Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

আমেরিকার বিদেশনীতি এবং ভারতের কমিউনিস্টরা

আমেরিকা সব সময় চেয়েছে এবং চায়, ভারতে দুর্বল, জোড়াতালি দেওয়া জোট সরকার তৈরি হোক। কারণ এরকম দুর্বল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সহজ। আমেরিকান ডিপ স্টেট, জর্জ সোরোস এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক (আমেরিকাস্থিত) সংস্থাকে কাজে লাগিয়েও তারা বর্তমান সরকারকে নির্বাচনে পরাজিত করতে ব্যর্থ।

আমেরিকার বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে যতই উচ্ছ্বাস দেখান এবং প্রশংসা প্রকাশ করুন না কেন, অন্তর থেকে কখনওই চান না, মোদিজি বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোন।

Share Links:

বিবেকানন্দ চট্টোপাধ্যায়
প্রধান শিক্ষক, চিত্তরঞ্জন উচ্চবিদ্যালয়, পুরুলিয়া

আমাদের বাল্যকালে কমিউনিস্ট নেতাদের দেখতাম, মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তুলে স্লোগান দিতেন, ‍‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিপাত যাক, আমেরিকার কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’। সে বয়সে এই স্লোগানের অর্থ ও যৌক্তিকতা বোঝার মতো বিদ্যা ছিল না। একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ফ্রেটারনিটি সম্পর্কে অবগত হলাম, তখন বুঝেছিলাম, সোভিয়েত রাশিয়া, কিউবা-সহ কমিউনিস্ট ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতার কারণেই বঙ্গীয় কমিউনিস্টরা এতখানি আমেরিকা বিরোধী।

একসময় দুই মেরুবিশিষ্ট পৃথিবীতে ধনগণতান্ত্রিক বিশ্বের মোড়ল আমেরিকা এবং সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের স্থপতি সোভিয়েত রাশিয়া সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রয়োগ করেছে নিজেদের মতো করে। রাশিয়া ইউরেশিয়া অঞ্চলের অনেক ছোট ছোট দেশকে সরাসরি আক্রমণ করে সেখানে তাদের তাঁবেদার আজ্ঞাবহ কাউকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়ে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রনীতি চরিতার্থ করেছে এবং বিস্তার ঘটিয়েছে তার রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ। সেদিনের বলশালী সোভিয়েত রাশিয়া আজ কালের গর্ভে বিলীন। দেশটি টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার পরেও রাশিয়া নামের এক বৃহৎ দেশ পৃথিবীতে এখনও রয়েছে, কিন্তু আজ তার সে ক্ষমতাও নেই, আর বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে সে প্রভাবও নেই। তাই বর্তমান একমেরু বিশ্বে শুধু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের স্পিরিট তার সেই চিরকালীন পুরোনো স্টাইলেই বয়ে নিয়ে চলেছে। তারা সব দিনই পৃথিবীর দেশে দেশে নানা ছুতোয় তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, দেশের মধ্যে একাধিক শক্তিকেন্দ্র তৈরি করে অশান্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি রেখেছে নিজেদের স্বার্থে। পারতপক্ষে তারা পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়ার মতো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যায়নি। অতীতে দেখা গিয়েছে, তাদেরই সমর্থনপুষ্ট কোনও বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান তাদের বিরুদ্ধাচারণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা জর্জ বুশের সময় দেখেছি, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করার মিথ্যা অভিযোগে ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনের কী পরিণতি তাঁরা করেছেন। গর্তে লুকিয়েও সাদ্দাম বাঁচতে পারেননি, অথচ তার আগে সাত বছর ধরে ইরাক ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনে।

সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখলাম, আমেরিকার রোষে পড়া সিরিয়ার শাসক বাসার আল আসাদকে কীভাবে দেশ ছাড়তে হল। আবার ভারতের ‍‘অপারেশন সিঁদুর’ উত্তরকালে এও দেখা গেল, একসময়ের আল কায়েদা নেতা সিরীয় প্রেসিডেন্ট আবু আল সারার সঙ্গে করমর্দন করছেন আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বর্তমান শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যেটুকু সামরিক হস্তক্ষেপ, সেটা আমেরিকা বিরোধী উগ্রপন্থা এবং সরাসরি আমেরিকার স্বার্থে আঘাতকারী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের অংশবিশেষ। একসময় যে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত ক্রীড়নক নাজিবুল্লার অপসারণের জন্য মুজাহিদ তালিবান তৈরি করেছিল, ইরানকে সবক শেখানোর জন্য সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন জুগিয়েছিল, পরবর্তীকালে পরিবর্তিত স্বার্থসংঘাতে তারাই সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে এবং তালিবানের বিরুদ্ধে প্রায় ২১ বছর ধরে আফগানভূমে লড়াই করেছে। বর্তমান দুনিয়ায় সব রাষ্ট্রই তার বিদেশনীতি সাজায় নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে, এটা দোষের নয়। কিন্তু আমেরিকার বিদেশনীতির স্টাইলটা একটু অন্যরকম। তারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য টার্গেটেড রাষ্ট্রে পর্দার আড়ালে থেকে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করে থাকে। আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের সমকালীন রাজনীতি একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এটা বুঝতে পারি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর জমানায় বাংলাদেশের অধীনে থাকা বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত একখানা দ্বীপ আমেরিকাকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার কারণে তাঁর কী পরিণতি হয়েছে, তা সমগ্র বিশ্ব দেখেছে। তাদেরই কূট চালে ভারতের পশ্চিম প্রান্তে মূলত আমেরিকার পোষ্য রাষ্ট্র পাকিস্তানে জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জামানা শেষ হয়েছে। ইমরান খানের বেশি করে চিনের দিকে ঢলে পড়া আমেরিকা ভালোভাবে নিতে পারেনি। সেখানকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে চিনের কোল থেকে বের করে আনার জন্যই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ বিরতি কার্যকরী করতে আমেরিকার এমন প্রো-অ্যাকটিভ উদ্যোগ। কারণ চক্ষুশূল ইরানকে চোখে চোখে রাখার জন্য জঙ্গিরাষ্ট্র পাকিস্তানকে তার প্রয়োজন। ভারতীয় উপমহাদেশে আমেরিকার বিদেশনীতি মূলত ‍ঢেলা দিয়ে ঢেলা ভাঙার নীতি। তারা পাকিস্তানকে ঠিক ততখানি তোল্লা দেয়, যতখানি প্রয়োজন ভারতকে সামরিক দিক দিয়ে চাপে রাখতে। অন্যদিকে ভারতকে ততখানিই তোলা দেবে, যতখানি প্রয়োজন চিনকে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে চাপে রাখতে। আমেরিকা দেউলিয়া, দরিদ্র পাকিস্তানকে আইএমএফ (international monetary fund), এডিবি (Asian development Bank ) থেকে লোন পাইয়ে দেবে এটা জেনেও যে, তারা সে টাকা সন্ত্রাসবাদী তৈরির কাজে লাগাবে। তারা ভালোভাবে জানে, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদ চাষে ইন্ধন পরোক্ষে তাদের উপকারে আসে। কারণ পাকিস্তানের মাদ্রাসা মারকাজে উৎপাদিত সন্ত্রাসবাদীরা হত্যাকাণ্ড ঘটায় ভারতীয় কাশ্মীরে এবং পাকিস্তানি আইএসআইয়ের নির্দেশমতো অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে চলে। কাশ্মীরে সন্ত্রাসের আবহ স্থায়ী হলে অবশ্যই ভারতকে সেখানে সামরিকভাবে মনোনিবেশ করতে হবে পর্যাপ্ত সংখ্যক সেনা সমাবেশের মাধ্যমে। যেভাবেই হোক, ভারতকে তার পশ্চিম সীমান্তে তটস্থ রাখা আমেরিকার অন্যতম লক্ষ্য।

