকাশ রায় একইসঙ্গে চলচ্চিত্র শিল্পী, নাট্যকার, নির্দেশক ও বেতার ব্যক্তিত্ব হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। মঞ্চ এবং চলচ্চিত্র— দু’টি ক্ষেত্রেই তাঁর সমান দক্ষতা লক্ষণীয়। তাঁর অভিনয়ের পরিসর ছিল বিস্তৃত। অভিনয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সংযত প্রকাশভঙ্গি। বাংলা চলচ্চিত্রে যেখানে অনেক সময় নাটকীয় উচ্চারণ ও আবেগের প্রাবল্য দেখা যায়, সেখানে তিনি ব্যবহার করেছেন, মৃদু স্বর, চোখের ভাষা, বিরতির নাটকীয়তা, দেহভঙ্গির সূক্ষ্ম পরিবর্তন এবং উচ্চারণের মাদকতা। এই কৌশল ইউরোপীয় বাস্তববাদী অভিনয় রীতির সঙ্গে তুলনীয়। তাঁর অভিনয়ে চরিত্র কখনও ‘অভিনয়’ বলে মনে হয় না, বরং জীবন্ত মানবিক উপস্থিতি হয়ে ওঠে।
বিকাশ রায় কেবল অভিনেতা নয়— তিনি ছিলেন গভীর সাহিত্যপাঠে অভ্যস্ত একজন সংস্কৃতিবান মানুষ। ফলে তাঁর সংলাপ উচ্চারণে শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ, ছন্দ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠত। বাংলা সাহিত্যের মধ্যবিত্ত সংকট, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও অস্তিত্ববোধ তাঁর অভিনয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। এদিক থেকে তিনি এক অর্থে চলচ্চিত্রে সাহিত্যিক বাস্তবতার প্রতিনিধি। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, পাহাড়ি সান্যাল প্রমুখ অভিনেতার বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বিকাশ রায় একটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন। তুলনামূলকভাবে উত্তম কুমার ছিলেন রোমান্টিক নায়কত্বের প্রতীক, সৌমিত্র বুদ্ধিবৃত্তিক আধুনিকতার প্রতিনিধি,
ছবি বিশ্বাস মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বের নাটকীয় শক্তি, তুলসী ও পাহাড়ি ছিলেন সাবলীল অভিনয়ের জাদুকর। অন্যদিকে বিকাশ রায় ছিলেন নীরব বাস্তবতার শিল্পী— যা দর্শকের তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাস কম পেলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে।
বিকাশ গত শতকের চারের দশকের শেষ থেকে আটের দশক পর্যন্ত অভিনয় জগতে সক্রিয় ছিলেন। শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক থেকে শুরু করে খলনায়কের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। ‘৪২’ ছবিতে নির্মম পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি দর্শকদের জুতো পর্যন্ত উপহার পেয়েছিলেন, যা তিনি নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার বলে মনে করতেন। তিনি তাঁর অন্যান্য চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন, উচ্চকণ্ঠ নয়, গভীরতা শিল্পের আসল পরিচয়। জনপ্রিয়তা নয়, মানবিক সত্যই স্থায়ী। তাঁর অভিনয় তাই কেবল চলচ্চিত্রের নয়, সামাজিক ইতিহাসেরও অংশ। এই অভিনয় রীতি ইউরোপীয় বাস্তববাদী ধারার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। স্তানিস্লাভস্কির মনস্তাত্ত্বিক অভিনয় পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়— বিকাশ রায় চরিত্রের বাহ্যিক ভঙ্গির চেয়ে তার অন্তর্জগৎকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বর্তমান সময়ে অভিনয় ক্রমশ বহির্মুখী ও দ্রুতগতির হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিকাশ রায় আমাদের শেখান, অভিনয়ের আসল শক্তি নীরবতা, সংযম এবং মনস্তাত্ত্বিক সত্যে। তিনি ছিলেন বাংলা ছবির সোনালি যুগের অন্যতম স্তম্ভ, যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। বিকাশ রায়কে স্মরণ করা মানে কেবল একজন অভিনেতাকে স্মরণ করা নয়, বরং বাংলা সংস্কৃতির এক সংযত, মননশীল ধারাকে পুনরুদ্ধার করা। অতএব সময় এসেছে বিকাশ রায়কে নতুনভাবে পড়ার, দেখার এবং বোঝার। তাঁকে বিস্মৃত হওয়া মানে বাংলা চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ নান্দনিক ধারাকে বিস্মৃত হওয়া। তাই সময় এসেছে বিকাশ রায়কে পুনরাবিষ্কার করার, তাঁর শিল্পকে নতুন আলোয় দেখার এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলার।
