বরুণ মণ্ডল

পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কেবল রাজ্য রাজনীতির লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিকভাবে পরিমাপযোগ্য রাজনৈতিক ধাক্কা-প্রতিধাক্কার মঞ্চের রূপ নিয়েছে। একদিকে বিজেপির কেন্দ্র এবং রাজ্য ইউনিট তৃণমূল কংগ্রেসকে উৎখাত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টায় রত, অন্যদিকে তৃণমূল ও নতুন রাজনৈতিক গড়নের দলগুলি নিজেদের ভোটভিত্তি শক্তিশালী করতে তৎপর। এর মধ্যেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) এবং ধর্মীয় পরিচয় ও জনসংখ্যাভিত্তিক রাজনৈতিক বার্তা নির্বাচনী ভূমিকাকে আরও জটিল ও বিতর্কিত করেছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)
২০২৫-এর শেষদিকে ও ২০২৬-এর শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ (Special Intensive Revision বা SIR) সম্পন্ন হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এই সংশোধন কার্যক্রমটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে, কারণ এটি ভোটারদের আইডেন্টিটি ও ভোটাধিকারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে অভিযানকে স্বচ্ছতা, নকল ভোটার নির্মূলকরণ এবং নির্বাচনকে মর্যাদাপূর্ণ করার উদ্যোগ হিসাবে দেখানো হচ্ছে, যেখানে বিরোধীরা এটিকে ভোটারদের আইডেন্টিটি ও ভোটাধিকার হ্রাসের রাজনৈতিক হাতিয়ার বলে উল্লেখ করছে।
ধর্মীয় মেরুকরণ ও ভোটার পরিসংখ্যান
পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ২০২৬-এর নির্বাচনেও এই বিষয়টি নতুনভাবে জোরদার হয়েছে। বিতর্ক ও রাজনৈতিক প্রচারের সোর্সগুলিতে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক দলগুলি ধর্মীয় সংগঠনের ওপর ভর দিয়ে ভোটারদের কাছে বার্তা দিচ্ছে এবং ধর্মীয় সংখ্যা ও জনসংখ্যাভিত্তিক দাবিকে সামনে রাখছে।
সম্প্রতি বিজেপি একটি নথি নির্বাচনী কমিশনে জমা দিয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা গত ২৩ বছরে প্রায় ১২৭.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং একইসময় হিন্দু ভোটার প্রায় ৭২.৩% বেড়েছে। অবশ্য এই দাবিকে তৃণমূল ও অন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠী স্পষ্ট ভিত্তিহীন বলে খণ্ডন করেছে।
এমন ধর্মীয় পরিসংখ্যান ও দাবির মধ্যে রাজ্যটির প্রায় ৮০টি বিধানসভা আসনে মুসলিম ভোটারের সংখ্যাধিক্য বিদ্যমান— এটি নির্বাচনী ফলাফল এবং দলগুলির কৌশলের ওপর বড় প্রভাব রাখছে। এভাবে ধর্মীয় ও পরিচয়ভিত্তিক বার্তা রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনে চলে গিয়েছে। ফলে ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক দিকেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন সাজানো হয়েছে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা ও বিজেপির ডাবল ইঞ্জিন সরকারের প্রয়োজনীয়তার সমর্থনে।
বিজেপি ও তৃণমূলের SIR এবং আইডেন্টিটি রাজনীতি
বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে চাপানউতোর লক্ষ করা গিয়েছে। বিজেপির শীর্ষনেতারা SIR-কে নকল ভোট নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক ভোটার তালিকা গঠনের উদ্যোগ হিসাবে তুলে ধরেছেন এবং তাতে আইনি কাঠামোকে সম্মান করতে ভোটারদের নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন এবং আইনি প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। বিরোধীরা SIR-কে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভোটারদের দূরে সরিয়ে দেওয়ার বা ভোটদান ক্ষমতা কর্তনের চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে, যদিও সরকার ও নির্বাচন কমিশন বারবার বলে এসেছে, এটি একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া।
জনতা উন্নয়ন পার্টি (JUP) ও নতুন রাজনৈতিক ভূমিকা
নতুন রাজনৈতিক সংগঠন জনতা উন্নয়ন পার্টি (JUP), যেটি হুময়ুন কবির দ্বারা ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা সামাজিক ন্যায়, সংখ্যালঘু অধিকার ও সাংস্কৃতিক সমতন্ত্র নেতৃত্বের লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। তারা ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্বকে একটি নির্বাচনী সূচক হিসাবে তুলে ধরছেন। এই নতুন দলের ভূমিকা মূলত তৃণমূল ও বিজেপির বাইনারি রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করা, যেখানে প্রতিটি বড় দল ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক ভোটব্যাংক গঠন করছে। JUP-র মতো নতুন সংগঠনগুলি ভোটারদের জন্য সামাজিক সুবিচার ও মানবাধিকারভিত্তিক বার্তা প্রচারের চেষ্টা করছে, যদিও তাদের ব্যাপক প্রভাব এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।
উপসংহার
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং ভোটার তালিকার সংশোধন, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বার্তা এবং নতুন রাজনৈতিক দলগুলির আগমন জটিল রাজনীতির চিত্র তৈরি করেছে। ভোটার তালিকা সংশোধন ও ধর্মীয় মেরুকরণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলি তাদের বার্তা শক্তিশালী করে তুলছে, যা রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। এই নির্বাচনে কে কতটা সফল হবে, তা ভোটারদের মনোভাব, ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বার্তা এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির সংগঠিত প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে একটি ব্যাপক ও গতিময় রাজনীতির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
