শক্তিকুমার চট্টোপাধ্যায়
পরাধীনতার অভিজ্ঞতা যাদের নেই, তাদের স্বাধীনতার স্বাদ বোঝানো খুব মুশকিল। একজন নিরপরাধ জেলবন্দি যখন মুক্তি পান, তখন তাঁর দেহ ও মনে যেমন খুশির জোয়ার আসে, পরাধীনতার পর স্বাধীনতা পেলে ঠিক তেমনই রোমাঞ্চ ও শিহরণ অনুভূত হয়।
আমাদের দেশে যে সময় পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিল, তখন সমগ্র ভারতবাসী শিহরিত হয়েছিল। আজ ভারতবাসী মুক্ত, হাত-পা-কণ্ঠ খোলা।যা ইচ্ছা, তা করে। অপরাধটুকু ব্যতীত সব করতে পারে। পরাধীন ভারতে এটা সম্ভব ছিল না।
স্বাধীনতার পর অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে। ব্রিটিশ ভারতের চেয়ে অনেক উন্নত আজকের এই গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশ। যুদ্ধে সফল, মহাকাশ গবেষণায় সফল, চন্দ্রজয়ে সফল, বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সফল, আবিষ্কারে সফল, উদ্ভাবনে সফল। স্বাধীনতার আগে ভারতে পথঘাটের যেমন অবস্থা ছিল, এখন তেমন নেই। তার চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও এখন পিচ ও কংক্রিটের পথ। শহরের মতো সেখানেও এখন জলের বড় বড় ট্যাংক। ঘরে ঘরে জলের কল, বিদ্যুতের আলো। স্বাধীনতার আগে গ্রামের মানুষের সম্বল ছিল হাতপাখা, কেরোসিনের আলো। শৌচকর্মের জন্য ব্যবহার করা হত বনবাদাড়, পুকুরপাড়। আজ সেই দুরবস্থা ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামেও নেই। স্বাধীনতার পর ভারতবাসীর ট্যাঁকের জোর ভালোই বেড়েছে। স্বাধীনতার আগে মানুষের দুরবস্থার কথা বইপত্র পড়লেই বোঝা যায়। কেনাকাটায় এখন অনলাইনের যুগ। চিকিৎসার জন্য হাত বাড়ালেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, নার্সিংহোম। বাড়িতে প্রসবের দিন কবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। শিক্ষা এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
অন্য পোস্ট: কাশ্মীর: এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা
স্বাধীনতার পর ভারতীয় মুদ্রারও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ৬৪ পয়সায় ষোলো আনা এখন গল্পকথা। আনা, নয়া মুখে চালু থাকলেও বাস্তবে নেই। কেউ টাকাপয়সা চাইলেই ‘এক নয়াও নেই’ কথাটা আজও চালু রয়েছে। কিন্তু ‘নয়া’ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্মের তেমন কিছুই জানা নেই। একসময় এক নয়া, দু’নয়া, ১০ নয়া, ২০ নয়া বেশ চালু ছিল। গত শতকের আটের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চালু ছিল। স্বাধীন হওয়ার পর দেশ ১০০ নয়া পয়সায় ১ টাকা বা ষোলো আনা চালু করে। ১৯৫৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১ টাকাকে ১০০ নয়া পয়সা বলা হলেও ১৯৬৪ সালের ১ জুন থেকে দেশে ‘নয়া’ শব্দটিকে সরকারি ভাবে বাতিল করা হয়। ১ টাকার উপর লেখা হতে শুরু করে ১০০ পয়সা। স্বাধীনতার পরে ভারতীয় মুদ্রা ও অর্থনীতিতে দু’-তিনবার মারাত্মক ধকল গিয়েছে। অর্থের মান তলানিতে ঠেকেছে। ১৯৬৪, ১৯৯১ এবং ২০১৬ সালে ভারতীয় মুদ্রা ও টাকা ব্যতিব্যস্ত করে তোলে দেশের সরকারকে। ১৯৬৪ সালে ব্রোঞ্জ, অ্যালুমিনিয়াম-ব্রোঞ্জ মুদ্রায় প্রচুর পরিমাণে নকল মুদ্রা ঢুকিয়ে দেয় স্বার্থান্বেষী কিছু প্রতিবেশী দেশ। কাগজের টাকাতেও ব্যাপক নকল নোট বাজারে চলে আসে। ছয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে সমস্ত দোকানে আসল মুদ্রা যাচাইয়ের জন্য চুম্বক রাখা শুরু হয়। নকল মুদ্রায় সীসা থাকায় হাতে ঘষলে কালো দাগ পড়লে মুদ্রাটিকে ‘অচল’ বলে ধরা হত। ছয়ের দশকের শেষ থেকে ভারতীয় সিনেমা, যাত্রাপালায় ‘অচল পয়সা’র বিষয়ে লেখালেখি শুরু হয়ে যায়। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত বাংলা সিনেমা ‘প্রিয় বান্ধবী’, ভৈরবনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত এবং অরুণ দাশগুপ্ত ও বীণা দাশগুপ্তা অভিনীত ‘অচল পয়সা’ যাত্রাপালা সে সময় সমাজে সাড়া ফেলে দিয়েছিল এবং খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। আটের দশক থেকে ধাতুর মুদ্রা বাজারে ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়া হয়। ভারতে ডাক বিভাগ ব্যতীত ৫০ পয়সা আর কোথাও চালু নেই। ৫০ পয়সা বা আট আনায় আজও পোস্টকার্ড কেনা যায়।
১৯৯১ সালে হঠাৎ বিদেশের বাজারে ভারতীয় টাকার মূল্য কমে যায়। দিশাহারা হয়েছিল সে সময়কার ভারত সরকার। বহু কষ্টে সে দৈন্যদশা থেকে ভারত অবশ্য বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের নোট বদল নিয়ে সরকার ও দেশবাসীকে কম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি।
যাই হোক, স্বাধীনতার পর বহু ঘটনার মধ্যে মুদ্রা ও টাকাপয়সা নিয়ে বিভ্রাট সাময়িক যন্ত্রণা দিলেও তা সহ্য করা গিয়েছে দেশ স্বাধীন হওয়ার সুবাদেই। ঘর নতুন করে গোছাতে গিয়ে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। স্বাধীনতার পর দেশকে নতুন করে গোছাতে গিয়ে ভারতবাসীকেও অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে সমস্ত সমস্যারই মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে আমাদের দেশ ভারত। বারবার হেরেছে তথাকথিত বন্ধুর ছদ্মবেশে থাকা প্রতিবেশী শত্রু দেশগুলো।
দ্রব্যসামগ্রী পরিমাপের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরপর। এখন সেসব পরিমাপ করা হয় ওজনে। পোয়া, পাই, সের আর ব্যবহার হয় না। সের পরিবর্তিত হয়েছে কেজিতে। স্বাধীনতার আগে থেকে চলে আসা ‘সের’ ছিল লোহার চাকতির আকারে। ‘সের’ মাপে ‘পাই’ ব্যবহৃত হত একসময়। চার ছটাকে এক পোয়া। চার পোয়ায় এক সের বা এক পাই। এরকম পদ্ধতিই একসময় পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হত। স্বাধীনতার শুরুতেই ‘সের’ বাতিল হয়ে কিলোগ্রাম একক ব্যবহার শুরু হয়। কিলোগ্রাম বাটখারা লোহার এবং ৬টি কোণবিশিষ্ট। অবশ্য ‘সের’ গ্রামবাংলার কোথাও কোথাও গত শতকের সাতের দশক অবধি ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। ১ কেজি ১.০৭১৬৯৬৫ সেরের সমান। আজও দুধ কেনা-বেচায় সের, পোয়া ব্যবহার করা হয়। হঠাৎ কারও লক্ষ্মীলাভ হলে সমাজে আজও বলে বেড়ানো হয়, ‘অমুকবাবুর পোয়া বারো’ ।
যাই হোক, স্বাধীনতা পেয়ে ভারতবাসী এখন মহাসুখে আছে। স্বাধীন, তাই স্বাধীনতায় উন্নয়নের সিঁড়িতে ক্রমশ উপরে উঠছে দেশবাসী।

