অজয় ভট্টাচার্য

নাকচ করা বা বাতিল করার রায় শুধু বটতলা বা চণ্ডীমণ্ডপ দেয় না, বিদগ্ধ সমাজও অনেক সময় বাতিলের পক্ষে অযৌক্তিক রায় দিয়ে থাকে। মিডিয়া গোষ্ঠীর পছন্দসই না হওয়া অথবা তাদের নিজস্ব প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণে বহু মূল্যবান ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়, একথা সত্য। যদিও শিক্ষাদীক্ষা এবং সামাজিক অবস্থান ভেদে নাকচের রকমফেরের পরিবর্তন ঘটে। যেমন, বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে একটি অঙ্ক নিয়ে লড়াই করেছিলেন তাঁর খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে। ঠিক হয়েছিল, তরবারির লড়াইয়ে যিনি জয়ী হবেন, তাঁর যুক্তিকেই অপরপক্ষ শিরোধার্য বলে মেনে নেবে। এই জীবন-মরণ লড়াইয়ে টাইকো ব্রাহের নাকের কিছু অংশ কাটা পড়ে গিয়েছিল। বাকি জীবন তাঁকে নকল নাক পরে কাটিয়ে দিতে হয়েছিল। কিন্তু নিজের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
তসলিমা নাসরিনের মতামত কারও পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু তা বলে পুরো মানুষটিকেই বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশ। যে ভাষায় তিনি কথা বলেন, সাহিত্যচর্চা করেন, সেই বাংলা ভাষার পরিমণ্ডলে থাকার জন্য সাধ করে কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু চণ্ডীমণ্ডপের বিধানে কলকাতা থেকেও তাঁকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল।
সলমন রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ পছন্দ হয়নি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খোমেনেইর। তাই গোটা মানুষটিকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিধান দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ন’বছর আত্মগোপন করে থাকার পর যখন তিনি প্রকাশ্যে এলেন, তখনই তাঁকে খুন করার চেষ্টা করা হল। সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁকে চিরতরে একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে হল।
গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধীরা গঠনমূলক বিরোধিতা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক এবং অভিপ্রেত। অথচ সরকার বিরোধী মন্তব্য করার কারণে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে গণ্যমান্যদের কারাগারে বন্দি রাখার দৃষ্টান্ত কম নেই এ দেশেও। তবে রোমান ক্যাথলিকরা যেমন গ্যালিলিওর তত্ত্ব মুছে ফেলতে পারেননি, তেমনই তসলিমা নাসরিনের লেখা, সলমন রুশদির ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ বইটিও থাকবে। তসলিমার ‘লজ্জা’ যেমন সত্য, তেমন বিবর্তনবাদও।