আমেরিকার কাছে সন্ত্রাস দু’রকমের, ভালো সন্ত্রাস এবং মন্দ সন্ত্রাস। যে সমস্ত সন্ত্রাসবাদী তাদের আক্রমণ করে, তাদের স্বার্থে হানি ঘটায়, একমাত্র তাদেরই বিরোধী আমেরিকা। একসময় আমেরিকার ব্লু আইড বয় বিন লাদেনকে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে আক্রমণের মূল্য চোকাতে হয়েছে জীবন দিয়ে। আমাদের পূর্ব প্রান্তে তার এজেন্ট ড. ইউনুস এবং পশ্চিমে শাহবাজ শরিফ তাঁদের কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন। পরিষ্কার কথায়, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকে দিয়ে আমেরিকা ভারতকে চাপে রাখতে চায়। কেননা বর্তমানে ভারতে কেন্দ্রে এক বলিষ্ঠ সরকার রয়েছে, যার বিদেশনীতি অবশ্যই আমেরিকা মুখাপেক্ষী নয়। আমেরিকা সব সময় চেয়েছে এবং চায়, ভারতে দুর্বল, জোড়াতালি দেওয়া জোট সরকার তৈরি হোক। কারণ এরকম দুর্বল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সহজ। আমেরিকান ডিপ স্টেট, জর্জ সোরোস এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক (আমেরিকাস্থিত) সংস্থাকে কাজে লাগিয়েও তারা বর্তমান সরকারকে নির্বাচনে পরাজিত করতে ব্যর্থ। আমেরিকার বর্তমান রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে যতই উচ্ছ্বাস দেখান এবং প্রশংসা প্রকাশ করুন না কেন, অন্তর থেকে কখনওই চান না, মোদিজি বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোন।

অন্য পোস্ট: ভারত-পাক সম্পর্ক ও বামপন্থী ছলচাতুরি

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু ছিলেন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। জোটনিরপেক্ষ জোটের লক্ষ্য ছিল শীতল যুদ্ধের আবহে মূলত কতকগুলি উন্নয়নশীল (আফ্রিকা ও এশিয়ার) রাষ্ট্রকে জোটবদ্ধ করে রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়ানো। নেহেরু প্রণীত রাশিয়া ঘেঁষা বিদেশনীতির ধারা ইন্দিরা গান্ধী, বাজপেয়ী এবং হালের মোদিজির মধ্য দিয়ে অবিচল গতীতে চলমান। অন্যদিকে আমেরিকার ভারত বিরোধিতার আন্ডার কারেন্টও সমানভাবে প্রবহমান। এক্ষেত্রে বাইডেন ও ট্রাম্পে কোনও প্রভেদ নেই। মোদিজির ট্রাম্প স্তুতি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মোদি স্তুতির পুরোটাই সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি। মোদিজির স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বরাষ্ট্র হিতকারী বিদেশনীতি আমেরিকার না-পসন্দ। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকা ভারতকে নিষেধ করে রাশিয়া থেকে খনিজ তেল ক্রয় করতে। কিন্তু মোদিজি তুলনায় কম মূল্যের খনিজ তেল রাশিয়া থেকে কেনা বন্ধ করেননি। ইরানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ককে আমেরিকা ভালোভাবে নেয় না। মোদিজি ভালো বোঝেন যে, চিনকে কাউন্টার করার জন্য আমেরিকার ভারতকে প্রয়োজন। এছাড়া ক্রমবিকশিত ভারতীয় অর্থনীতি (বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি) থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব। ভিতরে ভিতরে ভারতের প্রতি বিদ্বেষ থাকলেও আমেরিকার রাষ্ট্রপতিরা বাইরে সেটা প্রকাশ করেন না, ক্ষেত্র বিশেষে সময়ান্তরে উপরচালাকির আশ্রয় নেন। সে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী স্বয়ং ট্রাম্প বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছিলেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারে। পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশ সফরে আসেন আমেরিকান তুলসী গাবার্ড। তিনিও হিন্দু নির্যাতন প্রসঙ্গে ড. মহম্মদ ইউনুসের সমালোচনা করেছিলেন। আসলে এগুলি মেকি প্রচার সর্বস্বতা। ইউনুস আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মনোনীত এজেন্ট মাত্র, যিনি বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্বতীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করছেন। ট্রাম্প চাইলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তাঁরা সেটা চাইবেন না, কারণ বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন যত বেশি হবে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তত বেশি চাপে পড়বে, ভারতের বৃহৎ হিন্দু জনগোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হবে সরকারের প্রতি এবং দেশে হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা বৃদ্ধি পাবে। এতেই আমেরিকার লাভ। আমেরিকার যুগপৎ আর একটা আচরণ অবাক করার মতো। তারা আইসিসের সন্ত্রাসবাদী আবু বকর আল বাগদাদি, আল কায়েদা হেড বিন লাদেনদের খুঁজে হত্যা করতে পারে, কিন্তু সৈয়দ সালাউদ্দিন, হাফিজ সইদ, মাসুদ আজহারদের খুঁজে পায় না। ভারত-সহ বিশ্ববাসীকে খুশি করার জন্য তাদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করাতেই তার দায়িত্ব শেষ।

