Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ক্ষোভ-অনাস্থা থেকে অভ্যুত্থান, কোন পথে বাংলাদেশ! (শেষ পর্ব)

বাংলাদেশে সুশাসন চায় তরুণ প্রজন্ম। তারা চায় দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ হোক। মানুষ যেন স্বাধীনভাবে মত ও দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ পায়। এসব কাজের পাশাপাশি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাটাও অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ।

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশে অবাধে চলছে লুঠ। ছবি সৌজন্য: গুগল।

Share Links:

কাজল মুখার্জি

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার তিনদিন পর বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার শপথ নেয়। তাঁর সঙ্গে যে ১৬ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, সেখানে যেমন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আছেন, তেমন ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় দু’জন সমন্বয়কও রয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনগণের আস্থা ফেরানো।

এই আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনকারীরা শুধু যে সরকারের প্রতি অনাস্থা দেখিয়েছেন, তাই নয়, পুলিশের ওপরও তাঁরা চরম অনাস্থার কথা ব্যক্ত করেছেন। ফলে দেশের প্রায় সব থানায় আক্রমণ হয়েছে। পিটিয়ে, পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে পুলিশকে। ফলে নতুন সরকার গঠন হলেও শুরুতে পুলিশকে কাজে ফেরানো যায়নি। কারণ পুলিশের মধ্যে কাজ করছিল ভীতি, আতঙ্ক। আবার দেশে তিনদিন সেই অর্থে কোনও সরকার ছিল না। সে সময় আওয়ামি লিগের অনেক নেতা-কর্মীর বাড়িতে হামলা হয়েছে৷ বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫২ জেলায় হিন্দুদের ওপর অন্তত ২০৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বলতে গেলে সারাদেশে এখনও একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। সরকারি বহু সেবা বন্ধ। এমনকী অনেক জায়গায় এখনও ট্রেন চালু করা যায়নি। প্রশাসনে চরম অস্থিরতা বিরাজমান। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতর থেকে শুরু করে সর্বত্র চলছে চেয়ার হারানো ও চেয়ার দখলের লড়াই। এমনকী দেশের সর্বোচ্চ আদালতও বাদ পড়েনি সেই অনাস্থা থেকে। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। সরকারের পটপরিবর্তনে একপক্ষকে হটিয়ে আর একপক্ষ দখল করে নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বলে খবর আসছে। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও চলছে লড়াই-পালটা লড়াই। পরস্পরের বিরুদ্ধে এমন আস্থাহীনতা বাংলাদেশ এর আগে এত তীব্রভাবে দেখেনি। এর রেশ পড়েছে ১৫ আগস্টেও। যাঁরা ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবের প্রতি শোক জানাতে গিয়েছিলেন, তাঁরা নানাভাবে বাধা ও হেনস্থার শিকার হয়েছেন।

অন্য পোস্ট: আন্দামান বাঙালিদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র

তবে এসব সংকটের বিপরীতে আশার ছবিও আছে। পুলিশ যখন কাজে ছিল না, ঢাকা-সহ সারা দেশে ছাত্র-তরুণরা রাজপথের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে যেভাবে ময়লা, আবর্জনা পরিষ্কারের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, তাতে দেশবাসী মুগ্ধ। তবে সরকারকে দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সারাদেশের সব থানায় আক্রমণ হয়েছে। লুট হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বহু বন্দি এবং জঙ্গি জেল ভেঙে পালিয়েছে। ওইসব অস্ত্র উদ্ধার করা সরকারের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশ কাজে যোগ দিলেও তাদের ভিতরের আতঙ্ক কাটেনি। তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে। আবার সাধারণ মানুষ নিত্যনৈমিত্তিক গুজবে আছে। ফলে তারাও দ্বিধাগ্রস্ত। আতঙ্কে রয়েছেন সংখ্যালঘুরা। আসলে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেন নিজেকে নিরাপদ মনে করেন, সরকারকে এখন সেই আস্থা ফেরাতে হবে।

কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করাই নয়, পাশাপাশি সচল করতে হবে অর্থনীতির চাকাও। কারণ টানা প্রায় একমাসের অস্থিরতায় দেশের সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। সহিংসতার মুখে গার্মেন্টস কারখানাগুলো বন্ধ ছিল। ব্যাংকগুলিতে এখনও অস্থিরতা চলছে। এগুলিও দ্রুত ঠিক করতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজার ঠিক রাখতে না পারলে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরও মানুষের অসন্তোষ তৈরি হবে। কাজেই সেক্ষেত্রেও আস্থা ফেরাতে হবে। কমাতে হবে মূল্যস্ফীতি।

বাংলাদেশে গত ৫৩ বছরে, বিশেষ করে গত ১৫ বছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে দলীয়করণ করে প্রায় ধ্বংসের মুখে ফেলা হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঠিক করতে হবে। সব মিলিয়ে দেশে সুশাসন চায় তরুণ প্রজন্ম। তারা দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ চায়। মানুষ যেন স্বাধীনভাবে মত ও দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ পায়। এসব কাজের পাশাপাশি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনাটাও অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ।

জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশ জুড়ে যখন আন্দোলন চলছিল, তখন বিদেশে ছিলেন ড. মহম্মদ ইউনূস। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিতে ৮৪ বছর বয়সি নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূসকে প্রস্তাব দেন। তাতে সায় দেন ড. ইউনূস। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ৮ আগস্ট দেশে ফিরে ওইদিন রাতেই প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নেন তিনি।

অন্য পোস্ট: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বামী বিবেকানন্দ

দেশে ফিরেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মহম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমাদের কাজ হল সবাইকে রক্ষা করা। প্রতিটি মানুষকে রক্ষা করা। প্রতিটি মানুষ আমাদের ভাই, আমাদের বোন। তাঁদের রক্ষা করা এবং আমাদের একটা শৃঙ্খলায় ফিরে আসা উচিত।’ নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেছেন, ‘আপনারা যদি আমার ওপর বিশ্বাস ও ভরসা রাখেন, তাহলে নিশ্চিত থাকুন, দেশের কোনও জায়গায় কারও ওপর হামলা হবে না। এটা আমাদের প্রথম দায়িত্ব।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কিছু ঘটনায় তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন। ১৩ আগস্ট দুপুরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জাতীয় উপাসনালয় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনকালে ড. ইউনূস বলেছেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। বিভেদ তৈরি করার কোনও সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাই তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবাই এক পরিবার। পার্থক্য বা বিভেদ করার কোনও সুযোগ নেই।

এখন দেখার বিষয় হল, রাজনৈতিক দলগুলি গত ৫৩ বছরে যে বিভেদ আর সহিংসতার রাজনীতি করেছে, মানুষে মানুষে যে বিভাজন ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে পুলিশ থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানে, সেখান থেকে দেশকে কতটা এগিয়ে নিতে পারেন ড. মহম্মদ ইউনূস। তবে কোনও সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের সামনে এ এক বিরাট সুযোগ। আর সে কারণেই বোধহয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসাবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেছেন, ‘এ স্বাধীনতা আমাদের রক্ষা করতেই হবে।’

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

এই বিভাগে

বইয়ের গন্ধ, ধুলোবালি ও বিপন্ন ভালোবাসার কথা

শিশুসাহিত্য পাঠে ছোটদের অনীহা

কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬ এবং ভারতের পিছিয়ে পড়া

প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ জীবন সম্ভব

মা কোথায়

শৈশবের ইঁদুরদৌড়

জো জিতা, ওহি সিকান্দার

আসলে ‘আমি’বলতে কী বোঝায়

বঙ্গাব্দের সূচনায় শশাঙ্কর অবদান

যুগে যুগে তখন এখন (পর্ব ৯)