Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

বাঙালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় হয়ে ওঠাও জরুরি

Share Links:

দয়াময় পোদ্দার

খনই জাতীয় সংগীতের প্রসঙ্গ আসে, অনিবার্য ভাবে তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় স্কুলবেলা। কেননা স্কুলবেলা জীবনের এমন একটি পর্ব, যা কেউই বাকি জীবনে ভুলতে পারে না। আর ভুলতে না পারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে বেজে চলে জাতীয় সংগীতের ধুন। আমার স্কুলজীবন দু’টি দেশে কেটেছে। সে কারণে এই দু’দেশের জাতীয় সংগীত গাওয়ার সুযোগ মিলেছে একজীবনে।

ধরুন, রাস্তার একপাশে বহমান নদী। অন্য পাশে ইংরেজি এল (L) আকৃতির স্কুলবাড়ি। সামনে বিশাল মাঠ। পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের খেত। ফাল্গুন মাসের দুপুর। স্কুলের জানালার বাইরে এলোমেলো হাওয়া বইছে। আর ফসলের খেতে ফুটে আছে তিসিফুল, যেন নীল আকাশখানা মাঠে নেমে এসেছে। এলোমেলো হাওয়ায় তিসিফুলে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। মনের মধ্যে বাজছে সকালে গাওয়া, ‍‘ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,/ মরি হায়, হায় রে ও মা,/ ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে।’ আর এভাবেই প্রোথিত হয়ে যায় জাতীয় সংগীত, যা সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে একটি দেশের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু দেশে অবস্থান করে তাকে অপমান করলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়।

সম্প্রতি একটি ভিডিয়ো ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দুই ব্যক্তি ধুলোমাখা পোশাক পরিহিত। কান ধরে দাঁড়ানো। জাতীয় সংগীত গাইছেন। আসলে গাইছেন না। তাঁদের বলে বলে গাওয়ানো হচ্ছে। সামনে কেউ ভিডিয়ো রেকর্ডিং করছেন। একজন পুলিশকর্মী ডান্ডা নিয়ে দাঁড়ানো। মূলত তিনিই গাওয়াচ্ছেন। এই ভিডিয়োটি বাংলাদেশের।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন থেকে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নামে আত্মপ্রকাশ করে। সে সময় জামাতে ইসলামি পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল। তখন থেকেই তারা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতকে স্বীকার করে না। প্রকাশ্যেও তারা এর বিরোধ অনেকবার করেছে। এবং বিরোধিতার কারণ হিসাবে ধর্মকে যুক্ত করেছে। তবে বিরোধের আরও একটি কারণ হল, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতটির রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি একাধারে ভারতীয়, তার ওপর হিন্দু। জামাতে ইসলামি যেমন বিশ্বাস করে, ভারতের কারণে তাদের অখণ্ড পাকিস্তানের স্বপ্ন সফল হয়নি, তেমনই রবীন্দ্রনাথ নামের একজন মূর্তি পূজারী হিন্দুর গান তাদের দেশের জাতীয় সংগীত হতে পারে না।

কিন্ত এই ভিডিয়োটি নিয়ে ভারতীয়রা, বিশেষ করে বাঙালিরা বেশ উৎফুল্ল। এই উৎফুল্লতার কারণ হতে পারে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রভাব পূর্বভারত জুড়ে পড়েছিল। এছাড়া সে সময় বহু হিন্দু শরণার্থী হয়ে ভারতে চলে এসেছিল। তাদের কাছে হয়তো আত্মসুখের বিষয় ভিডিয়োটি। হতে পারে, তবে এই আত্মরতি ছেড়ে এখন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়াতে হবে। আজ বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ আলাদা দেশ। আমাদের পড়শি দেশ ঠিকই, কিন্তু বিদেশও তো বটে। ভারতেও জাতীয় সংগীতকে অস্বীকার, আক্রমণ করা হয়। এবং ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে এই অভিঘাত। ১৯৪৭ সালের পর থেকে গোপনে এই আক্রমণকারীর সংখ্যা একটু একটু করে বাড়ছে।

শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সেজে ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে সেটা হবে আত্মহত্যার সমান। বাঙালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় হয়ে ওঠাও জরুরি। এবং মনে রাখতে হবে, ভারতের জাতীয় সংগীতটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। ইমন রাগে, কাহারবা তালে এই সংগীতটি তিনি লেখেন ১৯১১ সালের ২৭ ডিসেম্বর (বাংলা ১৩১৮সাল, ১১ পৌষ)। এর স্বরলিপি রচনা করেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১১ সালে কংগ্রেসের একটি সভায় প্রথম গাওয়া হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জাতীয় সংগীত হিসাবে এ গানটিকেই মনোনীত করেন। তবে ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের সময় ভারতের কোনও জাতীয় সংগীত ছিল না। সে বছর জাতিপুঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে বাজানোর জন্য ভারতীয় প্রতিনিধি দলের কাছে জাতীয় সংগীতের রেকর্ড চাওয়া হয়। তখন ‍‘জনগণমন’ গানটির পক্ষে প্রতিনিধি দল সমর্থন জানালে কেন্দ্রীয় সরকারও তাতে সম্মতি জানায়। এবং জাতিপুঞ্জের অর্কেস্ট্রা বাজনার গ্রামফোন রেকর্ড বাজানো হয়, যা সেখানে খুব প্রশংসিত হয়েছিল। তার তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধানে জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করা হয়।

সংবিধানের ৫১এ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু এই মৌলিক কর্তব্যকে কখনও কখনও অস্বীকার করা হয়েছে বলেই ১৯৭১ সালের সংশোধনীতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংগীত গাওয়ায় বাধা দিলে বা বিঘ্ন ঘটালে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেই গণ্য হবে। গাওয়ার সময় সকলকে দাঁড়িয়ে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে।

কিন্তু দেশ স্বাধীনের এত বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গের কোনও একটি স্কুলে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না বলে তার জন্য লড়াই করতে হয়। এটা কি লজ্জার নয়? কাজী মাসুম আখতার সাহেব প্রবল বিরোধের মুখেও লড়াই করে সেই অসাধ্য সাধন করেছেন। কখনও দেখা গিয়েছে, জাতীয় সংগীত বাজছে, কিন্তু কেউ বসে রয়েছেন। আইন থাকা সত্ত্বেও প্রয়োগ করা হয়নি। অতএব অন্য দেশের বিষয়ে উৎফুল্ল হওয়ার আগে নিজের দেশের দিকে মনোযোগ দিলে তা দেশ এবং জাতির পক্ষে মঙ্গল। ভারতে কত নেতা রয়েছেন, দেশের বিরোধিতা করেন, বিশ্বের কাছে দেশ এবং দেশবাসীকে অপমানিত করে সুখ পান, আদৌ তাঁরা কি জাতীয় সংগীতের দুটো লাইন নিখুঁতভাবে গাইতে পারেন? প্রশ্নটা সর্বস্তরের মানুষের কাছে রইল।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

সফলতা কাকে বলে

বিশ্ব ক্রিকেটের উত্তরণে কেরি প্যাকারের ভূমিকা

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৮)

পথেঘাটে নাকে আঙুল সমাজের নগ্ন সত্য

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিরভাস্বর বাঙালি প্রতিভার আলো

আমরা দেশি কুকুরকে অবহেলা করেছি

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৭)

বাংলা সাহিত্যে নদী

ভারতীয় ক্রিকেট দল পারলে অন্যান্য খেলায় দেশ পিছিয়ে কেন 

क्या स्कूल के पाठ्यक्रम में थिएटर को शामिल किया जाना चाहिए