এ বছর ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে সংঘটিত সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে শুরু করে পাকিস্তান-ভারত সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা পর্যন্ত আমেরিকার কথাবার্তা, ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার বোঝা যাবে, তারা শুধুই পাকিস্তানের মঙ্গল (যা অবশ্যই আপাত) চেয়েছে। পাকিস্তানি জেহাদিদের হাতে (ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করে) নিরীহ হিন্দু পর্যটকদের হত্যার কারণে সমগ্র দেশবাসী যখন পাকিস্তানকে সমুচিত জবাব দেওয়ার দাবিতে উদ্বেল, তখন আমেরিকা নামকা ওয়াস্তে এ জঘন্য নরহত্যার বিরোধিতা করে। কিন্তু একইসঙ্গে মোদিজি-সহ ভারতের প্রধান বিরোধী দলটিকে সংঘর্ষে জড়াতে নিরুৎসাহিত করে। যখন কোনওভাবেই মোদিজিকে নিরস্ত করা যায়নি, তখন ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে তারা নিরপেক্ষ থাকবে, এ ঘোষণা করে। তাদের ভারত প্রেম (?) এবং পররাষ্ট্র নীতি বুঝতে হলে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ক্রিয়াকলাপ আলোচনা করা প্রয়োজন। ভারতের বিরোধিতা সত্ত্বেও আইএমএফ দ্বারা মোটা অঙ্কের টাকা পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, এ দুটোই পুরোপুরি ভারত বিরোধী উদ্যোগ। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান যখন একেবারে পর্যুদস্ত, তখন আমেরিকা তথাকথিত নিরপেক্ষতার খোলস ছেড়ে বেরোয় এবং তার কৃপাশ্রিত ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানকে হুমকি দেয় কালবিলম্ব না করে ভারতের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব রাখার জন্য। একইসঙ্গে রাশিয়া, ইরান, চিন-সহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলির প্রধানদের নিয়ে ভারতকে যুদ্ধবিরতির অনুরোধের (টেলিফোনিক) চাপ বজায় রাখে। আমাদের মনে হতেই পারে, যুদ্ধ, সংঘর্ষ মানেই অহেতুক লোকক্ষয়, ধ্বংস। তাই শান্তিপ্রিয় সাধারণ জনগণ সর্বদাই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন কোনও ঘটমান যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়, তখন তার পিছনে সে রাষ্ট্রের নিজস্ব কিছু হিসাব, মতলব থাকে। আমেরিকা যে কোনও মূল্যে পাকিস্তান নামক জেহাদি তৈরির কারখানাকে ভারতীয় উপমহাদেশে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। তবে এটাও ঠিক, তাকে কখনওই সত্যিকারের বলিষ্ঠ অর্থনীতি হিসাবে বিকশিত দেখতে চায় না। তার কারণ পাকিস্তান অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবে দুর্বল হলেও একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। পাকিস্তানের সেনা এবং ধর্ম প্রচারকদের মধ্যে ভারত তথা হিন্দুবিদ্বেষ কতখানি গভীর, আমেরিকা তা ভালোভাবেই বোঝে। আর তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের এই দুর্বলতাটাকেই সে ভারতের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়। ভারতীয় উপমহাদেশে স্থায়ী টেনশন বজায় রাখার লক্ষ্যে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দেশগুলি দীর্ঘ দিন ধরে পাকিস্তানকে মদত দিয়ে চলেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ মুখফসকে বলেই ফেলেছেন, ‍‘আমরা ৩৫ বছর ধরে উগ্র ধর্মান্ধ জেহাদি প্রতিপালন এবং সীমান্তের ওপারে এক্সপোর্ট করে চলেছি ব্রিটেন, আমেরিকা প্রভৃতি পশ্চিমি দেশগুলির পরামর্শক্রমে।’ পাকিস্তানের সার্বিক অনুন্নয়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অশিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামি আমেরিকার কাছে ভীষণ কাঙ্ক্ষিত। ২১ বছর আফগানিস্তানে বাহিনী রাখার পর হঠাৎ আমেরিকা যখন সে দেশ থেকে সেনা অপসারণের ঘোষণা করে, তখন বাহিনী তার সাঁজোয়া গাড়ি, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। এ নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল । বিশেষত তালিবান যোদ্ধারা আমেরিকান সেনাকে ভীরু, কাপুরুষ আখ্যা দিয়েছিলেন। বিষয়টি মোটেই সরল ছিল না। অস্ত্র ফেলে যাওয়ার পিছনেও ছিল এক সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি। আজ আমরা আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় কী দেখছি? আফগানিস্তানের জনসাধারণের কাছ থেকে সংগৃহীত কালাশনিকভ রাইফেল এখন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা তেহরিক-ই-তালিবান যোদ্ধাদের হাতে গর্জাচ্ছে। অর্থাৎ আমেরিকার ফেলে যাওয়া অস্ত্র ঘুরপথে পাকিস্তানকে সন্ত্রস্ত করতে কাজে লাগছে।

