কাজল মুখার্জি

কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের আন্দোলন, গুলি, হত্যা, সরকার পতনের একদফা, কারফিউ, সহিংসতা, গণবিক্ষোভ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং সবশেষে নোবেল বিজয়ী ড. মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে টালমাটাল বাংলাদেশ!
এত অল্প সময়ে যে এতকিছু ঘটতে পারে, আজ থেকে ঠিক একমাস আগেও তা ক’জন ভাবতে পেরেছিল? এই যে ছাত্র-জনতার এত বড় অভ্যুত্থান হল, তার পিছনের সবচেয়ে বড় কারণ বোধহয় শেখ হাসিনার প্রতি অনাস্থা।
২০০৮ সালের নির্বাচনে যে বিপুল বিজয় নিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন, ১৫ বছরের মাথায় সেই শেখ হাসিনাকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও গণরোষে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়। তিনি এখন ভারতে রয়েছেন। মাঝখানে তিনদিন কার্যত কোনও ধরনের সরকার ছিল না বাংলাদেশে। তারপর নোবেল বিজয়ী ড. মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করেন, ছাত্র-জনতা এখন তাঁরই ওপর আস্থা রেখে সামনের দিনগুলিতে নতুন এক বাংলাদেশ চায়।
কিন্তু শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের এত অনাস্থার কারণ কী? আসলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যেনতেনভাবে নির্বাচন করিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখে নিজেকে একনায়ক হিসাবে দাঁড় করিয়েছিলেন শেখ হাসিনা, যেটি ‘সাধারণ মানুষ’ একেবারেই পছন্দ করেনি। ওই সময় ছিল না মানুষের ভোট দেওয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। হামলা, মামলা ও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। এমনকী সামাজিক মাধ্যমেও সত্যিকারের মনের কথা লেখার স্বাধীনতা হারিয়েছিলেন নাগরিকরা। কেউ প্রতিবাদ করলে পুলিশি নিপীড়ন চলত। সব মিলিয়ে যেন পুলিশি এক রাষ্ট্র!
অন্য পোস্ট: আর জি কর কাণ্ড ও নারী আন্দোলন
এই যে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে ছাত্রছাত্রী, যুবকরা বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিলেন, সেটি কিন্তু হঠাৎ করে শুরু হয়নি। গত ১৫ বছরে সরকার যতই উন্নয়নের কথা প্রচার করুক, একদিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার এবং তাঁদের কর্মসংস্থানের অভাব, অন্যদিকে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি— এসব কারণে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। যেহেতু সেগুলি প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না কিংবা ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না, তাই সেই ক্ষোভ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। তরুণদের মধ্যে এসব ক্ষোভের পাশাপাশি শেখ হাসিনার প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা তৈরি হচ্ছিল এবং সেটা ২০১৮ সাল থেকেই চূড়ান্তভাবে বাড়ছিল।
ছ’বছর আগে ২০১৮ সালের জুলাই-আগস্ট মাসেই তরুণরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ওই বছরের ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া নিহত হন এবং ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছাত্ররা কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট, ২০১৮ পর্যন্ত গণবিক্ষোভ করেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগের হেলমেট বাহিনীর অত্যাচার সে আন্দোলনকে স্তব্ধ করে। সরকার আশ্বাস দিলেও ছাত্রদের দাবিগুলি পরে মানা হয়নি। তখন থেকেই ছাত্রদের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবি ২০১৮ সালের সেই অনাস্থা ও অবিশ্বাসের চূড়ান্ত ফল বলা যেতে পারে।
এবার যখন কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হল, সরকার শুরুতে ছাত্রদের কোনও কথাই শোনেনি। তারা একদিকে আদালতের দোহাই দিয়ে সময় পার করতে চেয়েছে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে বরাবর ক্ষমতায় টিকে থাকা শেখ হাসিনা সরকার এবার শুরু থেকে একের পর এক ভুল করেছে। তারা তরুণদের ভাষা বুঝতেই পারেনি। বরং বরাবরের মতোই আন্দোলন দমাতে দাম্ভিকতা দেখিয়েছে। আওয়ামি লিগের সাধারণ সম্পাদক হুমকি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সব মন্ত্রীর কথায় ছিল দাপট। তারপর ১৬ জুলাই যখন রংপুরে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের বুকে গুলি চালাল পুলিশ, সেই ছবি দেখে সারা দেশের ছাত্ররা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
অন্যদিকে সাধারণ জনতা তো আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। ফলে ছাত্র-জনতার স্রোত একসঙ্গে মিলেছে রাজপথে। সেই ক্ষোভে পুড়েছে সরকারি বহু স্থাপনা। তারপর সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি করল। বন্ধ করা হল ইন্টারনেট, ফেসবুক। এগুলো অবিশ্বাস ও সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। তৈরি হয়েছে নানা গুজব। কারফিউ শেষে সরকার ছাত্র হত্যার কথা না বলে হা-হুতাশ শুরু করল সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের খতিয়ান নিয়ে, যেগুলো আরও বেশি অনাস্থার জন্ম দিয়েছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতেই কোটা আন্দোলন আগস্টের শুরুতে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবিতে পর্যবসিত হয়। সাধারণ জনগণ ততদিনে এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে, সব থানায় হামলা চালিয়েছে, পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে পুলিশকে।
অন্য পোস্ট: প্যারিস অলিম্পিক্স ও ভারত
কোটা সংস্কার আন্দোলন, পরবর্তী বিক্ষোভ ও সরকারের পতনের পর সহিংসতায় ১৬ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৫৮০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত ২১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। ৩২৬ জন নিহত হন ৪ থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে। বাকি ৩৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় ৭ থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে, যাঁরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই সময় ‘ক্ষুব্ধ জনতা’ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ হাসিনার পৈতৃক বাড়ি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর-সহ রাষ্ট্রীয় বহু সম্পদ পুড়িয়ে দিয়েছে।
আসলে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। নয়ের দশকের ছাত্র আন্দোলনে সামরিক এরশাদ সরকারের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হলেও সত্যিকারের গণতন্ত্র আর সুশাসন আসেনি। বরং যখন যিনি ক্ষমতায় গিয়েছেন, স্বৈরাচারী আচরণ করেছেন। সব শেষে টানা ১৫ বছরের শাসনে শেখ হাসিনার প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।
এবার শিক্ষার্থীরা শুধু কোটা নয়, সব ধরনের বৈষম্য থেকে মুক্তি চেয়েছেন। তাই তাঁরা এই আন্দোলনের নাম দিয়েছেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন। অবাক করার বিষয় হল, সেই তরুণ সমাজ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিল, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা সারাক্ষণ মোবাইল ফোন, কমপিউটার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, দেশ, জাতি নিয়ে ভাবে না। কাজেই এই তরুণরা আন্দোলন করে গোটা দেশ বদলে দেবেন, এমন ধারণা সরকার পক্ষের ছিল না বললেই চলে। শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এবারের আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও দারুণ ভূমিকা রেখেছেন।
তরুণ প্রজন্ম বলছে, তারা এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে বৈষম্যের বদলে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে। এই তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর, যেখানে সাধারণ জনগণের কথা বলার, প্রতিবাদের ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থাকবে। এজন্য তারা বেছে নিয়েছে নোবেলজয়ী ড. ইউনসূকে।
