Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও মানুষের মর্যাদা: জীবিকা কি পরিচয়ের একমাত্র ভিত্তি

কাজ জীবিকার মাধ্যম, জীবনের নয়। অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলা সম্ভব। নিজেকে একমাত্র পেশার ভিতরে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমাত্রিক সত্তা হিসাবে গড়ে তোলা জরুরি।

সৃজনশীলতা, সম্পর্ক, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা, এসব ক্ষেত্র মানুষকে এমন একটি ভিত্তি দেয়, যা চাকরির অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ে না।

Share Links:

মফিজুল তরফদার

বর্তমান সময়ের এক গভীর বাস্তব সমস্যা হল কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে বসে থাকেন, মধ্যবয়স্ক কর্মী হঠাৎ প্রতিষ্ঠানগত সিদ্ধান্তে চাকরি হারান, অস্থায়ী কাজ স্থায়িত্ব দেয় না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কেবল আয়ের সংকট তৈরি করে না, মানুষের আত্মসম্মান ও পরিচয়বোধকেও কাঁপিয়ে দেয়। এখানে প্রশ্ন কেবল অর্থনীতির নয়, অস্তিত্বের।

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে কাজকে মানুষ প্রায়ই তার পরিচয়ের সমার্থক হিসাবে ধরে। প্রথম পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে আমরা নামের পর পেশা বলি, যেন মানুষ হওয়ার আগে আমরা চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে আমাদের শেখায়, আমার কাজই আমার মূল্য। কাজ থাকলে আমি সম্মানিত, কাজ না থাকলে অপ্রয়োজনীয়। এই মানসিক কাঠামোই অনিশ্চয়তার সময় মানুষকে গভীর সংকটে ঠেলে দেয়।

দার্শনিক দৃষ্টিতে মানুষ কেবল উৎপাদনশীল সত্তা নয়, সে চিন্তাশীল, নৈতিক, সম্পর্কমুখী সত্তা। কিন্তু আধুনিক অর্থনৈতিক কাঠামো মানুষকে প্রায়ই উৎপাদন ক্ষমতার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে। ফলে বেকারত্ব বা অনিশ্চিত কর্মজীবন মানে কেবল আর্থিক অসুবিধা নয়, আত্মপরিচয়ের ভাঙন। ব্যক্তি ভাবতে শুরু করে, আমি কি ব্যর্থ? আমি কি অযোগ্য? সমাজের চোখে আমার স্থান কোথায়?

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। কাজ কি মানুষের মর্যাদার উৎস, নাকি মানুষের মর্যাদা কাজের ঊর্ধ্বে? যদি মর্যাদা কাজের ওপর নির্ভর করে, তবে শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থর মর্যাদা কোথায় দাঁড়ায়? যদি মর্যাদা মানুষের অস্তিত্বগত সত্যে নিহিত থাকে, তবে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তার মূল্য কমাতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হল, আমরা প্রায়ই এই দার্শনিক সত্যকে সামাজিক আচরণে রূপ দিতে পারি না।

অনিশ্চয়তার আর একটি দিক হল ভয়। ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন করে রাখে। সে বর্তমান উপভোগ করতে পারে না, কারণ তার মন ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বন্দি। এই ভয় কখনও প্রতিযোগিতাকে নির্মম করে তোলে। অন্যের সাফল্য তখন অনুপ্রেরণা নয়, হুমকি। সহকর্মী বন্ধু নয়, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী। সমাজে একধরনের অদৃশ্য উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে এই সংকটের ভিতরেও একটি দার্শনিক সম্ভাবনা আছে। অনিশ্চয়তা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কি কেবল একজন বেতনভোগী কর্মচারী? যদি সব পরিচয় ভেঙে যায়, তাহলে আমি কে? এ প্রশ্ন ভীতিকর হলেও মুক্তিদায়ক। কারণ তখন মানুষ নিজের গভীরতর সত্তাকে খুঁজতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে, কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই চূড়ান্ত নয়।

কাজ জীবিকার মাধ্যম, জীবনের নয়। সমাধান সহজ নয়। অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তোলা সম্ভব। নিজেকে একমাত্র পেশার ভিতরে সীমাবদ্ধ না রেখে বহুমাত্রিক সত্তা হিসাবে গড়ে তোলা জরুরি। সৃজনশীলতা, সম্পর্ক, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা, এসব ক্ষেত্র মানুষকে এমন একটি ভিত্তি দেয়, যা চাকরির অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ে না। অতএব কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আমাদের সময়ের কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু এ বাস্তবতা আমাদের একটি গভীর সত্যও স্মরণ করিয়ে দেয়— মানুষের মর্যাদা তার বেতনের অঙ্কে নয়, তার মানবিকতায়। যে সমাজ এ সত্য উপলব্ধি করতে পারবে, তা অনিশ্চয়তার মাঝেও স্থিতি খুঁজে পাবে। আর যে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বকে কেবল পেশার গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখবে না, সে অনিশ্চয়তার মধ্যেও আত্মমর্যাদার আলো ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

বইয়ের গন্ধ, ধুলোবালি ও বিপন্ন ভালোবাসার কথা

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)