অন্য পোস্ট: অপারেশন সিঁদুর: প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের এক রাষ্ট্রীয় সংকল্প

গত শতকের ছয়-সাতের দশকে গ্রামবাংলায় চোর-ডাকাতদের খুব উপদ্রব ছিল। ছোটবেলায় বাড়ির বয়স্কদের মুখে শুনেছি, চোর নাকি অনেক সময় তাদের পিছু নেওয়া গ্রামরক্ষী দলকে আটকানোর জন্য লুণ্ঠিত টাকার বান্ডিল, সোনার গয়নার কিছু অংশ রাস্তায় ছড়িয়ে চম্পট দিত। তাতে চোররা নিরাপদে পালাতে পারত। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে গ্রামরক্ষী বাহিনীর মধ্যে টাকা ও গয়নার বখরা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হত। এটা হচ্ছে এক দ্বিমুখী কূটনৈতিক চাল। অস্ত্রশস্ত্র ফেলে রেখে আফগানিস্তান ত্যাগ আমেরিকান সেনাবাহিনীর এরকমই একটি কূটনৈতিক চাল ছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। এটা পরিষ্কার যে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা তিন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান, ভারত ও চিনের মধ্যে কাউকেই সুখ-শান্তিতে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে থাকতে দেওয়ার পক্ষপাতী নয়।

