স্বপনকুমার মণ্ডল
প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া

মোবাইল ফোনের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তার চেয়েও তীব্র আসক্তি জনমানসে ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে সব পেয়েছি দেশের হাতছানি, অন্যদিকে তার আতঙ্ক জাগানো বিভীষিকা রাতের ঘুমই কেড়ে নিচ্ছে! স্বয়ং সেলফোনের জনক মার্টিন কুপার তাঁর আবিষ্কার নিয়েই দুঃখপ্রকাশ করেছেন। বর্তমানে সেলফোনের মাত্রাতিরিক্ত অপব্যবহারে তাঁর আফশোস যেন, ‘কেন যে মোবাইল আবিষ্কার করলাম!’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছর সেলফোন আবিষ্কারের পঞ্চাশ বছর পূর্তি হয়েছে। ১৯৭৩-এর ৩ এপ্রিল মার্টিন কুপার প্রথম মোবাইল ফোনে কল করেন। তিনিই তার স্রষ্টা বিগত পঞ্চাশ বছরে মোবাইলের ব্যবহার যেভাবে মানুষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তাতে আবিষ্কারকের তুষ্ট হওয়ার চেয়ে অনুশোচনাই তাঁকে বিব্রত করেছে। আসলে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মোবাইলের প্রতি আসক্তি সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
কর্মবিমুখ মনে সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে বুঁদ হয়ে থাকার প্রবণতায় মার্টিন কুপারের সখেদ অভিমত নানাভাবেই প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে। রাস্তা পার হওয়ার সময়ও মোবাইলের স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। তাতে অসংখ্য পথচারীর মৃত্যুতেও হুঁশ না ফেরার কথা বলে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেল মারে অফিসে বসে ৯৪ বছর বয়সি মার্টিন কুপার আসলে মোবাইলের ভয়াবহ পরিণতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সারা পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার বাসনায় যখন মুঠোফোনের মধ্যে বর্ণরঙিন হাতছানি, তখন তার মনোহরা আতিথ্যের তীব্র আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই আসক্তিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে নখদর্পণে বিশ্বদর্শনের কল্পনা যেমন মুঠোফোনে বাস্তবায়িত হয়, তেমনই সুবর্ণ সুযোগের মোহে দিশাহারা পথিককে বিপথগামী করে তোলে। আশ্রয় যখন প্রশ্রয় হয়ে ওঠে, তখন পরনির্ভরতা আপনাতেই বেড়ে যায়।
অন্য পোস্ট: একমাত্র ভারতই পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে
প্রশ্রয় যখন পরম নির্ভরতা লাভ করে, তখন প্রতিবন্ধিত্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুঠোফোনের বহুমুখী আশ্রয়, প্রশ্রয় ও তার পরম নির্ভরতায় সেই প্রতিবন্ধী প্রকৃতি স্বাভাবিক ভাবেই সবুজ ও সজীবতা লাভ করে। সেখানে রিয়াল ওয়ার্ল্ডের বিমুখতাই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডকে আপন করে তোলে। কেননা তাতে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার হরেক আয়োজন, রকমারি আমন্ত্রণ, বিচিত্র প্রকাশের আকাশ অবিরাম হাতছানি দিয়ে চলে। এভাবে মুঠোফোনের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া গড়ে উঠেছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, এক্স হ্যান্ডল, ইনস্টাগ্রাম, নেটফ্লিক্স, লিংকএড, আরও কত কী! সেখানে ফেসবুকের রাজত্ব পৃথিবীজুড়ে। অথচ তার মধ্যেও অন্ত্যজ অন্ধকারের ভয়াবহ পরিণতি ওঁৎ পেতে থাকে। মার্টিন কুপারের অসুখী অনুশোচনা সেখানেও সমান সক্রিয়, বিস্তারও বেপরোয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেসবুকের জুড়ি মেলা ভার। আমজনতার মুখপত্র থেকে মুখপাত্র, সব ভূমিকাতেই তার দিগন্তবিস্তারী মোহময়ী হাতছানি। সবার সমান সমাদর, সকলের সমান সুযোগ। ফেসবুকের এই গণতান্ত্রিক বিস্তারই তার মূলধন। সেখানে বয়সে বা সম্পর্কে যে যাই হোক, সকলের একটাই পরিচয়, সবাই সবার বন্ধু। এরকম উদার আকাশে সকলেই স্বচ্ছন্দে ইচ্ছেডানা মেলে দিতে পারে, পাড়ি দিতে পারে দেশ-দেশান্তরে। শুধু তাই নয়, ইচ্ছামতো নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ, নিজস্ব মতামত গড়ে তোলার অবকাশ রয়েছে। আবার তাতেই প্রতিবাদ করার বা জানানোর, সহমত পোষণের বা বিরোধিতার কত বিচিত্র আয়োজন! লাইক, কমেন্ট, ইমোজি, ছবি, ভিডিয়ো, কতভাবেই তার ভাব প্রকাশ পায়। সেলিব্রিটিদের মতো নিজেকে দেখানো, শুভেচ্ছা জানানো, সবই সচিত্র আপডেটে এলাহী আয়োজন। প্রতিমুহূর্তে সবার মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করার উন্মুক্ত পরিসরই শুধু নয়, অন্যকে চেনাজানার আনন্দবাজার তার পরতে পরতে। নিঃসঙ্গতার রুদ্ধ দুয়ার খুলে বন্ধুত্ব যাপনের অনন্ত অবকাশ তার হাতের মুঠোয়। দেখা-দেখানো, শোনা-শোনানো, জানা-জানানোর নিত্যনতুন উৎসব তার লেগেই আছে। কথাযাপনের পথ বেয়েই তার শিল্পসাহিত্যের চর্চা, লাইভ অনুষ্ঠান সম্প্রচার, সবকিছুই একই আধারে, একই পরিসরে। বিনা পয়সায় প্রীতিভোজের আনন্দ তার অবয়ব জুড়ে। সেখানে আধুনিক জীবনে ভোগবাদী মানুষের নিঃসঙ্গতার হাহাকার শোনা যায় না, বরং নিঃসঙ্গতা যাপনের বিচিত্র ও বিপুল আনন্দ উদযাপনের মোহ মনকে আবিষ্ট করে রাখে অবিরত। সময় যে কীভাবে চলে যায় তার সঙ্গে, কেউ বুঝতেই পারে না। বিস্ময়কর হাতছানি এই ফেসবুকের। সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানুষের একাকিত্বে ফেসবুকই জনসংযোগে বিকল্প সমাজের হাতছানি জাগিয়ে তোলে। কোনও শাসন নেই, চোখ রাঙানি নেই, মেনে চলার বালাই নেই তার। উলটে অবাধ স্বাধীনতা, অবারিত উপভোগের হাতছানি। শুধু তাই নয়, কোলাহলমুখর আমজনতার মাঝেও নীরবে নিভৃতে একান্ত আপন করে খুঁজে পাওয়ার বর্ণরঙিন মানসদর্পণ।