এ গেল সামরিক ক্ষেত্রে আমেরিকার কৌশলী পদক্ষেপ। আর্থ-বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আমেরিকা বিশ্বে শুল্কযুদ্ধ শুরু করেছে। চিন থেকে আমদানি হওয়া দ্রব্যের ওপর তারা ১৪৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছে। তুলনায় ভারতকে কিছুটা ছাড় দিয়েছে বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা কী রূপ নেবে, এখনই বলা মুশকিল। সংঘর্ষ বিরতিতে রাজি হওয়ায় ভারত-পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রের প্রধানদের ট্রাম্প অকুণ্ঠ সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং একইসঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, আগামিদিনে ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশের সঙ্গেই আমেরিকা আরও বেশি করে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এরকম কথা মূলত ভারতের সামনে গাজর ঝোলানোর প্রয়াস ছাড়া কিছু নয়। কারণ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মূল্য যে বিশেষ একটা নেই, আমেরিকা সেটা সম্যক বোঝে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক যেটা, সেটা হচ্ছে, একই অঙ্গে বহু রূপ, অর্থাৎ নীতিগত দ্বিচারিতা। এরা বাস্তুচ্যূত, নিরন্ন, আর্ত প্যালেস্তিনীয়দের জন্য ত্রাণ পাঠায়, আবার একইসঙ্গে ইজরায়েলে পাঠায় অস্ত্র, গোলাগুলি, যা সেই প্যালেস্তিনীয়নদের হত্যা করতে ব্যবহৃত হয়। যে আমেরিকা তিন বছর আগে ন্যাটোর (N ATO) গাজর ঝুলিয়ে ইউক্রেনকে প্রলুব্ধ এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ করে, সেই এখন ইউক্রেনকে চাপ দেয় রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার জন্য। তারাই কানাডাবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত শিখ সন্ত্রাসবাদী নির্জর হত্যা ইস্যুতে মিথ্যামিথ্যি ভারতের বিরুদ্ধে আঙুল তোলে, অর্থাৎ কানাডার পক্ষ নেয়, আবার কানাডা দখল করারও হুমকি দেয়। ট্রাম্প মোদিজির ব্যক্তিত্ব, দূরদর্শিতা, নেতৃত্বদানের ক্ষমতার প্রশংসা করেন, আবার তাঁরই পূর্বসূরি বাইডেন ভারতের সাধারণ নির্বাচনে মোদিজিকে পরাজিত করার জন্য আমেরিকার এজেন্সিগুলিকে কাজে লাগান। সুতরাং মোড়ল রাষ্ট্রটির কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ বোঝা বড় দায়! একেই ইংরেজিতে বলে আনপ্রেডিক্টেবিলিটি। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত সঠিক দিশাতেই চলেছে এখনও পর্যন্ত। আমাদের মনে হতেই পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ বিরতিতে ভারত আমেরিকার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, অর্থাৎ আমেরিকার কথায় ভারত সিজফায়ারে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। কিন্তু বিষয়টি এমন নাও হতে পারে। এরকম সিদ্ধান্তের পিছনে থাকতে পারে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (রাশিয়া, সৌদি আরব, আমিরশাহি, জাপানের মতো মিত্ররাষ্ট্রগুলির সঙ্গে) বাধ্যবাধকতা বা দেশীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার রক্ষা করার তাগিদ, কারণ সামাজিক, রাজনৈতিক,  সামরিক যে কোনও টেনশনই দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

বঙ্গীয় কমিউনিস্টদের প্রসঙ্গ দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, পরিশেষে তাঁদের কথাই লিখব। সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে একমাত্র কমিউনিস্টরা সংঘর্ষ বিরোধী অবস্থানে অনড় থাকেন, যখন তাঁদের জোট শরিক কংগ্রেস-সহ সব দলই জাতীয়তাবাদের ফায়দা তুলতে যুদ্ধের পক্ষে আওয়াজ তোলে। কমিউনিস্টদের যুগযুগান্তরের শত্রুরাষ্ট্র আমেরিকার অযাচিত হস্তক্ষেপে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে দাঁড়ি পড়ল, এটাই এখন বড় খবর। জানার খুব কৌতূহল হচ্ছে, তাঁদের দাবির পক্ষে আমেরিকার হস্তক্ষেপকে তাঁরা এখন কীভাবে নেবেন, কী বলবেন!

4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए